মামলা হয়েছে। বদল হয়েছে হাত। জোরালোভাবে ঘটনার তদন্ত শুরু হতে না হতেই সাগর পাড়ি দিয়ে মালদ্বীপ পুলিশ কর্মকর্তারা হাজির বাংলাদশে। তাদের চেষ্টা রাজশাহীতে পড়তে আসা স্বদেশের আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জনকারী মডেল তারকা রাউধা আতিফের মৃত্যু কাহিনী আসলে হত্যা না আত্মহত্যা।

আজ মঙ্গলবার সকাল থেকেই মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সাথে নীল নয়নার মারা যাবার রহস্য উদঘাটনে তাদের কাজ শুরু। দেশটির সিনিয়র সহকারি পুলিশ সুপার (এএসপি) মোহাম্মদ রিয়াজ ও সিনিয়র ইন্সপেক্টর আলী আহমেদ দ্বীপ কন্যার শিক্ষা গ্রহণের প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজের সহপাঠিসহ কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলবেন। আর দেখবেন সেই ২০৯ নং রুমটি। যে ঘরটিতে সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলে ছিলেন রাউধা। বের করার চেষ্টা করবেন কেন এমন ঘটনা ঘটলো। রাজশাহী মহানগর পুলিশের মুখপাত্র সিনিয়র সহকারি কমিশনার ইফতে খায়ের আলম সাংবাদিকদের এমন তথ্যই জানিয়েছেন।

রাউধার আত্মহত্যার বিষয়টি কোনভাবেই মেনে নেননি বাবা মোহাম্মাদ আতিফ ও মা আমিনাথ মুহারমিমাথ। তবে তারা স্বদেশে ফেরার আগেও কোন লিখিত কোন অভিযোগ করেননি। এমনকি তাদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি ময়না তদন্তের রিপোর্টটিও। তাই ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজের পক্ষ থেকে করা অপমৃত্যু মামলাটি দেখভাল করার জন্য রাষ্ট্রদূত আইশা শান শাকিরকে দায়িত্ব দেন তারা। মুলত সেই কারণে স্বদেশের পুলিশের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

আর সোমবার বিকেলে বিমানযোগে রাজশাহী এসে পৌঁছান এই দুই পুলিশ কর্মকর্তা। মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের পাশাপাশি তারাও বিষয়টি দেখবেন এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে বলে সাংবাদিকদের জানান পুলিশের মুখপাত্র। মালদ্বীপের দুই পুলিশ কর্মকর্তা সার্কিট হাউসে রাত্রীযাপন করলেও সোমবার কোথাও বের হননি।

৩১ মার্চ শুক্রবার রাউধার লাশের ময়নাতদন্ত শেষে পরের দিন শনিবার প্রাথমিক রিপোর্টেও আত্মহত্যার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। ফলে পুলিশ কর্তৃপক্ষের সামনে এখন প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে কি এমন ঘটেছিল তার সাথে, যার কারণে তাঁকে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে হয়েছে? নাকি কেউ তাঁকে আত্মহত্যা করার ব্যাপারে প্রভাবিত করেছে? এই সকল প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা চলছে। কারণ একদিকে রাউধার বাবা-মায়ের আত্মহত্যার বিষয়টি মেনে না নেয়া এবং সহপাঠিদের বক্তব্য ঘটনা ঘটার আগের দিন পর্যন্ত তার চলাফেরা বা আচরণে আত্মহত্যা করার মত কিছু লক্ষ্য করা যায়নি। তাই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাবার জন্য রাউধার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপ নিয়ে চলছে জোর অনুসন্ধান। এই দুই মাধ্যম থেকেই ঘটনার কোন ক্লু মিললেও মিলতে পারে বলে প্রত্যাশা করছেন মামলার তদন্তকারীরা।

সিনিয়র সহকারি কমিশনার ইফতে খায়ের আলম সাংবাদিকদের বলেন, রাউধার মৃত্যুতে শাহ মখদুম থানায় দায়ের করা অপমৃত্যুর মামলাটি মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কাছে রোববার হস্তান্তর করা হয়েছে। একই সাথে রাউধার রুম থেকে উদ্ধার হওয়া একটি ল্যাপটপ ও একটি মোবাইল ফোন গোয়েন্দা পুলিশ হেফাজতে নিয়েছেন। পোস্টমর্টেম রিপোর্টে বলা হয়েছে রাউধা আত্মহত্যা করেছেন। তবে কেন আত্মহত্যা করেছেন সে ব্যাপারে এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোন তথ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। আর এসব ব্যাপারে কথা বলা ও আলোচনার জন্য মুলত মালদ্বীপের দুই পুলিশ কর্মকর্তা রাজশাহীতে এসেছেন বলেও জানান তিনি।

ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজের সেক্রেটারি আব্দুল আজিজ রিয়াদ বলেন, মালদ্বীপের গণমাধ্যমে রাউধার আত্মহত্যার ঘটনাটি ভিন্নভাবে প্রকাশ করা হয়েছে বলে শুনেছি। সে কারণে হয়ত দুই পুলিশ কর্মকর্তা এসেছেন। তবে কলেজ কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করা হয়নি বলে জানান তিনি।

মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার আল আমিন হোসাইন সাংবাদিকদের বলেন, ‘রাউধার আত্মহত্যার বিষয়ে শাহ মখদুম থানায় দায়ের করা অপমৃত্যু মামলাটি রোববার হস্তান্তর করা হয়। সোমবার বিকেলে মালদ্বীপের দুই পুলিশ কর্মকর্তা রাজশাহীতে এসেছেন। তারা রাউধার আত্মহত্যার বিষয়ে তদন্ত করতে চান। মঙ্গলবার থেকেই সেই কার্যক্রম শুরু হবে।

১৯৯৬ সালের ১৮ মে মালদ্বীপের মেয়ে রাউধা আতিফের জন্ম। গত ২৯ মার্চ বুধবার দুপুরে রাজশাহী ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ছাত্রী হোস্টেলের ২০৯ নম্বর কক্ষে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। তবে পুলিশ পৌঁছার আগেই সহপাঠীরা রাউধার ঝুলন্ত লাশ নামিয়ে ফেলেন। গত ৩০ মার্চ বৃহস্পতিবার রাউধার লাশ দেখতে রাজশাহীতে আসেন মালদ্বীপের রাষ্ট্রদূত আয়েশা শান শাকির এবং তার মা-বাবাসহ পরিবারের সদস্যরা।

৩১ মার্চ শুক্রবার তিন সদস্যের মেডিকেল বোর্ড গঠনের মাধ্যমে তার ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। রাউধা আত্মহত্যা করেছে উল্লেখ করে বোর্ড শনিবার ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। ওইদিন দুপুরে রাজশাহী মহানগরীর হেতেম খাঁ কবরস্থানে মডেল কন্যাকে দাফন করা হয়।

নীল নয়না রাউধা ছিলেন রাজশাহী ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এমবিবিএস দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। তিনি পড়ালেখার পাশাপাশি মডেলিং করতেন। গত বছরের অক্টোবরে বিখ্যাত ম্যাগাজিন ‘ভোগ’-এর ভারতীয় সংস্করণের একটি সংখ্যার প্রচ্ছদে আরও পাঁচ তরুণীর সাথে নিজের জায়গা করে নেন তিনি।

জারিফ