ডা: শামারুখ মেহজাবিনের রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় মুখে কুলুপ এটেছে পুলিশ। মেহজাবিন খুন হয়েছে না আত্মহত্যা করেছে সে ব্যাপারে কোনো কথাই বলছে না তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা।
নিহতের পিতার করা হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বলছেন, মামলার যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে। শুধু ময়না তদন্ত হাতে পাবার পালা। ময়না তদন্তের রিপোর্ট হাতে পেলে মেহজাবিনের মৃত্যুর রহস্য উন্মোচিত হবে।
গত ১৩ নভেম্বর (বৃহস্পতিবার) বিকাল আড়াইটার দিকে সাবেক সাংসদ টিপু সুলতানের ছেলে হুমায়ুন সুলতানের স্ত্রী শামারুখ মেহজাবিনকে (২৬) রাজধানীর ধানমন্ডির সেন্ট্রাল হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। বিকাল সাড়ে চারটার দিকে স্বামী হুমায়ুন সুলতানের দেয়া খবরে হাসপাতালে গিয়ে মেহজাবিনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
ঘটনার দিন বৃহস্পতিবার রাতেই নিহতের পিতা নুরুল ইসলাম ধানমন্ডি থানায় বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় মেহজাবিনের শশুর খান টিপু সুলতান, শাশুড়ি জেসমিন আরা ও স্বামী হুমায়ুন সুলতানকে আসামী করা হয়েছে।
হত্যা মামলার পর থেকে তদন্ত করে যাচ্ছে ধানমন্ডি থানা পুলিশ। বৃহস্পতিবার রাতে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই কাজী শরিফুল ইসলামের সাথে কথা হলে তিনি টাইমনিউজবিডিডটকমকে বলেন, “মামলার স্বার্থে মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে কিছুই বলা যাচ্ছে না। তবে এতোটুকু বলতে পারি, মামলার তদন্ত অনেক দূর এগিয়েছে। মামলা তদন্ত করতে গিয়ে আমরা অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছি”।
তিনি বলেন, কাজের বুয়া রেজিনাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। বুধবার রাতে মেহজাবিনের শশুর খান টিপু সুলতান, শাশুড়ি জেসমিন আরাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে আমরা অনেক তথ্য জেনেছি। তা তদন্তের কাজে লাগবে।
স্বামী হুমায়ুন সুলতানকে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী তিন দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। সে মেহজাবিন নিহত হবার ঘটনার সাথে জড়িত নয় বলে পুলিশকে জানিয়েছে।
তদন্ত কর্মকর্তা এসআই কাজী শরিফ বলেন, মেহজাবিন শশুরবাড়ি থেকে একটি ডাইরি উদ্ধার করেছি। তা সুইসাইড নোট আলামত হিসেবে গুরুত্বসহ দেখা হচ্ছে।
তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, যথাযথ নিয়মে নিহতের ঘটনায় বাসা থেকে আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। ময়না তদন্তের রিপোর্টের জন্য আমরা অপেক্ষা করছি। ময়না তদন্তের রিপোর্ট প্রকাশিত হলে মেহজাবিন খুন না আত্মহত্যা করেছেন তা জানা যাবে।
তবে নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, মেহজাবিন আত্মহত্যা করেনি। তাকে হত্যা করা হয়েছে। পুলিশ নানান বিষয় দেখিয়ে মামলার তদন্ত দীর্ঘায়ু করছেন। মেহজাবিনের শশুর সরকার দলীয় সাবেক সংসদ সদস্য হওয়ায় মামলার তদন্তে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ করেছেন তারা।
এ ব্যাপারে কথা বলে নিহতের বাবা নুরুল ইসলাম টাইমনিউজবিডিডটকমকে বলেন, ১২ই নভেম্বর সকাল ১১টায় মোবাইলফোনে কল দিয়ে আমার সাথে প্রায় ৩২ মিনিট কথা বলে মেহজাবিন। তার পরের দিনই নিহতের ঘটনা ঘটে।
তিনি বলেন, ফোনে কথা বলার সময় মেহজাবিন জীবন নিয়ে শঙ্কার কথা আমাকে বলেছিল। মেহজাবিন আমাকে ওর শ্বশুরের জালিয়াতির অনেক ডকুমেন্ট পেয়েছে বলে জানিয়েছিল। শশুরের দুর্নীতি বিষয়ে আমার সাথে মেয়ের কথোপকথন টিপু সুলতান জানতে পেরে মেহজাবিনকে খুন করেছে বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, আমরা পুলিশকে কলট্রাকিং করে সেই দিনের কথাগুলো বের করতে অনুরোধ করেছি। সে কথোপকথনের বিষয়টি মামলার তদন্তে সংযুক্ত করা হলে খুনীদের মুখোস উন্মোচিত হবে বলে দাবি করেন তিনি।
নুরুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, আমরা কলট্রাকিং করে রেকর্ডিং উদ্ধারের জন্য অনুরোধ জানালেও পুলিশ এখনো সেকাজটি করেনি। বরং বিভিন্নভাবে মামলার তদন্ত দীর্ঘায়ু করা হচ্ছে।
তবে, মেহজাবিনকে হত্যা করা হয়েছে নাকি আত্মহত্যা করেছেন সে ব্যাপারে মুখ না খুললেও লাশের সুরতহাল প্রতিবেদনে আত্মহত্যার বিষয়টিকে গুরুত্ব্ দিয়েছে পুলিশ। মামলার তদন্ত করতে গিয়ে একটি সুইসাইড নোট পাওয়া গেছে বলে পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে। সেই সুইসাইড নোটে কি লেখা ছিল সে সম্পর্কে কোনো তথ্য দিতে নারাজ তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তা।
এ ব্যাপারে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই কাজী শরিফ বলেন, মেহজাবিন শশুরবাড়ি থেকে যে ডাইরি উদ্ধার করা হয়েছে তা সুইসাইড নোট আলামত হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। তা যাচাই বাচাই করা হচ্ছে।
নিহতের পরিবার দাবি করেছেন ওই ডায়েরির লেখা মেহজাবিনের হাতের নয় অন্য কারো। অন্য কারো হাতের লেখা বা অন্য কেউ উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে ডায়েরিতে কিছু লিখে থাকতে পারে। তবে আমরা সবপক্ষের বক্তব্য বিবেচনায় রেখে সঠিকভাবে মামলার তদন্ত করে যাচ্ছি। হাতের লেখা মেহজাবিনের হাতের লেখার সাথে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে।
মামলার তদন্ত দীর্ঘায়ু করতেই পুলিশ নিহতের স্বজনদের অনুরোধ করা স্বত্ত্বেও পিতার সাথে মেহজাবিনের সেই দিনের কথোপকথনের রেকর্ডিং সংগ্রহ করেনি বলে যে অভিযোগ করেছে স্বজনরা সে সম্পর্কে তিনি বলেন, পুলিশের পক্ষে সেদিনের কথোপকথনের রেকর্ডিং সংগ্রহ করার সুযোগ নেই। কারণ আমাদের কাছে সে ধরণের কোনো যন্ত্র নেই। আর অন্য কোনো মাধ্যমে তা সংগ্রহ করতে গেলে তা ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে করতে হবে। তা আমরা সে চেষ্টা করে যাচ্ছি।
মামলা তদন্ত সঠিকভাবে হচ্ছে বরং তদন্তকাজে কোনো পক্ষ প্রভাবিত করছে না বলেও দাবি করেন মামলার এ তদন্ত কর্মকর্তা।
এ ব্যাপারে ধানমন্ডি থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবুবকর সিদ্দিক টাইমনিউজবিডিডটককে বলেন, স্বামী হুমায়ুনকে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। শশুর-শাশুড়ি ও কাজের বুয়াকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তবে তদন্তের স্বার্থে এখনই তা প্রকাশ করা সম্ভব না।
তিনি বলেন, মামলার তদন্তে নজরদারি রাখছেন পুলিশের উর্ধ্বোতন কর্মকর্তাগণ। তারা বারবার তাগিদ দিচ্ছেন সঠিকভাবে মামলার তদন্ত কাজ সম্পন্ন করা হয়।
জেইউ/কেএইচ





