তিনি বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী সরবরাহের পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বিনিময় হার, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বও সরাসরি সম্পর্কিত।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজে (বিআইআইএসএস) আয়োজিত ‘সংকট ব্যবস্থাপনা থেকে টেকসই উত্তরণ’ শীর্ষক এক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন।

জ্বালানি নিরাপত্তা শুধু কারিগরি বিষয় নয়

সেমিনারে তিনি বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তাকে শুধু কারিগরি, ব্যবস্থাপনা কিংবা অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে হবে না। এর সঙ্গে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক অর্থনীতিও গভীরভাবে সম্পৃক্ত।

সরকার কীভাবে জ্বালানি খাত পরিচালনা করবে এবং আমদানির ওপর কতটা নির্ভর করবে—এটি মূলত একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তার মতে, জ্বালানি নিরাপত্তার লক্ষ্য হওয়া উচিত নির্ভরযোগ্য, সাশ্রয়ী এবং ধীরে ধীরে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে এমন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে রাজস্ব, বৈদেশিক মুদ্রা ও বহিঃখাতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না হয়।

বিদ্যুৎ উৎপাদন, জ্বালানি আমদানি ও প্রযুক্তি গ্রহণের প্রতিটি সিদ্ধান্ত দেশের ব্যালান্স অব পেমেন্টসের ওপর প্রভাব ফেলে বলেও জানান তিনি। আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির অতিরিক্ত ব্যবহার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও বিনিময় হারের স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকি তৈরি করে।

শুধু উৎপাদন সক্ষমতা দিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত নয়

বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ উৎপাদনের স্থাপিত সক্ষমতাকে জ্বালানি নিরাপত্তার প্রধান সূচক হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তবে কোনো দেশে কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে, সেটিই একমাত্র বিবেচ্য বিষয় হতে পারে না বলে জানান তিনি। উৎপাদন কেন্দ্রগুলো কতটা কার্যকর, জ্বালানির সরবরাহ কতটা নিশ্চিত, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থা কতটা সক্ষম এবং পুরো ব্যবস্থার আর্থিক বোঝা কত—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

ক্যাপাসিটি চার্জে গুনতে হয়েছে ২.৮১ লাখ কোটি টাকা

বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক চাপের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০০৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত অলস বা অব্যবহৃত বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ সরকারি কোষাগার থেকে প্রায় ২ লাখ ৮১ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।

তার মতে, জনগণের অর্থের এত বড় ব্যয় বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দেওয়া হলেও সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামো প্রয়োজনীয় মাত্রায় গড়ে ওঠেনি বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ফলে কাগজে উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও বাস্তবে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা কঠিন হয়েছে।

ভর্তুকির চাপও কমেনি

বিদ্যুৎ খাতে সরকারের ভর্তুকির তথ্য তুলে ধরে তিনি জানান, ২০০৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত এ খাতে মোট ভর্তুকির পরিমাণ প্রায় ২ লাখ ৫৭ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকা।

এর মধ্যে বর্তমান সরকারের মেয়াদ শুরুর আগেই প্রায় ২ লাখ ২৪ হাজার ৮৬০ কোটি টাকা জমা হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি। সাম্প্রতিক সংকট মোকাবিলা করে গ্রিড সচল রাখতে আরও প্রায় ৩২ হাজার ৪৭৬ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে বলেও জানান।

আমদানি-নির্ভরতার ঝুঁকি বেড়েছে

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে বাংলাদেশের আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার দুর্বলতা আরও স্পষ্ট হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

প্রাকৃতিক গ্যাসের সংকট, এলএনজি আমদানির ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। ফোর্স মেজরের কারণে স্পট মার্কেট থেকে তুলনামূলক বেশি দামে এলএনজি সংগ্রহের প্রয়োজন হয়েছে বলেও জানান তিনি।

এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাবে ২০২৬ সালের মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) জ্বালানি তেল বিক্রিতে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর ঋণের বোঝা নিয়ে প্রশ্ন

জ্বালানি খাতে ভুল নীতি ও অদক্ষতার আর্থিক দায় শুধু বর্তমান প্রজন্মকে বহন করতে হচ্ছে না, এর প্রভাব ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপরও পড়ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ঋণের বোঝা বাড়ানো কতটা যৌক্তিক—এটি শুধু অর্থনৈতিক নয়, নৈতিক প্রশ্ন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

ডিজেলের মজুত বেড়েছে ৩২ দিনে

বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশে ডিজেলের জাতীয় মজুত ১৭ দিনের চাহিদার সমান ছিল বলে জানান তিনি।

সমন্বিতভাবে জ্বালানি সংগ্রহের মাধ্যমে বর্তমানে এই মজুত ৩২ দিনের চাহিদায় উন্নীত হয়েছে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত জ্বালানি মজুত গড়ে তোলার কাজও এগিয়ে চলছে বলে জানান তিনি।

সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) ব্যবস্থা চালুর কার্যক্রম চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলেও জানান তিনি। পাশাপাশি কাঞ্চনপুর থেকে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল পর্যন্ত জেট ফুয়েল পাইপলাইন চালুর পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেন। এতে জ্বালানি খালাস ও পরিবহন ব্যয় কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।

গ্যাস সংকট মোকাবিলায় বিকল্প উৎসের উদ্যোগ

দেশে গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ এমএমসিএফডি। বিপরীতে সরবরাহ মিলছে ২ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ এমএমসিএফডি।

সরকার বিকল্প উৎস থেকে এলএনজি সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে বলেও জানান তিনি।

দীর্ঘমেয়াদি চাহিদা মেটাতে মাতারবাড়িতে ১ হাজার এমএমসিএফডি রিগ্যাসিফিকেশন সক্ষমতার ল্যান্ড-বেসড এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের কাজ এগিয়ে চলছে। পাশাপাশি মহেশখালীর কুতুবজোম এলাকায় ৬০০ এমএমসিএফডি সক্ষমতার একটি এফএসআরইউ স্থাপনের বিষয়ে চীনের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে জানান তিনি।

জ্বালানি অবকাঠামোয় আঞ্চলিক ভারসাম্যের তাগিদ

দেশের বর্তমান জ্বালানি অবকাঠামো অনেকটা দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে উল্লেখ করে তিনি ভবিষ্যতে পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে ভারসাম্য রেখে অবকাঠামো সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।

এ ক্ষেত্রে মাতারবাড়ির গভীর সমুদ্রবন্দর, সমুদ্রের গভীরতা, পলিমাটির পরিবর্তন এবং ঘূর্ণিঝড়ের সময় জাহাজ চলাচলের মতো বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু বর্তমান সংকট মোকাবিলা করলেই হবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি। ভবিষ্যৎ ঝুঁকি, ভূরাজনীতি, জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রবন্দর, সরবরাহব্যবস্থা, বৈদেশিক মুদ্রা ও দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে সমন্বিতভাবে বিবেচনায় নিয়ে জ্বালানি কৌশল প্রণয়নের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

টেকসই নিরাপত্তায় সমন্বিত কৌশলের প্রয়োজন

বক্তব্যে জ্বালানি খাতের সংকটকে কেবল তাৎক্ষণিক সরবরাহ ঘাটতি হিসেবে না দেখে এর দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত কারণ চিহ্নিত করার ওপর জোর দেন তিনি।

তার মতে, সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা, প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলা, দক্ষতা বাড়ানো, দেশীয় সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং বহুমুখী জ্বালানি অবকাঠামো গড়ে তোলার মাধ্যমে বাংলাদেশের টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তার ভিত্তি তৈরি করা সম্ভব।