মায়ের অনৈতিক সম্পর্ক জানতে পেরে বাধা দিয়েছিল ছেলে কামরুজ্জামান।বিষয়টি সহজভাবে নিতে পারেননি তার মা। এ কারণে পরিকল্পনা করে প্রেমিকের সহযোগীতায় খুন করেন নিজের ছেলেকে।

এখানেই শেষ নয়। ভাড়াটে খুনিরা যখন ছেলেকে হত্যা করে লাশ রাস্তায় ফেলে চলে যায় তখনও নির্দয় মা দূরে দাড়িয়ে সবকিছু অবলোকন করেছেন। ছেলেকে হত্যা ও লাশ রাস্তার অদূরে ফেলে আসার জন্য হত্যাকারীদের ১০ হাজার টাকা দেন ওই মা। সবচেয়ে ভয়ানক বিষয় হলো এই হত্যাকাণ্ডের দায়ভার চাপাতে চেয়েছিল কামরুজ্জামানের স্ত্রী নূর জাহানের ওপর।

শুক্রবার দুপুরে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম এসব তথ্য জানান।

হত্যার পরিকল্পনাকারী মা মরিয়ম বেগম (৪৫), তার প্রেমিক আজিজুল হক ওরফে আজিজ (৫০), প্রেমিকের দুই সহযোগী তাফাজ্জল হোসেন (৬৫) ও মঞ্জুরুল ইসলাম (৫২)-কে গ্রেপ্তার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ।

বৃহস্পতিবার রাতে খিলগাঁও, ডেমরা, মহাখালী বাস ষ্ট্যান্ড ও রংপুরের কোতোয়ালী এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। ১২ আগষ্ট রাতে খুন করা হয় কামরুজ্জামানকে। কামরুজ্জামানকে হত্যার ঘটনায় জড়িত সবাইকে মিডিয়া সেন্টারে উপস্থিত করানো হয়।

এব্যাপারে যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম জানান, খালাতো বোনের সাথে প্রেম করে বিয়ে করতে চেয়েছিল কামরুজ্জামান।মা তাতে রাজি ছিল না।বিয়ে হয় অন্য জায়গায়।এ নিয়ে কামরুজ্জামানের সঙ্গে মা মরিয়ম বেগমের সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছিল।

বিপরীতে মা মরিয়ম বেগম আজিজ নামে এক পরপুরুষের সাথে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। বাবা আশক আলী বেঁচে থাকতেই মায়ের অনৈতিক সম্পর্কের কথা জানার পর বিষয়টি সহজভাবে নিতে পারেন নি কামরুজ্জামান।

সে কারণে মায়ের সাথে খারাপ আচরণ করতে থাকে কামরুজ্জামান।এসব কারণে মরিয়ম বেগম ছেলেকে হত্যার পরিকল্পনা করেন।

তিনি আরও বলেন, গত ১২ আগষ্ট রাত ৮টার দিকে মরিয়ম বেগম পরিকল্পনা অনুয়ায়ী শরীর অসুস্থও কথা বলে ডাক্তার দেখানোর নাম করে কামরুজ্জামানকে নিয়ে খিলগাঁওয়ে খিদমাহ হাসপাতালে যান।সেখানে আগে থেকেই প্রেমিক আজিজ ও তার দুই সহযোগী মাইক্রোবাস নিয়ে অপেক্ষা করছিল। কামরুজ্জামান ফোনে কথা বলার জন্য নিচে নামেন।কামরুজ্জামানকে আজিজ চিনলেও কামরুজ্জামান আজিজকে চিনত না।

পরে মরিয়ম ফোন করে প্রেমিক আজিজকে জানিয়ে দেন যে ছেলে নিচে নেমেছে।এরপর আজিজ কৌশলে ও ব্যবসার কথা বলে কামরুজ্জানের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তোলে।পরে চা খাওয়ার কথা বলে তাতে চেতনা নাশক ওষুধ মিশিয়ে দেয়।এরপর মাইক্রোবাসে বসে কথা বলার এক পর্যায়ে জ্ঞান হারান কামরুজ্জামান।তারপর খিলগাঁয়ের অন্ধকার কয়েকটি গলিতে ঘুরে গাড়ি নিয়ে।এরমধ্যে গাড়ির সিট বেল্ট দিয়ে গলায় চেপে ধরে কামরুজ্জামানকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে।

মনিরুল ইসলাম বলেন, এর মধ্যে মরিয়ম বেগম বের হয়ে চলে যায়।পরে ডেমরার চিটাগাং রোডে শুকুরশী নামক স্থানে কামরুজ্জামানের লাশ ফেলে দেয়।সে সময় মরিয়ম বেগম অদুরেই দাড়িয়ে সব দেখছিলেন।কাজ শেষে চলে যাওয়ার সময় হত্যাকারীদের ১০ হাজার টাকাও দেন মরিয়ম।

মনিরুল ইসলাম আরও বলেন, হত্যাকাণ্ডের পর মরিয়ম তার দুই মেয়ে আরিফা ও মারুফার সঙ্গে আলোচনা করেন।তখন তিনি ঘটনাটি কামরুজ্জামানের স্ত্রী নূর জাহানের উপর চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন।

ঘটনার পর কামরুজ্জামানের বাবা আশক আলী বাদি হয়ে মামলা করেন।থানা পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দা পুলিশ ছায়া তদন্ত শুরু করে।গত ১ সেপ্টেম্বর মামলা ডিবিতে হস্তান্তর হয়।এর একপর্যায়ে তারা তথ্য প্রযুক্তি অন্যান্য তথ্যেও ভিত্তিতে ঘটনাটি উৎঘাটনে সমর্থ হন।

এর পরপরই বৃহস্পতিবার গভীর রাত সাড়ে ১২টার দিকে খিলগাঁও এলাকা থেকে আজিজকে গ্রেপ্তার করা হয়।পরে তার স্বীকারোক্তির পর রংপুর কোতোয়ালী থেকে সহযোগী তোফাজ্জল হোসেন এবং মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে মঞ্জুরুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়।

মনিরুল ইসলাম বলেন, গ্রেপ্তারকৃত মরিয়ম বেগমের ডেমরায় নিজেদের বাড়ি রয়েছে। আর প্রেমিক আজিজের খিলগাঁওয়ে নিজের বাড়ি রয়েছে। সে গাড়িচালাক এবং বিভিন্ন ধরনের দালালির ব্যবসা করতেন। আজিজের দুই সহযোগি তোফাজ্জল ও মঞ্জুরুল বিভিন্ন জায়গায় কবিরাজি করেন।

প্রেমের সুত্রপাত সম্পর্কে মনিরুল ইসলাম বলেন, মোবাইল ফোনে মিসকল চালাচালি থেকে তাদের মধ্যে আলাপচারিতার সূত্রপাত। সেখান থেকে প্রেম। ঘটনার পরম্পরায় তাদের মধ্যে গড়ে ওঠে অনৈতিক সম্পর্ক। আজিজের স্ত্রী বয়স হয়ে যাওয়া এবং মরিয়ম বেগমের স্বামীর অসুস্থ্যতার কারণে তাদের মধ্যে সম্পর্ক গভীরতা পায়। আর সেকারণে তারা ডেমরায় একটি ফ্লাটও ভাড়া নেন।

কামরুজ্জামান পাথরের ব্যবসা করতেন। তার স্ত্রী নূরজাহান এবং জিয়ানা নামে দেড় বছরের এক কন্যাসন্তানও রয়েছে।

জেইউ, জেএ