বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা একহালি মামলা সচল হয়েছে। অর্ধযুগ পরে এসব মামলা সচল হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এসব মামলা সচল করার সঙ্গে চলমান আন্দোলনের যোগসূত্র রয়েছে।
মামলা চারটি হলো বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি দুর্নীতি মামলা, নাইকো দুর্নীতি মামলা, গ্যাটকো দুর্নীতি মামলা ও জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা।
এরমধ্যে বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি জেবিএম হাসানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে দুটি এবং অন্য একটি বেঞ্চে দুটি মামলার কার্যক্রম চলছে।
মামলাগুলোর মধ্যে গত বুধবার গ্যাটকো দুর্নীতি মামলার রুলের শুনানি হয়েছে। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার বিশেষ আদালতের বিচারক পরিবর্তনের বিষয়ে আবেদনের শুনানিও হয়েছে বৃহস্পতিবার। এর আগে একই মামলায় বকশি বাজারের আলিয়া মাদরাসা মাঠে বিশেষ আদালত বিচারক-৩ খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি করেন।
বেগম খালেদা জিয়ার আইনজীবী ও সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, ‘দুর্নীতির এসব মামলা হাইকোর্টে সচল করা হয়েছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে।’
তিনি অভিযোগ করেন, ‘খালেদার বিরুদ্ধে এই মামলাগুলো রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক।’ হাইকোর্টে সম্প্রতি খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে পুরোনো মামলাগুলো সচলের জন্য দুদকের আবেদন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত বলেও মন্তব্য করেন সিনিয়র এই আইনজীবী।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে হাজারো মামলা আছে। কিন্তু সরকার সেগুলো সচল না করে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলাগুলো সচল করছে। তার মানে হলো রাজনৈতিকভাবে বেগম খালেদা জিয়াকে হেয় করার জন্যই সরকার পুরোনো মামলাগুলো সচল করছে।’
এক প্রশ্নের জবাবে খন্দকার মাহবুব বলেন, ‘জিয়া অরফানেজ ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টে কুয়েত থেকে টাকা অনুদান দেয়া হয়েছে। এখানে সরকারের কোনো টাকা নেই। কিন্তু সরকার খালেদা জিয়াকে রাজনৈতিকভাবে হয়রানি করার জন্য তার বিরদ্ধে দুর্নীতির মামলাগুলো সচলের উদ্যোগ নিয়েছে। জিয়াউর রহমানকে স্মরণ করতেই কুয়েত থেকে ওই টাকা দেয়া হয়।’
তিনি বলেন, ‘পুরোনো মামলা ছাড়াও যেকোন তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সরকার বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করছে।’
এর আগে ২৫ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় আদালতে হাজির না হওয়ায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জামিন বাতিল করে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত।
অপরদিকে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় আদালতে হাজির না হওয়ায় ৪ মার্চ তারেক রহমানকে সশরীরে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেন আদালত।
বিচারকের প্রতি অনাস্থার বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, ‘বিচারকের প্রতি অনাস্থা জানানোর পরও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা অবৈধ ও অনৈতিক। সাধারণত যেকোন মামলার শুনানি এক থেকে দেড় মাসের জন্য মুলতবি করা হয়। কিন্তু খালেদা জিয়ার মামলার শুনানি মুলতবি করা হয় ৪ থেকে ৫ দিন। এ মামলায় সরকার কেন এত তড়িঘড়ি করছে?’
দুর্নীতির মামলাগুলো সচলের বিষয়ে জানতে চাইলে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আইনজীবী অ্যাডভোকেট খুরশীদ আলম খান বলেন, ‘বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে যে সব দুর্নীতির মামলা সচল করা হচ্ছে সেগুলো আগে থেকেই দায়ের করা ছিল।’
আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে পূর্বে কোনো মামলা দায়ের করা থাকলে সেগুলো যেকোন সময় সচল হতে পারে । এটা যে শুধু রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই সচল করা হচ্ছে তা নয়।’
খন্দকার মাহবুবের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, ‘আমি অন্যায় করলে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ মামলা করতেই পারে। সে জন্য আমি বলবো এগুলো রাজতৈতিক উদ্দেশ্যে করা হয়েছে, বিষয়টি এ রকম নয়।’
জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে পরোয়ানা আইনগতভাবেই দেয়া হয়েছে। ফৌজদারি মামলায় উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ ছাড়া বিচারিক আদালতে মামলার কার্যক্রম চলতে কোনো বাধা নেই।’
মাহবুবে আলম বলেন, ‘খালেদা জিয়া বিচারিক আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন চাইতে পারেন, রিভিউ করতে পারেন। আর নিম্ন আদালত জামিন নামঞ্জুর করলে উচ্চ আদালতে আসতে পারবেন।’
আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি উদ্যোগ নিয়ে বেগম খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর বিদেশে পাঠানো টাকা ফেরত এনেছি। এই টাকা ফেরত আনতে আমি বিদেশে গিয়েছি। দেশের টাকা দেশে ফেরত এনেছি। কিন্তু কিছু লোক বলেছেন আমি কাজগুলো ঠিক করিনি। আমি বলবো তারা এরকম মন্তব্য করে অন্যায় করেছেন। ’
উল্লেখ্য, ১/১১ -এর আমলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২০০৮ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি শাহবাগ থানায় খালেদা জিয়া ও তার মন্ত্রিসভার ১০ সদস্যসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি দুর্নীতি মামলা করেন। আর ২০০৭ সালের ২ সেপ্টেম্বর খালেদা জিয়া, তার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে তেজগাঁও থানায় করা হয় গ্যাটকো দুর্নীতি মামলা।
ইআর





