সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলার তদন্ত কার্যত থেমে আছে। দৃশ্যমান অগ্রগতি বলতে বারবার তদন্তের সময় বাড়ানো ছাড়া আর কোনো তথ্য তদন্ত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দিতে পারেননি। গত আড়াই বছরে ২৮ বার আদালতের কাছ থেকে সময় নিয়েছেন তদন্তকারী কর্মকর্তা।
তদন্তের এই স্থবিরতার কারণে নিহত দুই সাংবাদিকের পরিবার কেবল অপেক্ষার প্রহর গুনছে। আর মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া আটজন সোয়া দুই বছর ধরে কারাভোগ করছেন। এঁদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ তদন্তকারী সূত্র জানাতে পারেনি। আদালত আর র্যাবের কাছে ছুটতে ছুটতে এই পরিবারগুলো অসহায় হয়ে পড়েছে।
এ মামলায় সন্দেহের বশে গ্রেপ্তার আটজন হলেন, নিহত দম্পতির বন্ধু তানভীর রহমান, রফিকুল ইসলাম, বকুল মিয়া, মো. সাইদ, মিন্টু, কামরুল হাসান ওরফে অরুণ, সাগর-রুনির ভাড়া বাসার নিরাপত্তা প্রহরী এনামুল ও পলাশ রুদ্র পাল।
এঁদের মধ্যে রফিকুল ইসলাম, বকুল মিয়া, মো. সাইদ, মিন্টু, কামরুল হাসান গত বছরের আগস্টে মহাখালীর বক্ষব্যাধি হাসপাতালের চিকিৎসক নারায়ণ চন্দ্র হত্যার ঘটনায় র্যাব ও ডিবির হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। পরে তাঁদের এ মামলায় আটক দেখানো হয়।
তদন্ত কর্মকর্তারা স্বীকার করেন, এ আটজনের কারও বিরুদ্ধে সাগর-রুনি হত্যায় জড়িত থাকার প্রমাণ তাঁরা পাননি। ফলে এই লম্বা সময়ে মামলায় এদের কারও স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও পাওয়া যায়নি।
র্যাবের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বীকার করেছেন, সাগর-রুনি হত্যার কারণ বা ঘটনা নির্দেশ করে এমন ন্যূনতম সূত্রটিও তাঁদের হাতে নেই। এখন পর্যন্ত র্যাব এ ঘটনায় ১১৬ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। কিন্তু কিছুই মেলেনি। এ মামলাটি নিয়ে এখন চরম বিব্রতকর অবস্থায় আছেন বলে এই কর্মকর্তারা স্বীকার করেন।
গত সোমবার (১৩ অক্টোবর) সাগর–রুনির বাসার চাবি রুনির পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে র্যাব। এরপর মামলাটির বিষয়ে খোঁজখবর করতে গিয়ে তদন্তের এই চিত্র পাওয়া যায়।
নিহত সাগর সরওয়ারের মা সালেহা মনির আক্ষেপ করে বলেন, ‘এত দিন আমাকে শুধু আশ্বাসই দেওয়া হয়েছে। আমিও আশায় বুক বেঁধেছিলাম। কিন্তু এখন আমি হতাশ। জানি না সন্তান হত্যা বিচারের জন্য কার কাছে যাব?’
বিনা বিচারে আটক তানভীর রহমানের বাবা মাহাবুবুর রহমান বলেন, ‘আড়াই বছরেও আমার ছেলের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ আনতে পারেনি র্যাব। আমরা আটবার উচ্চ আদালতে গেছি, কিন্তু জামিন পাইনি। তদন্তও শেষ হচ্ছে না। এখন আমার ছেলেটার জীবন বিপন্ন হচ্ছে।’
উচ্চ আদালতের নির্দেশে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) এ মামলার তদন্ত করছে। র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান বলেন, দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় হয়তো মনে হতে পারে তদন্ত থেমে আছে। কিন্তু তদন্ত থেমে নেই। বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে র্যাব এ মামলার তদন্ত করছে।
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ভোরে রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া ফ্ল্যাট থেকে সাগর-রুনির ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করা হয়। ওই বছরের ১৮ এপ্রিল মামলার তদন্ত সংস্থা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ আদালতে গিয়ে তদন্তে ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে। পরে উচ্চ আদালত র্যাবকে এ মামলা তদন্ত করার নির্দেশ দেন।
এখন র্যাবের পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত দল এ মামলার তদন্ত তদারক করছে। তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার পর ওই বছরের ২৬ এপ্রিল ভিসেরা আলামতের জন্য নিহত দুজনের লাশ পুনরায় কবর থেকে উত্তোলন করে। কিন্তু ভিসেরা পরীক্ষায় নিহতদের শরীরে বিষক্রিয়ার কোনো আলামত পাওয়া যায়নি।
র্যাব কর্মকর্তারা জানান, এরপর র্যাব যুক্তরাষ্ট্রের পরীক্ষাগারে মামলার আলামতের নমুনা পাঠায় ডিএনএ পরীক্ষার জন্য। যুক্তরাষ্ট্র থেকে এই পরীক্ষার ফলাফল আসা পর্যন্ত র্যাব মূলত আর কোনো পন্থায় তদন্ত না করে অপেক্ষা করেছিল বলে একাধিক কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন। এক বছর পর পরীক্ষার ফলাফল এলে ওই নমুনা থেকে দুজনের পূর্ণাঙ্গ ডিএনএ-বৃত্তান্ত উদ্ধার করা গেছে বলে র্যাব জানায়।
এঁদের একজন হলেন নিহত রুনি। আরেকজন অজ্ঞাত ব্যক্তির ডিএনএ। যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে বিপুল অর্থ ব্যয়ে এই ডিএনএ পরীক্ষা করার পর র্যাব এখন বলছে, যেহেতু বাংলাদেশে অপরাধীদের কোনো ডিএনএ তথ্যভান্ডার নেই, তাই এই অজ্ঞাত সন্দেহভাজনের ডিএনএ থেকে কাউকে শনাক্তকরণের সুযোগ নেই।
বিভিন্ন ধাপের পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুধু ডিএনএ পরীক্ষার ভিত্তিতে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে কোনো হত্যা মামলার আসামিকে শনাক্ত করার নজির নেই।
এরপর র্যাব গণমাধ্যমকে বলেছিল, নিহত সাংবাদিকদের বাড়ির দারোয়ান এনামুল হককে ধরতে পারলে হত্যার জট খুলে যাবে। তাঁকে ধরতে ১০ লাখ টাকার পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। সেই এনামুলও গ্রেপ্তার হয়েছেন, কিন্তু হত্যার রহস্যের কোনো কিনারা হয়নি।
এখন আদালতের নির্ধারিত তারিখে র্যাব তদন্তের জন্য আরও সময় চেয়ে আবেদন করা ছাড়া তদন্তে আর কোনো অগ্রগতির তথ্য দিতে পারছে না। র্যাবের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তদন্তের কোনো কূলকিনারা করতে না পেরে তাঁদের কর্মকর্তারা এখন ত্যক্ত-বিরক্ত। কোন পথে তদন্ত আগাবে তা নিয়েও দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটছে না।
তবে গতকাল রাতে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, ‘আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করছি। নিশ্চয়ই তদন্তে সবকিছু বেরিয়ে আসবে।’
এই হত্যাকাণ্ডের পর তিনজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করেছেন। সবাই আশার বাণী শুনিয়েছেন। হত্যাকাণ্ডের দিন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হত্যায় জড়িতদের গ্রেপ্তার করা হবে বলে ঘোষণা দেন। এরপর পুলিশের মহাপরিদর্শক হাসান মাহমুদ খন্দকার বলেছিলেন, তদন্তে ‘প্রণিধানযোগ্য’ অগ্রগতি হয়েছে।
মহীউদ্দীন খান আলমগীর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০১২ সালের ৯ অক্টোবর সংবাদ সম্মেলন করে বলেন, ‘অপরাধের আলামত আমরা পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করেছি, যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক পরীক্ষাগারে পাঠিয়েছি, তারা পরীক্ষার মাধ্যমে অপরাধীদের ডিএনএ শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। ডিএনএ বিচার-বিশ্লেষণ করে আমরা অকাট্যভাবে আদালতে নিয়ে যেতে সামর্থ্য হব।’
নিহত সাংবাদিক মেহেরুন রুনির ভাই নওশের আলম বলেন, ‘অগ্রগতি বলতে ঘটনার আড়াই বছর পর রুনির বাসার চাবি আমাদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর বেশি কিছু জানি না।’ (সূত্র: প্রথম আলো)
কেবি





