পারিবারিকভাবে দেখে আসছি আমাদের কোনো শত্রু নেই। সম্প্রতি কারো সাথে বিরোধও ছিল না। তবুও আমার স্বামীকে জীবন দিতে হলো। টাকাই আমাদের শত্রু। টাকার কারণেই আমার স্বামীর জীবন কেড়ে নিয়েছে ছিনতাইকারীরা।

বিবাহের একবছর না পেরুতেই স্বামী শরীফ হোসেন সায়মন (৩২)কে হারিয়ে গগণবিদারী কান্নায় এমনই আহাজারি করছিলেন স্ত্রী আলপনা ইয়াসমিন রাত্রি।

খিলগাঁওয়ে ছিনতাইকারীদের গুলিতে নিহত সায়মনের হাতের মেহেদির রং এখনও রয়ে গেছে। কিন্তু স্বামী সায়মন নেই। ছিনতাইকারীদের গুলিতে নিহত সায়মনের স্ত্রী রাত্রিকে বারবার বিলাপ করতে দেখা যায়। সায়মনকে হারিয়ে তার শোকাচ্ছন্ন স্ত্রী রাত্রি ভালোভাবে কথাও বলতে পারছিলেন না। খিলগাঁওয়ের গোড়ানে বাসায় গিয়ে দেখা গেছে এই হৃদয়বিদারক দৃশ্য।

গত বৃহস্পতিবার রাতে গোড়ান ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের সামনে ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন মানি এক্সচেঞ্জের ব্যবসায়ী ইসরাইল হোসেন ও ছেলে শরীফ হোসেন সায়মন।

ছিনতাইকারীদের গুলিতে দুজনই আহত হন। তাদের উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পর চিকিৎসকরা ছেলে সায়মনকে (২৮) মৃত ঘোষণা করেন। এঘটনায় দুর্বৃত্তরা তাদের কাছ থেকে ৪৮ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেয় বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়।

ছেলে সায়মন যে বেঁচে নেই তা এখনও জানেন না একই ঘটনায় গুলিবিদ্ধ পিতা ইসরাফিল হোসেন (৫৫)।

খোজ নিয়ে জানা গেছে, সায়মনদের গ্রামের বাড়ি ঢাকার নবাবগঞ্জের সুজাপুরে। গোড়ান এলাকাতেই বড় হয়েছেন সায়মন। পরিচিতজনদের কাছে ভদ্র হিসেবেই পরিচিতি সায়মন। ইসরাফিল হোসেনের চার সন্তানের মধ্যে একমাত্র পুত্র সন্তান ছিলেন সায়মন। একমাত্র ভাইকে হারিয়ে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন তিন বোন।

সায়মনের চাচা মোক্তার হোসেন জানান, ঘটনার পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে ইসরাফিলকে পঙ্গু হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। আজ অস্ত্রোপচার করে ইসরাফিলের শরীর থেকে তিনটি গুলি বের করা হবে। শুক্রবার রাতে একটি গুলি বের করা হয়েছে।

শুক্রবার চিকিৎসক সঙ্কটের কারণে অস্ত্রোপচার করা সম্ভব হয়নি বলে জানান তিনি। শুক্রবার দুপুরে ময়নাতদন্ত শেষে সায়মনের লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে বারডেম হাসপাতালের হিমাগারে স্থানান্তর করা হয়। পিতা ইসরাফিলের ইচ্ছানুযায়ী সায়মনের লাশ দাফন করা হবে বলেও জানান মুক্তার হোসেন।

আহত ইসরাফিলের গাড়িচালক আবদুল আলিম জানান, প্রতি বৃহস্পতিবারেই ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলন করেন ইসরাফিল হোসেন। কিন্তু সেদিন বাসায় ফেরার পথে রাস্তায় তাদের কেউ অনুসরণ করেছিল না তা লক্ষ্য করেন নি।

রাত সাড়ে ৮টায় খিলগাঁওয়ের গোড়ানে শান্তিপুর স্কুলের সামনে ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন ইসরাফিল হোসেন ও তার পুত্র শরীফ হোসেন সায়মন। তারা ওই সময় ১১৫/১২০ মতিঝিলের নিজেদের মালিকানাধীন ‘আদমজী কোর্টে ইউনিভার্সেল মানি এক্সচেঞ্জ’ থেকে ৪৮ লাখ টাকা নিয়ে বাসায় ফিরছিলেন।

চালক আবদুল আলীম গোড়ান স্কুলের পাশে ইসরাফিল হোসেন ও সায়মনকে নামিয়ে দিয়ে চলে যান গ্যারেজে গাড়ি রাখতে। এরই ফাঁকে তিনটি মোটরসাইকেলযোগে ছিনতাইকারীরা তাদের লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি করে টাকার ব্যাগ নিয়ে পালিয়ে যায়।

চিৎকার শুনে আশেপাশের লোকজন গিয়ে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাদের উদ্ধার করে প্রথমে খিলগাঁওয়ের খিদমাহ হাসপাতাল, পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। রাত পৌনে ৯টার দিকে হাসপাতালে মারা যান সায়মন।

এ ঘটনায় শুক্রবার বিকেলে অজ্ঞাত তিন-চার জনকে আসামি করে নিহতের চাচা মুজিবুর রহমান বাদী হয়ে খিলগাঁও থানায় একটি মামলা করেছেন।

এই ঘটনার পর দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে খিলগাঁও থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সিরাজুল ইসলাম শেখকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তার স্থলে বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন ওয়াহিদুজ্জামান।

নতুন ওসি ওয়াহিদুজ্জামান টাইমনিউজবিডিকে বলেন, পুলিশের পক্ষ থেকে ধারণা করা হচ্ছে টাকার লোভেই ছিনতাইকারীরা এ ঘটনা ঘটিয়েছে। অপরাধীদের গ্রেপ্তার করতে পুলিশের একাধিক টিম অভিযান চালাচ্ছে। খুব শিগগির অপরাধীদের গ্রেফতার করা সম্ভব হবে বলে জানান তিনি।

পুলিশের মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার মো. আশরাফুজ্জামান টাইমনিউজবিডিকে বলেন, পুলিশ ছিনতাইয়ের বিষয়টি মাথায় রেখে তদন্ত চালালেও এর পেছনে অন্য কোনো কারণ ছিল কি-না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ পর্যন্ত তদন্তে ঘটনাটি ছিনতাই মনে হচ্ছে। ঘটনার সময় ৪৮ লাখ টাকা দুর্বৃত্তরা নিয়ে যায় বলে হতাহতদের স্বজনরা জানিয়েছেন।

ঢাকা, জেইউ, 0৬ সেপ্টেম্বর, টাইমনিউজবিডি.কম,এসএইচ