আইনজীবীদের ত্রুটির কারণেই বিচারপ্রার্থীরা সুবিচার বঞ্চিত হন এবং ৬০ থেকে ৭০ ভাগ মামলায় আইনজীবীদের ত্রুটির কারণেই তারা হেরে যান- প্রধান বিচারপতির এমন মন্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছে সুপ্রিম কোর্টে আইনজীবী সমিতি।

আজ (রোববার) সমিতি মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সমিতির সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উদ্দিন খোকন এ প্রতিবাদ জানান।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, প্রধান বিচারপতির এ বক্তব্যের বিষয়ে আমরা, দেশের সব আইনজীবী, সবিনয় প্রতিবাদ জানাচ্ছি। আমরা আইনজীবীরা সব সময় চেষ্টা করি মানুষ যাতে ন্যায়বিচার পায়। বার কাউন্সিল দেশের আইনজীবীদের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান। অথচ সরকার থেকে এই বার কাউন্সিলকে কোনো আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয় না।

তিনি অভিযোগ করেন, আইনজীবীদের প্রশিক্ষণ বা আর্থিক নিরাপত্তা সরকার দেয় না। কোনো সরকার আজ পর্যন্ত বিচারপতি নিয়োগের নীতিমালা করেনি। এখানে অনেক বিচারকের দক্ষতা ও যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন আছে।

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আরও বলেন, ‘প্রধান বিচারপতির বক্তব্যে আমরা সারা দেশের আইনজীবীরা অসম্মানিত হয়েছি। তাঁর এ বক্তব্য সঠিক নয়। বিচারপ্রার্থীদের ন্যায়বিচার না পাওয়ার জন্য অনেক বিচারকের অদক্ষতা ও অযোগ্যতাও দায়ী। এ বিষয়টি নিয়ে আজ আমরা প্রধান বিচারপতির সঙ্গে দেখা করে আমাদের মনোভাব জানিয়েছি।’

মাহবুব উদ্দিন খোকন জানান, তিনিসহ আইনজীবী সমিতির পাঁচ সদস্যের একটি দল প্রধান বিচারপতির সঙ্গে দেখা করে তাঁদের বক্তব্য তুলে ধরেন।

প্রধান বিচারপতি যা বলেছিলেন

উল্লেখ্য, গতকাল (শনিবার) সকালে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির মিলনায়তনে ‘হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ’ নামের একটি সংগঠন আয়োজিত ‘আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় বার ও বেঞ্চের ভূমিকা’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেন, ‘আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় বিচারকেরা কতটা ভূমিকা নিতে পারবেন তা নির্ভর করে আইনজীবীদের ওপর। আইনজীবীরাই হচ্ছেন “আর্কিটেক্ট”। কিন্তু প্রায় ক্ষেত্রেই দেখা যায়, শুনানির সময় মামলার প্রধান বিষয়টি তাঁরা স্পষ্ট করতে পারেন না। এই কারণে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ মামলায় হার হয়।’

তিনি বলেন, ‘নিম্ন আদালত থেকে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত প্রায় ৩০ লাখ মামলা বিচারাধীন। আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। এত মামলা অনিষ্পন্ন রেখে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হয় না।’ তিনি বলেন, ‘আইনজীবীরা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য যে আদালতে আসেন সেই আদালতেরই অবমাননা করেন। আইনি বাধ্যবাধকতায় কোনো মামলায় মক্কেলের জামিন না পেলে তাঁরা ভাঙচুর করেন। আদালত বর্জনের মতো ঘটনাও ঘটে।’

উচ্চ আদালতের প্রসঙ্গ টেনে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘মামলা নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া দ্রুততর করা জরুরি হয়ে পড়েছে। আপিল বিভাগে আমরা প্রতিদিন ২৫-৩০টি মামলা শুনতে চাই। কিন্তু বেলা ১১টার পর সেখানে আইনজীবী খুঁজে পাওয়া যায় না। আগে মামলা শুনানির তালিকায় (কজ লিস্ট) ওঠাতে তদবির করতেন। এখন শুনতে পাই, তালিকায় না ওঠানোর জন্য তদবির করেন। এই অবস্থায় বেঞ্চ কীভাবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখবেন!’

বিচারপতি সিনহা বলেন, ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ব্যাপারে অনেকে কটাক্ষ করেন। আমরা চুপ করে থাকি। উচ্চ আদালত সব সময়ই স্বাধীন ছিল। কথা উঠেছিল নিম্ন আদালত সম্পর্কে। মাসদার হোসেন মামলার রায়ে সে বিষয়ে বিচার বিভাগকে যে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, গত ১৪ বছরেও তা আমাদের হাতে আসেনি। নিম্ন আদালতের ওপর তত্ত্বাবধানের ক্ষমতার অনেকটাই এখনো নির্বাহী বিভাগের হাতে।’

মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরুসহ পৃথিবীতে যত মহান ব্যক্তি ছিলেন তাদের মধ্যে অনেকেই আইনজীবী ছিলেন উল্লেখ করেন তিনি বলেন, রাজনীতিবিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে হলেও আইনের অর্থ কি জানা দরকার।

তিনি আরও বলেন, এখন নবীন আইনজীবীরা কোন সিনিয়র চেম্বারে এটেন্ড করেন না। এই সিস্টেমটি উঠে গেছে। আমাদের জীবনে প্রথম পাঁচ বছরে জামিনের জন্য কোর্টে দাঁড়াতে সাহস পাইনি। সিনিয়রদের ডিক্টেশন লিখতে লিখতে হাতে কড়া পড়ে যেত। এখন তো সহজ হয়ে গেছে। সিনিয়র আইনজীবীরা জুনিয়রদের যদি কোন ডিক্টেশন (নির্দেশনা) না দেন তাহলে জুনিয়ররা শিখবে কীভাবে।

নিম্ন আদালতে দুপুরের পর কোর্টে কোন আইনজীবীই থাকেন না। জুনিয়রদের দিয়ে শুধু সময় নেন। আবার কড়া একজন বিচারপতি পড়লে তাকে তাড়ানোর জন্য বার থেকে বিভিন্নভাবে আন্দোলন শুরু করে দেন আইনজীবীরা। এভাবে চললে তো মামলার জট বাড়তেই থাকবে। আইনজীবী কোর্টে না আসলে মামলা খারিজ করার নির্দেশ দিয়েছেন বলেও জানান প্রধান বিচারপতি।

কেবি