নারায়ণগঞ্জে চাঞ্চল্যকর সাত খুনের মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেনকে আজ (বৃহস্পতিবার) সকালে কঠোর নিরাপত্তায় স্থানীয় একটি আদালতে হাজির করা হয়।

কঠোর নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা রক্ষা করে সকাল সাড়ে ৯টায় নারায়ণগঞ্জ অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট অশোক কুমার দত্তের আদালতে হাজির করা হয় নূর হোসেনকে।

সিদ্ধিরগঞ্জ থানার একটি চাঁদাবাজি মামলায় আদালতে শুনানি শেষে আবারও কঠোর নিরাপত্তা তাকে ঢাকার কাশিমপুর কারাগারে প্রেরণ করা হয়।

নারায়ণগঞ্জ কোর্ট পুলিশের উপ পরিদর্শক গোলাম হোসেন জানান, ২০১৩ সালের ৩০ মে সিদ্ধিরগঞ্জের হিরাঝিল এলাকায় ইকবাল হোসেন নামের এক ব্যক্তির কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভাঙচুর করে নূর হোসেন ও তার সহযোগিরা।

ওই ঘটনায় ইকবাল হোসেন বাদি হয়ে নূর হোসেন ও তার ভাতিজা কাউন্সিলর শাহজালাল বাদলসহ ৬ জনের বিরুদ্ধে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় চাঁদাবাজির মামলা দায়ের করে। পরে পুলিশ ওই ৬জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দেয়। আদালত এ মামলায় আগামী ১১ জানুয়ারি চার্জ গঠনের দিন ধার্য্য করেন।

উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংকরোডের ফতুল্লার শিবু মার্কেট এলাকা থেকে কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম, আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাতজনকে অপহরণ করে র‌্যাব-১১ এর একটি টিম। এর তিন দিন পর তাদের লাশ নারায়ণগঞ্জের উপকণ্ঠে শীতলক্ষ্যা নদীতে ভেসে উঠে।

অপহরণের পরদিন অপহৃত নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম ফতুল্লা থানায় নূর হোসেনসহ ছয়জনকে আসামি করে মামলা করেন। মামলার এজাহারে ‘র‌্যাবকে দিয়ে’ অপহরণের অভিযোগ করা হয়।

তিন দিন পরে নদী থেকে লাশ উদ্ধার হলে মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়। পরে আইনজীবী চন্দন সরকারের জামাতা বিজয় কুমার পাল বাদী হয়ে অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে আরেকটি হত্যা মামলা করেন।

ওই ঘটনার পর পরই স্থানীয় প্রভাবশালী এক রাজনীতিবিদ ও পুলিশের সহায়তায় নূর হোসেন ভারত পালিয়ে যায় বলে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে গত বছরের (২০১৪) ১৪ জুন ভারতে অবস্থানকালে ভারতীয় পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন নূর হোসেন। এরপর বিগত কয়েক মাস ভারতীয় কারাগারেই আটক ছিলেন নূর।

গত ১২ই নভেম্বর (২০১৫) ভারত থেকে নূর হোসেনকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর প্রক্রিয়া শুরু হয়। বেনাপোল সীমান্ত থেকে কঠোর নিরাপত্তায় নূর হোসেনকে ১৩ই নভেম্বর সকাল ৬টা ৫০ মিনিটে ঢাকার উত্তরার র‌্যাব-১ কার্যালয়ে আনা হয়।

পরে তাকে নারায়ণগঞ্জ পুলিশ ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর সকাল সোয়া ৮টার দিকে নূর হোসেনকে নারায়ণগঞ্জ পুলিশ লাইনে নিয়ে আসা হয়। সেখান থেকে দুপুরে তাকে আদালতে হাজির করা হয়। পরে ১১ মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে নূর হোসেনকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শহিদুল ইসলাম।

এদিকে, এতবড় একটি হত্যা মামলার প্রধান আসামীকে কোন ধরনের রিমান্ড না দিয়ে কারাগারে প্রেরণ করায় এই মামলার বিচারের স্বচ্ছতা নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন উঠলে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, নূর হোসেনের বিরুদ্ধে বিচারাধীন সব মামলারই চার্জশীট আগেই আদালতে জমা দেয়ায় তার বিরুদ্ধে রিমান্ড আবেদনের সুযোগ নেই।

উল্লেখ্য, নারাগঞ্জের ৭ খুনের ঘটনায় দুটি মামলাসহ এ পর্যন্ত মোট ১৩টি মামলায় নূর হোসেনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

তবে, আলোচিত সাত খুন মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেনকে রিমান্ড না চাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন নিহত কাউন্সিলর নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটিসহ স্বজনরা।

বিউটি বলেন, মামলাগুলোতে যেভাবে নূর হোসেনের ভূমিকা দেখানো হয়েছে, তাতে সে আইনের ফাঁক গলিয়ে বেরিয়ে আসবে। অথচ সে হচ্ছে খুনের মুল পরিকল্পনাকারী। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ না করে কীভাবে মামলার চার্জশিট পূর্ণাঙ্গ হয়? তাকে রিমান্ডে নিলে এর সাথে আর কারা জড়িত তা বের হয়ে আসতো।

তিনি প্রশ্ন রাখেন, নজরুলের এমন কি অপরাধ ছিলো যে তাকে হত্যা করে পানির নিচে লুকিয়ে রাখতে হলো। তার অপরাধ থাকলে, তাকে আইনের আওতায় আনতে পারতো।

বিউটি ন্যায় বিচারের জন্য প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপও কামনা করেন।

লোমহর্ষক ওই হত্যাকান্ডের ১১ মাস পরে গত ৮ এপ্রিল (২০১৫) অবশ্য মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সংস্থা জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) দুটি মামলায় অভিন্ন চার্জশিটে নূর হোসেন, চাকরিচ্যুত সাবেক র‌্যাব কর্মকর্তাসহ ৩৫জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট জমা দেয়। তাদের মধ্যে ২২জন গ্রেফতার রয়েছে। নূরের পর বাকি ১২ জন এখনও পলাতক।

কেবি