দেশের মোট কর্মীর ৮৪ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি অর্জন করেও স্নাতকদের ৪৪ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক কাজে যুক্ত হতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে জনসংখ্যাগত সুবিধা কাজে লাগানোর গুরুত্বপূর্ণ সময় থাকলেও সেই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারছে না বাংলাদেশ।

বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বাংলাদেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অনুপাত ২০৪৫ সালে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে। এরপর থেকে এ অনুপাত কমতে শুরু করবে। অর্থাৎ কর্মক্ষম মানুষের আধিক্য থেকে অর্থনৈতিক সুবিধা নেওয়ার জন্য বাংলাদেশের হাতে রয়েছে প্রায় দুই দশক। অন্যদিকে ২০৫১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ প্রবীণ জনসংখ্যাপ্রধান দেশে পরিণত হবে। তখন দেশের জনসংখ্যার বয়সভিত্তিক কাঠামোতে আসবে বড় পরিবর্তন। কর্মক্ষম মানুষের অনুপাত কমার পাশাপাশি প্রবীণ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা, দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চাপ বাড়বে।

বাংলাদেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অনুপাত ২০৪৫ সালে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে। এরপর থেকে এ অনুপাত কমতে শুরু করবে। অর্থাৎ কর্মক্ষম মানুষের আধিক্য থেকে অর্থনৈতিক সুবিধা নেওয়ার জন্য বাংলাদেশের হাতে রয়েছে প্রায় দুই দশক। অন্যদিকে ২০৫১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ প্রবীণ জনসংখ্যাপ্রধান দেশে পরিণত হবে। তখন দেশের জনসংখ্যার বয়সভিত্তিক কাঠামোতে আসবে বড় পরিবর্তন। কর্মক্ষম মানুষের অনুপাত কমার পাশাপাশি প্রবীণ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা, দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চাপ বাড়বে।

বিশ্বব্যাংক

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) ‘ডেমোগ্রাফিক চেঞ্জ ইন সাউথ এশিয়া: ফ্রম টেইলউইন্ডস টু হেডউইন্ডস ফর ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরেছে বিশ্বব্যাংক। দক্ষিণ এশিয়ার জনসংখ্যাগত পরিবর্তন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং ভবিষ্যতের বার্ধক্যজনিত চ্যালেঞ্জ নিয়ে তৈরি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জনসংখ্যাগত সুবিধা থেকে অর্থনৈতিক সুফল পেতে হলে এখনই কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ৮৪ শতাংশ কর্মী অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। সংখ্যার হিসাবে এ জনগোষ্ঠী প্রায় ৫ কোটি ৮০ লাখ। এসব কর্মীর বড় অংশের কাজের ক্ষেত্রে নিয়মিত আয়, চাকরির নিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষা এবং অবসরকালীন সুবিধার নিশ্চয়তা নেই। ফলে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বাড়লেও তার সুফল অর্থনীতিতে প্রত্যাশিত মাত্রায় প্রতিফলিত হচ্ছে না।

কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি অর্জন করেও অনেককে আনুষ্ঠানিক চাকরি পাওয়া থেকে বঞ্চিত হতে হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রায় ৪৪ শতাংশ স্নাতক অনানুষ্ঠানিক কাজে নিয়োজিত। অর্থাৎ উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পরও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক তরুণের কর্মসংস্থান হচ্ছে এমন খাতে, যেখানে চাকরির স্থায়িত্ব ও সামাজিক সুরক্ষার সুযোগ সীমিত।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির গতি ধীর। অন্যদিকে ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো সাম্প্রতিক সময়ে গড়ে কর্মীর সংখ্যা কমিয়েছে। এতে একদিকে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হচ্ছে, অন্যদিকে শ্রমবাজারে প্রবেশ করা তরুণদের বড় অংশ অনানুষ্ঠানিক কাজের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।

বিশ্বব্যাংকের মতে, জনসংখ্যাগত সুবিধা কাজে লাগানোর জন্য শুধু কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বাড়লেই হবে না, তাদের উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত করতে হবে। বিশেষ করে তরুণদের শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ করে তোলা, বিনিয়োগ ও ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করা এবং মানসম্মত কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের পথে বিদ্যমান বাধা দূর করতে হবে।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক অর্থনীতিতে জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের প্রভাবও তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ২০০০ সাল থেকে কর্মক্ষম বয়সী মানুষের অনুপাত বাড়ার কারণে দক্ষিণ এশিয়ার মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) বছরে অতিরিক্ত ০.৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। একই সময়ে শ্রম উৎপাদনশীলতা বেড়েছে বছরে ১.১ শতাংশ। অর্থাৎ কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি উৎপাদনশীলতা বাড়ায় এ অঞ্চলের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

তবে এ সুবিধা স্থায়ী হবে না বলে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে জনসংখ্যাগত সুবিধা থেকে দক্ষিণ এশিয়ার জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে অবদান বছরে ০.৪ শতাংশ থেকে কমে ০.১ শতাংশে নেমে আসবে। ফলে আগামী বছরগুলোতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে শুধু কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির ওপর নির্ভর করার সুযোগ কমে আসবে। এর পরিবর্তে শ্রমিকের দক্ষতা, উৎপাদনশীলতা, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের মানোন্নয়নে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

২০২৪ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে জনসংখ্যাগত সুবিধা থেকে দক্ষিণ এশিয়ার জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে অবদান বছরে ০.৪ শতাংশ থেকে কমে ০.১ শতাংশে নেমে আসবে। ফলে আগামী বছরগুলোতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে শুধু কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির ওপর নির্ভর করার সুযোগ কমে আসবে। এর পরিবর্তে শ্রমিকের দক্ষতা, উৎপাদনশীলতা, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের মানোন্নয়নে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

বিশ্বব্যাংক

দক্ষিণ এশিয়ার কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বর্তমানে প্রায় ১১৭ কোটি। তবে এ অঞ্চলের কর্মক্ষম জনসংখ্যা এক দশকেরও কম সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে কমতে শুরু করবে। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৪৯ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়া প্রবীণ জনসংখ্যাপ্রধান অঞ্চলে পরিণত হবে। তখন এ অঞ্চলের মোট জনসংখ্যার ১৪ শতাংশের বয়স হবে ৬৫ বছর বা তার বেশি। বাংলাদেশে একই ধরনের পরিবর্তন ঘটবে ২০৫১ সালে।

জনসংখ্যার এ পরিবর্তন বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে। বর্তমানে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বেশি থাকায় শ্রমবাজারে প্রবেশকারী তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা বড় চ্যালেঞ্জ। ভবিষ্যতে কর্মক্ষম মানুষের অনুপাত কমে গেলে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর ভরণপোষণ, চিকিৎসা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বও বাড়বে। ফলে এখনকার কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত করতে না পারলে ভবিষ্যতে অর্থনীতির ওপর দ্বিমুখী চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

প্রবীণদের সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রেও দক্ষিণ এশিয়ার প্রস্তুতি দুর্বল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ অঞ্চলের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর মাত্র ১৭ শতাংশ পেনশন ব্যবস্থায় অবদান রাখেন। অন্যদিকে প্রবীণদের মাত্র ১০ শতাংশ কোনো না কোনো পেনশন সুবিধা পান। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে পেনশন সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে এটি সর্বনিম্ন হার।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যসেবা, দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। কারণ, অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য অবসরকালীন সুরক্ষার সুযোগ সীমিত। কর্মজীবনে নিয়মিত পেনশন বা সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার আওতায় না থাকলে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব মানুষের আর্থিক অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে পরিবারের ওপর প্রবীণদের চিকিৎসা ও পরিচর্যার দায়িত্বও বাড়বে।

এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় দুটি ক্ষেত্রে একযোগে পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করেছে বিশ্বব্যাংক। প্রথমত, কর্মক্ষম তরুণ জনগোষ্ঠীর সম্ভাবনা কাজে লাগাতে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণ, ব্যবসায়িক বিধিবিধান সহজ করা এবং বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করতে হবে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কারিগরি দক্ষতার উন্নয়নের মাধ্যমে শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী কর্মী তৈরি করতে হবে। নারীদের কর্মসংস্থানের পথে বাধা দূর করে শ্রমবাজারে তাদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি।

দ্বিতীয়ত, ভবিষ্যতের প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যসেবা, দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা ও পেনশন ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। পাশাপাশি মানুষের সঞ্চয় ও বিনিয়োগ বাড়িয়ে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে হবে। জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার পরিধি বাড়ানো এবং এর অর্থায়নের সক্ষমতা তৈরি করাও জরুরি।

বাংলাদেশের জনসংখ্যাগত সম্ভাবনা নির্ভর করছে এখন দেশটি কী পদক্ষেপ নেয় তার ওপর। প্রতিষ্ঠানগুলোকে উন্নত কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়তা, তরুণদের বাজারের চাহিদার ভিত্তিতে দক্ষ করে তোলা এবং নারীদের কর্মসংস্থানের পথে বাধা দূর করা জরুরি। একই সঙ্গে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যসেবা ও বার্ধক্যকালীন আর্থিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। এজন্য অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ বাড়ানোও প্রয়োজন।

বিশ্বব্যাংকের বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেসমে

বাংলাদেশ ও ভুটানের জন্য বিশ্বব্যাংকের বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেসমে বলেন, বাংলাদেশের জনসংখ্যাগত সম্ভাবনা নির্ভর করছে এখন দেশটি কী পদক্ষেপ নেয় তার ওপর। প্রতিষ্ঠানগুলোকে উন্নত কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়তা, তরুণদের বাজারের চাহিদার ভিত্তিতে দক্ষ করে তোলা এবং নারীদের কর্মসংস্থানের পথে বাধা দূর করা জরুরি। একই সঙ্গে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যসেবা ও বার্ধক্যকালীন আর্থিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। এজন্য অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ বাড়ানোও প্রয়োজন।

বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট জোহানেস জাট বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো তুলনামূলকভাবে কম মাথাপিছু আয়েই দ্রুত বার্ধক্যের দিকে এগোচ্ছে। তাই এখনই উন্নত ও বেশি কর্মসংস্থান তৈরির নীতি গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যবান প্রবীণদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত রাখার সুযোগ তৈরি করতে হবে। এতে জনসংখ্যাগত সুবিধার পাশাপাশি ভবিষ্যতে দ্বিতীয় দফায় অর্থনৈতিক সুফল পাওয়ার ভিত্তি তৈরি হবে।

এমএম