পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তৎপর হয়ে উঠেছে অজ্ঞান পার্টির সদস্যরা। বাস, লঞ্চ ও ট্রেন স্টেশন থেকে শুরু করে রাজধানীর ফুটপাথেও ছদ্মবেশে তৎপরতা চালাচ্ছে তারা। কখনো ডাব বিক্রেতা, কখনো বা কোমলপানীয় বিক্রেতা এবং কখনো কখনো ঠাণ্ডা শরবত ও চা বিক্রেতার ছদ্মবেশে সাধারণ মানুষকে অচেতন করে সব কিছু লুটে নিচ্ছে তারা।
পুলিশ বলছে, অজ্ঞান পার্টির সদস্যরা সময়ের সাথে তারা কৌশলেও পরিবর্তন আনে। তারা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে। অনেক সময় গোয়েন্দারা তাদের ধরে কারাগারে পাঠালেও জামিনে বেরিয়ে ওই একই পেশায় লিপ্ত হয় ওরা। ফলে অজ্ঞান পার্টি নিয়ে মহাবিপাকে পুলিশ প্রশাসন।
কোরবানি ঈদ যতই ঘনিয়ে আসছে ততই বড়ছে অজ্ঞান পার্টির দৌরাত্ম্য। প্রতিদিনই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অজ্ঞান পার্টির কবলে পড়ে খোয়াতে হচ্ছে টাকাসহ মূল্যবান বিভিন্ন সামগ্রী। এমনকি তাদের খপ্পরে পড়ে অনেকে মারাও যাচ্ছেন।
গত কয়েক দিনে তিনজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তাই আসন্ন ঈদুল আজহা সামনে রেখে অজ্ঞান পার্টির সদস্যদের গ্রেফতারে বিশেষ অভিযান শুরু করেছে পুলিশ। নগরীর প্রবেশ পথগুলোতে বাড়ানো হয়েছে নজরদারি।
গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, নগরীতে ডাব, শরবত ও পানীয় বিক্রির আড়ালে বিপণিবিতান, বাস, লঞ্চ কিংবা রেলস্টেশনে ও ব্যস্ত রাস্তার পাশে ৪০টি স্পটে অজ্ঞান পার্টির ২৫ থেকে ৩০টি গ্রুপে চার শতাধিক সদস্য সক্রিয় রয়েছে। তাদের প্রধান টার্গেট গরু ব্যবসায়ী ও ঘরমুখো মানুষ।
তবে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ রাস্তার পাশে কিংবা স্টেশন গুলোতে ডাব ও ঠাণ্ডা পানি বা লেবুমিশ্রিত শরবতসহ অন্যান্য খাবার খাওয়া থেকে সাবধান থাকলে অনেকটাই মুক্তি মিলবে অজ্ঞান পার্টির খপ্পর থেকে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া সাংবাদিকদের বলেন, অজ্ঞান ও মলম পার্টির সদস্যরা গ্রেফতারের পর জামিনে বেরিয়ে আবার একই কাজ করে। তাই তাদের ধরে শুধু মামলা দিলে হবে না, তাদের জন্য স্পেশাল ‘ট্রিটমেন্টের’ ব্যবস্থা করা হবে। অজামিনযোগ্য ও কঠোর ধারায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
জানা গেছে, অজ্ঞান পার্টির সদস্যরা হকার সেজে আবার কখনো তারা যাত্রী হিসেবে লঞ্চ, বাস বা ট্রেনে উঠে অন্যের সাথে সদভাব তৈরি করে ঘুমের ওষুধ মিশ্রিত বিষাক্ত খাদ্যদ্রব্য খাইয়ে মূল্যবানসামগ্রী নিয়ে পালিয়ে যায়। খাবারের সাথে অনেক উচ্চমাত্রার ‘ডায়াজিপিন’ ট্যাবলেট কিংবা সিরাপ মিশিয়ে অজ্ঞান করার কাজ করে প্রতারকেরা।
এসব চেতনানাশক ওষুধে অজ্ঞান হওয়া ছাড়াও ডায়াবেটিস ও লিভারের সমস্যাগ্রস্ত রোগীরা মারাও যেতে পারেন। পুলিশের ভাষ্য মতে, অচেতন করার এসব ওষুধ আমদানি নিষিদ্ধ। তার পরও অসাধু ব্যবসায়ীরা চোরাই পথে এনে উচ্চমূল্যে এসব চক্রের কাছে বিক্রি করে।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গড়ে প্রতিদিনই অন্তত তিন-চারজন মানুষ অজ্ঞানপার্টির খপ্পরে পড়ে সর্বস্ব খোয়াচ্ছেন। গত আগস্ট মাসে অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়ে ঢাকা মেডিক্যালে ভর্তি হয়েছেন অন্তত ৭২ জন। গত ১৭ আগস্ট রাতে রাজধানীতে অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়ে জাহাঙ্গীর হোসেন (৪০) নামে এক ব্যবসায়ীর মৃত্যু হয়েছে। ওই দিন বিকালে ভিক্টোরিয়া পার্কের সামনে অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়েন তিনি।
জানা গেছে, তিনি ওই দিন সাভারে একটি পার্টির কাছ থেকে দুই লাখ টাকা নিয়ে বাসে করে দোকানে ফিরছিলেন। পথে অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়েন। পরে বাসটি ভিক্টোরিয়া পার্কের সামনে পৌঁছলে সব যাত্রী নেমে গেলেও তিনি অচেতন অবস্থায় বাসের ভেতর পড়ে ছিলেন। পথচারীরা তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত ১১টায় মারা যান তিনি।
পুলিশ জানায়, গত মঙ্গলবার (৮সেপ্টেম্বর) দুপুর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত রাজধানীর পল্টন, রমনা ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় অভিযান চালিয়ে অজ্ঞান পার্টির ১৯ জনকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। এ সময় তাদের কাছ থেকে চেতনানাশক ট্যাবলেট মাইলাম- ৭.৫ মি.গ্রা. ৩০ পিস, ডরমিটল-৭.৫ মি.গ্রা. ৩০ পিস, লোনাজেপ-২-২ মি.গ্রা. ৩০ পিস এবং চেতনানাশক সাত কৌটা হালুয়া জব্দ করে গোয়েন্দারা।
গোয়েন্দারা জানান, গ্রেফতার হওয়া অজ্ঞান পার্টির তিনটি দলের মধ্যে একটির দলনেতা আবদুর রাজ্জাক, একটির আবদুর রাহমান ও আরেকটির নেতা রমজান আলী। তারা আন্তঃজেলার হয়ে কাজ করে। বিশেষভাবে মাওয়া, পাটুয়াটুলী, টঙ্গী, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে তারা অপারেশন শুরু করে। টার্গেট করা যাত্রীকে বাসের মধ্যে অচেতন করে তার সব কিছু নিয়ে পথে নেমে যায়।
গোয়েন্দা পুলিশের হাতে গ্রেফতার অজ্ঞান পার্টির সদস্য মানিক মিয়া জানান, ট্যাবলেট মিশ্রিত খাবার খাওয়ার ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যেই যেকোনো মানুষ অচেতন হতে বাধ্য। মাত্রা বেশি হলে ৫ থেকে ৭ মিনিটের মধ্যেই মানুষ অচেতন হয়ে পড়ে।
তিনি আরও জানান, তারা সাধারণত দুইটি দলে কাজ করে। প্রথম দলের সদস্যরা শুধু টার্গেটকৃত ব্যক্তিকে অচেতন করার ওষুধ খাবারের সাথে মিশিয়ে দেয়। আর দ্বিতীয় ধাপের সদস্যরা খাবার খাওয়া ব্যক্তির গতিবিধির ওপর নজর রাখে। যখনই অচেতন হয়ে পড়ে তখনই সাথে থাকা মালামাল সুকৌশলে নিয়ে সটকে পড়ে।
আবদুর রহমান নামে অজ্ঞান পার্টির অপর এক সদস্য জানায়, পাশের যাত্রী কিংবা পথচারীর সাথে তারা সখ্য গড়ে তোলে। এরপর কৌশলে চা-বিস্কুট কিংবা অন্য একটা খাবারের সাথে কিছু একটা খাইয়ে দেয়।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, অজ্ঞান পার্টি চক্রের সদস্যরা সারা বছর বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকে। তবে ঈদ সামনে রেখে মানুষকে অচেতন করে টাকা ও মালামাল হাতিয়ে নেয়ার কাজ শুরু করে।
গত তিন মাসে অজ্ঞান পার্টির শতাধিক সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে। রাজধানীতে অজ্ঞান পার্টির ২০ থেকে ২২ জন এখনো তৎপর রয়েছে। আন্তঃজেলা অজ্ঞান পার্টির সদস্য আছে আরো ২০ জন। তারা রাজধানীতে প্রবেশ করছে না। তাদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে।
এ ছাড়াও ফুটপাথের কিছু দোকানদার অজ্ঞান পার্টি চক্রের সদস্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব দোকানিকে চিহ্নিত করা হচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হবে।
তিনি বলেন, বিভিন্ন সময়ে র্যাব-পুলিশ ও গোয়েন্দাদের হাতে অজ্ঞান পার্টির সদস্যরা গ্রেফতার হয়ে জেলে যায়। পরে আবার জামিন নিয়ে একই কাজে লিপ্ত হয়। তাই এসব অপরাধীর বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা না দিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক সাজা প্রদানের ব্যবস্থা করা হবে।
তবে গোয়েন্দা পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেন, রাজধানীর ৪০টি স্পটে অজ্ঞান পার্টির ২৫ থেকে ৩০টি গ্রুপে ৪০০ সদস্য সক্রিয় আছে। তাদের প্রায় সবাই এখন জামিনে মুক্ত।
আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক গত সোমবার (৭সেপ্টেম্বর) পুলিশ সদর দফতরে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, অজ্ঞান ও মলম পার্টির সদস্যদের গ্রেফতারের অভিযান জোরদার করার জন্য পুলিশকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
এ নিয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে অডিও, ভিডিও ও সিডি করা হয়েছে, প্রত্যেকটি টার্মিনালে ব্যানার ও মাইকিংয়ের মাধ্যমে প্রচারণা চালানো হয়েছে। কিন্তু বাসের চালক-হেলপার যাত্রীদের সচেতনতামূলক পরামর্শ দিলে আর মানুষ সচেতন হলে অজ্ঞান পার্টির কবল থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
পাশাপাশি তিনি অপরিচিত ব্যক্তির কাছ থেকে পানীয় এবং খাবার গ্রহণ থেকে বিরত থাকার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানান।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঢাকা-বরিশাল লঞ্চ রুটে হেলাল ও বাদশা গ্রুপ সক্রিয়। এই গ্রুপে আছে পিরোজপুরের জাহিদ হাসান, বরিশালের ইউসুফ, হালিম, মিল্টন, বরগুনার রনি। নৌরুটের আরেক গ্রুপ হলো মিন্টু শিকদার ও ফারুক ওরফে বিডিআর ফারুক গ্রুপ। এই গ্রুপে রয়েছে শফিকুল, রফিক শিকদার, আবুল, মান্নান, নুরুল ইসলাম, ফরিদ, হাবিব ও মানিক। প্রতিটি রুট আবার ভাড়া দিয়েছে অজ্ঞান পার্টির লিডাররা। বিনিময়ে তারা গ্রুপগুলোর কাছ থেকে কমিশন নিয়ে থাকে।
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, কোরবানি ঈদে অজ্ঞান পার্টির তৎপরতা সবচেয়ে বেশি থাকে। কারণ এ ঈদে কেনাবেচা ঘিরে বিপুল অঙ্কের অর্থ এক জেলা থেকে অন্য জেলায় নিয়ে যান ক্রেতা-বিক্রেতারা। ঈদে অজ্ঞান পার্টির সবচেয়ে লোভনীয় রুট হলো উত্তরবঙ্গ। কারণ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে বেপারীরা কেনাকাটা শেষে টাকা নিয়ে চলে যান।
পুলিশ সূত্রগুলো জানায়, এসব গ্রুপের মধ্যে কোনোটি অপারেশন করছে যমুনা ব্রিজের ওপারে। কোনো গ্রুপ কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের বিভিন্ন হোটেলে। আবার কোনো গ্রুপ খুলনায়। ঢাকা ও আশপাশের অন্তত শতাধিক গ্রুপ তাদের তৎপরতা শুরু করেছে। তাদের মধ্যে শহর আলী গ্রুপ, আবদুল হক গ্রুপ, ফরিদ গ্রুপ, এমরান হাজির গ্রুপ, ডন চৌধুরীর গ্রুপ অন্যতম। তারা সবাই মলম ও অজ্ঞান পার্টির গডফাদার।
অসন্ন ঈদুল আযহা উপলক্ষে রাজধানীতে পুলিশের নিরাপত্তা প্রদানের ব্যাপারে বৃহস্পতিবার দুপুরে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, ঈদে ঘরমুখো মানুষের জন্য আমাদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যাবস্থা থাকবে। টহল পুলিশের পাশাপাশি, সাদা পোশাকে, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন, র্যাব এবং পর্যাপ্ত গোয়েন্দা পুলিশ থাকবে।
তিনি বলেন, গাবতলী, সায়েদাবাদ, মহাখালি এবং ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনালের পাশাপাশি কমলাপুর রেল স্টেশন এবং সদর ঘাট লঞ্চ টার্মিনালে আমাদের বিশেষ নিরাপত্তা ব্যাবস্থা থাকবে। ঈদ উপলক্ষে মলম পার্টির সদস্যরা ওঁত পেতে থাকে। সেজন্যে সব টার্মিনালে পুলিশের পক্ষ থেকে পুলিশ কন্ট্রল রুম থাকবে।
কমিশনার বলেন, আমরা এ পর্যন্ত প্রায় দুই শতাধিক মলম পার্টির সদস্যদের ধরেছি। ঈদে আমাদের বিশেষ নজরদারি থাকবে যাতে করে তারা কোন রকম অপ্রিতিকর ঘটনা না ঘটাতে পারে।
আবাসিক এলাকার নিরাপত্তার ব্যাপারে কমিশনার বলেন, ঈদে ঢাকা শহর অনেকটা ফাঁকা হয়ে যায়। যার ফলে মলম পার্টির পাশাপাশি চোর-ছিনতাইকারীরা এই সুযোগটাকে কাজে লাগাতে চায়। তাই আমরা চোর-ছিনতাইকারীদের নিয়ন্ত্রণের জন্যে সিকিউরিটি কোম্পানির বিভিন্ন সংস্থার সাথে আলোচনা করেছি। তাদের সাথে সমন্বয় করে আমরা নিরাপত্তা প্রদান করাবো।
তিনি বলেন, পুলিশের চোখে কারো চলাচল সন্দেহমূলক হলে এবং অপরাধী মনে হলে তাকে চেক করা হবে। এছাড়া কঠোর নিরাপত্তার জন্যে রাজধানীতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন থাকবে বলেও জানান তিনি।
এমআর/কেএইচ





