বহুমুখী তদবির এবং কমিশনের গ্রীন সিগন্যাল না পেয়ে দুদকের পরিচালক যতন কুমার রায় বেশ কয়টি আলোচিত মামলার অভিযোগের তদন্ত ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন দাখিল না করেই আগামী সোমবার অবসরে যাচ্ছেন।
জানা যায়, সম্প্রতি উপ পরিচালক থেকে পদোন্নতি পাওয়া পরিচালক যতন কুমার রায় রীতি মতো প্রভাবশালী আমলা, পুলিশ প্রশাসন, সরকারি কর্মচারী, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়িসহ দুর্নীতিবাজ ও অবৈধ সম্পদের মলিকদের আতঙ্ক বলে খ্যাত ছিলেন।
বেশ কয়টি আলোচিত মামলা ও অভিযোগের তদন্ত এবং অনুসন্ধানী প্রতিবেদন দাখিল না করেই চলে যাচ্ছেন। তার রেখে যাওয়া উল্লেখযোগ্য কয়েকটি আলোচিত মামলা ও অভিযোগের মধ্যে রয়েছে:
গত ১৩ মার্চ একটি প্রাইভেট কারসহ রামপুরা থানা পুলিশ ২৩৫টি সোনার বার আটক, ১৬৫টি বার আত্মসাতের মামলার তদন্ত। এ মামলায় আসামি মাহিন ও সমীর পুলিশের এসআই মঞ্জুরুল ইসলাম, কনস্টেবল আকাশ চৌধুরী ও ওয়াহেদুল ইসলাম, ড্রাইভার সজিব সহ ৫ জন।
ডিবি’র সাব-ইন্সপেক্টর ফজলুল হক বাদী হয়ে দন্ডবিধির ৪০৯/ ১০৯/১১৪ ধারা এবং দুর্নীতি দমন প্রতিরোধ আইনের ৫(২)ধারায় মামলা করেন ।
সোনা চোরাচালানী চক্র ও প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপের কারণে দুদকের পরিচালক যতন কুমার রায় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেননি। তিনি কয়েক দফায় বেশ কয়জন পুলিশ কর্মকর্তাদের দুদকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন।
গত ১৬ জুন রমনা জোনের পুলিশ কর্মকর্তা (পুলিশের এসি) শিবলী নোমানকে, গত ২৭ এপ্রিল রামপুরার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কৃপা সিন্দু বালা, ওসি (তদন্ত) নাসিম আহমেদ, এসআই কামরুজ্জামানকে, গত ৭ মে ডিবির ৯ কর্মকর্তাসহ ডিবির ১৯ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়।
আর তাদের জিজ্ঞাসাবাদের মধ্য দিয়ে পুলিশের উচ্চ এবং মধ্যম পর্যায়ের বেশ কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার নাম বেরিয়ে আসে। এর পরই রহস্যজনক কারণে এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন তৈরির কাজ থেমে যায়।
আলোচিত সোনা চোরাচালান মামলার প্রধান আসামি ‘দি ঢাকা মানি একচেঞ্জ’র মালিক নবী নওয়াজ খানকে গত ১৩ অক্টোবর তলব করেন দুদকের যতন কুমার রায়। মানি একচেঞ্জের আড়ালে শত কোটি টাকার সোনা চোরাচালানের তথ্য উদঘাটনে নেমেছে দুদক। ২০১২ সালের ১০ সেপ্টেম্বর বিমান বন্দর থানায় সাড়ে ১৩ কেজি সোনারবার উদ্ধার মামলায় নবী নওয়াজ খানসহ ১৯ জন আসামি রয়েছে।
এমপি এনামুলের অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান :
রাজশাহী-৪ এর এমপি ও এনা প্রপার্টিজের চেয়ারম্যান এনামুল হকের ৮৩ কোটি ১৩ লাখ টাকার আয়কর ফাঁকি এবং গত ১৬ সেপ্টেম্বর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এনামুল হক ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদের অভিযোগে মামলার সুপারিশ রেখেছেন।
এমপি এনামুল হকের বিরুদ্ধে ২০৭ কোটি টাকা এবং তার স্ত্রী তহুরা হকের বিরুদ্ধে প্রায় ৪৯ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ রয়েছে।
এনামুল হকের কোম্পানীর ‘নেট প্রফিট আফটার ট্যাক্স ’হয়েছে ৮৪ কোটি টাকা। কিন্তু আপনারা সরকারকে আয়কর দিয়েছেন মাত্র ৮৭ লক্ষ টাকার। আর আয়কর ফাঁকি দিয়েছেন ৮৩ কোটি ১৩ লাখ টাকার।
এদিকে এমপি এনামুল হককে দুদকে চ্যালেঞ্জ করে বলেছেন, তার সম্পদ বেড়েছে এতে দোষের কি। তিনি ব্যবসা করেন, তাই সম্পদ বেড়েছে। দুদক তার কিছুই করতে পারবে না। গত ১০ সেপ্টেম্বর রাজশাহীর এমপি এনামুল হকের পক্ষ থেকে দুদক কর্মকর্তাকে হাওয়া করে ফেলার হুমকি দেয়া হয়। এ বিষয়ে রমনা থানায় তিনি জিডিনং-৭৭৭ দায়ের করেছেন।
সচিব শওকতের প্লট জালিয়াতির ৩ মামলা:
রাজউকের প্লট জালিয়াতির ৩ মামলার আসামি প্রবাসী কল্যাণ সচিব ড. খোন্দকার শওকত হোসেন দুদক আইনের ২২ ধারায় ব্যক্তিগত শোনানির তদন্ত প্রতিবেদন আটকে দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
অথচ প্লট জালিয়াতির ৩ মামলার তদন্ত প্রতিবেদনের খসড়ায় ৭ জনকে আসামির যুক্ত হয়েছ। এরমধ্যে শওকতের মা জাকিয়া আমজাদ, স্ত্রী আয়েশা খানম, অতিরিক্ত সচিব আতাউল হক মোল্লা, তার স্ত্রী কামরুন নাহার ঝর্না, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব মোহাম্মদ মুসা, রাজউকের উপ-পরিচালক শেখ হাফিজুর রহমান, উচ্চমান সহকারি সাইদুল ইসলামের নাম থাকছে। এ প্রতিবেদনটি চাপা দিয়ে রাখা হয়েছে বলে জানা যায়।
গত ২২ এপ্রিল প্রবাসী কল্যাণ সচিব ড. খোন্দকার শওকত হোসেনের বিরুদ্ধে মতিঝিল থানায় পৃথক ৩টি মামলা দায়ের করে দুদক। আর এমামলাগুলো তদন্ত করেন দুদকের কর্মকর্তা যতন কুমার রায়।
তবে তদন্ত কর্মকর্তা একাধিকবার রাজউকের তৎকালিন চেয়ারম্যান প্রকৌশলী নূরুল হুদা, সাবেক চেয়ারম্যান শহিদ আলম, সাবেক সদস্য মোঃ আনোয়ারুল ইসলাম সিকদার , আখতার হোসেন ভুইয়া (সদস্য-এস্টেট ), এম. মাহবুব উল আলম (সদস্য-উন্নয়ন), নাজমুল হাই (সদস্য-প্রশাসন ও ভূমি), শেখ মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান (সদস্য-পরিকল্পনা), উপ-পরিচালক (এস্টেট-২) মোহাম্মদ মুসা, রাজউকের সাবেক সচিব (বর্তমানে আরইবি’র সদস্য) আতাউল হক মোল্লা, সাবেক উপ-পরিচালক (এস্টেট-২) বর্তমানে ড. শওকত হোসেনের অধীনে কর্মরত প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব মোহাম্মদ মুসা, রাজউকের উপ-পরিচালক শেখ হাফিজুর রহমান, উচ্চমান সহরকারি সাইদুল ইসলাম, আতাউল হক মোল্লার স্ত্রী কামরুন নাহার ঝর্নার সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি বেরিয়ে এসেছে জিজ্ঞাসাবাদকালে।
অভিযোগ রয়েছে, শওকত হোসেন উত্তরা প্রকল্পে সেক্টর-১৭/বি, রোড-৪/এ ৩ কাঠার পরিবর্তে ৫ কাঠা বরাদ্দ নিয়ে তা থেকে ২ কাঠা উপহার দেন তৎকালিন রাজউক সচিব আতাউল হক মোল্লাকে। শওকত হোসেন আতাউল হকের স্ত্রীর বড়বোন সুরাইয়ার নামে ২ কাঠা ‘ক্রয়’ দেখান।
পরে বোনের কাছ থেকে ছোট বোন ঝর্নাকে ‘হেবা’ দেখান। যা এখন কার্যত ভোগ-দখল করছেন আতাউল হক নিজেই। এ কারণে শওকতের সঙ্গে মামলায় জড়িয়ে যাচ্ছেন আতাউল হকের স্ত্রী।
দুদক পরিচালক যতন কুমার রায় বলেন, তার হাতে বড় বড় মামলা ও অভিযোগ তদন্তের কাজ ছিল। তিনি চেষ্টা করেছেন, আর ২ দিন অফিস করবেন। এর মধ্যে যতটুকু সম্ভব তাই করবেন। এর বেশি কিছু বলতে তিনি নারাজ।
একে/এসএইচ





