“আমার কাছ থেকে ৪ দফার কিস্তিতে ১০ হাজার টাকা নিয়েছে। বিনিময়ে আমাকে ১ লাখ টাকা ঋণ দেয়ার কথা ছিল তাদের। কিন্তু যেদিন ঋণ দেবার কথা তার আগেরদিন রাতে অফিস গুটিয়ে পালিয়ে যায়। আমাকে সর্বশান্ত করে পালিয়ে গেছে ওরা।
এভাবেই কথা গুলো বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন গার্মেন্টস কর্মী ইয়াসমিন আক্তার। রোববার র্যাব-৪ এর কার্যালয়ে কথা হয় তার সাথে।
ইয়াসমিন আক্তার টাইমনিউজবিডিকে জানান, আমিন বাজার এলাকার একটি গার্মেন্টসে কাজ করেন তিনি। স্বামী আব বকরও একই এলাকার অপর একটি গার্মেন্টসে কাজ করেন। টাকা খোয়া যাওয়ার পর থেকে স্বামীর সাথে পারিবারিক মনোমালিন্যও চলছে বলে জানান তিনি।
সম্প্রতি কিছু অসাধূ চক্রের সদস্যরা প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে গড়ে তুলছে মাল্টি লেভেল মার্কেটিং বা এমএলএম কোম্পানী। এছাড়া সঞ্চয় ও ঋণদান সমিতি এবং এনজিও।
নামে বেনামে গড়ে উঠা এই সব এমএলএম কোম্পানীর পরিচালনা করছেন প্রতারক চক্রের সদস্যরা। তারা ঋণদানের কথা বলে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কিস্তিতে টাকা উত্তোলন করেন।
প্রথমে তারা কিছু মানুষের কাছ থেকে কিস্তিতে টাকা নিয়ে ঋণ দান করে। এতে সবার কাছে বিশ্বাস তৈরি হয়। এরপর গ্রাহক সংখ্যা যায় বেড়ে। বেশি সংখ্যক লোক যখন টাকা জমা দিতে থাকে তখন একটা নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করে ওই দিন সবাইকে আসতে বলে। তারিখ সাধারণত রোববার-সোমবার করা হয়। ব্যাংক বন্ধের দিন ওরা টাকা নিয়ে লাপাত্তা হয়ে যায়।
আর এসব এমএলএম কোম্পানীর ফাঁদে পড়ে মধ্য ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষরা খোয়াচ্ছেন হাজার হাজার টাকা।
গত শনিবার এমনি একটি এমএলএম কোম্পানীর ৫ ভুয়া সদস্যকে আটক করে র্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ন।
শনিবার সারারাত ও কাল অবধি সাভারের আশুলিয়া ও আমিন বাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদেরকে আটক করে র্যাব-৪ ব্যাটালিয়নের সদস্যরা।
আটককৃতরা হলেন, যমুনা সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতি নামে কোম্পানীটির ম্যানেজার এবং এই প্রতারক চক্রের মূল হোতা শফিকুল ইসলাম ওরফে হাফিজ (৪২)।। আটক অন্যরা হলেন সহযোহী মো. বাবুল হোসেন (৪১), মো. মাসুম মুন্সী (৩২), মনির হোসেন জামান (৫০) ও তসিকুল ইসলাম (৩৯)।
ইয়াসমিন জানান, অফিস শেষে সন্ধার দিকে বাসায় ফিরছিলাম। বাসার ঠিক কাছেই “যমুনা সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতি”নামে নতুন একটি অফিস সাইনবোর্ড খুলছে দেখি। সেখানে আগ্রহ নিয়ে কথা বলি। তারা জানায় ঋনদানের সমিতি। যারা ৫ হাজার টাকা কিস্তিতে জমা দেবে তাদের।
তাদের দেয়া হবে ৫০ হাজার টাকার ঋণ। এভাবে ১০ হাজারে ১ লাখ টাকা, ২০ হাজার জমায় ২ লাখ টাকা দেবার কথা বলে ওরা।
তারা যে সাইনবোর্ডটি ঝুলিয়েছিল তাতে লেখা ছিল সরকার কর্তৃক অনুমোদিত যমুনা সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতি।
ইয়াসমিন জানান, সমিতির ম্যানেজর শফিকুল ইসলাম এভাবে দীর্ঘদিন থেকে এই ব্যবসা করে আসছিল তা আমি বুঝতে পারি নি। সে আমিনবাজার শাখায় প্রায় ৪শ’জন সদস্যের কাছ থেকে ৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋনদানের কথা বলে হাতিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায়।
আশুলিয়া থেকে আসা ভুক্তভোগী দেলোয়ার হোসেন বলেন, আমাকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ দেয়ার কথা বলে ৫ হাজার টাকা নিয়েছে। সমিতির সদস্য হতেও জন প্রতি ২০০ টাকা নিয়েছে। কিন্তু গত সোমবার ছিল ঋণ দেয়ার কথা। সেদিনের আগের রাতে ওরা অফিস গুটিয়ে পালিয়ে যায়। পরে বিষয়টি র্যাব-৪ কে জানানো হলে র্যাব প্রতারক চক্রটিকে গ্রেফতার করে।
এব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে র্যাব-৪ এর পরিচালক এডিশনাল ডিআইজি শাহাবুদ্দিন খান টাইমনিউজবিডিকে বলেন, অভিযুক্তরা দীর্ঘদিন থেকে এই প্রতারণার সাথে জড়িত। তারা আমিন বাজারে প্রায় ৪শ লোকের টাকা মেরে দিয়ে গত ২৫ সেপ্টেম্বর পালিয়ে আসে।
এরপর তারা এক মাসের বিরতি দিয়ে আবার ১ নভেম্বর পাশ্ববর্তী আশুলিয়ার ইয়াসিনবাগে লালমিয়া নামে এক জনের বাসার দ্বিতীয় তলায় নতুন শাখা খুলে বসে।
এখানে এসে তারা কিস্তির খাতার রং পরিবর্তন করে সবুজ থেকে নীল করে। কর্মকর্তাদের অনেকে নামের আদ্যক্ষরও পরিবর্তন করে। এখানেও ঋণ দেয়ার কথা বলে প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন শ’জন গ্রাহক তৈরি করে। তাদের সবার কাছ থেকে সদস্য ফরমপূরণ বাবদ ২০০ করে টাকা নেয়। এরপর কিস্তিতে ২ থেকে ৪০ হাজার করে পর্যন্ত নেয়।
তারা একটা নির্দিষ্ট তারিখ জানিয়ে দিয়ে বিশ্বাস অর্জন করে। কাউকে কাউকে টাকাও দিয়ে দেয়। এতে ওই এলাকার মধ্যে মানুষের মধ্যে বিশ্বাস তৈরি হলে সবার টাকা মেরে দিয়ে পালিয়ে যায়।
র্যাব সিও শাহাবুদ্দিন খান আরও বলেন, ইতোমধ্যে আমিনবাজার ও আশুলিয়া এলাকার ভুক্তোভুগীরা র্যাব-৪ এ এ সংক্রান্ত অভিযোগ দায়ের করলে র্যাব বিষয়টি খতিয়ে দেখতে তদন্তে নামে।
তদন্তে ঋণদানের ঠিক আগের দিন তারা টাকা নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার বিষয়টির সত্যতা মেলে।
তদন্তে তাদের সেই সমিতির কোনো সরকারি অনুমোদন নেই বলে জানা যায়। পরে র্যাব-৪ একটি দল গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে প্রতারক চক্রের ৫ সদস্যকে আটক করে।
তিন বলেন, মানুষ যাতে এসব ভূয়া প্রতারকচক্রের খপ্পড়ে পড়ে তাদের মূলধন না হারান সেজন্য প্রচারণা চালানো হচ্ছে। এমনকি অন্য আদলে যেসব ভূয়া এমএলএম বা এনজিও কোম্পানী গড়ে উঠেছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
গ্রেফতারকৃতদের নামে মামলা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভবিষ্যতেও এই ধরণের অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি।
জেইউ/এসএইচ





