আশা ছিল ঘরের কাছেই মিলবে বিনামূল্যে অভিজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং মা ও শিশুর জরুরি স্বাস্থ্যসেবা। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রত্যাশার আলো জ্বলেনি; অব্যবস্থাপনা আর প্রশাসনিক উপেক্ষায় উদ্বোধনের সাড়ে পাঁচ বছর পরও অচল হয়ে পড়ে রয়েছে মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার বর্ণি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রটি। চিকিৎসাসেবা তো দূর, কেন্দ্রটি এখন পরিণত হয়েছে গবাদিপশুর অবাধ চারণভূমিতে।

উদ্বোধনের ৫ বছর ৯ মাস পর তালাবদ্ধ ভবন

উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা যায়, ২০২০ সালের নভেম্বর মাসে বেশ ঢাকঢোল পিটিয়ে বর্ণি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রটির শুভ উদ্বোধন করা হয়। কিন্তু উদ্বোধনের পর কেটে গেছে প্রায় ৫ বছর ৯ মাস, আজও স্বাস্থ্য কেন্দ্রটি পূর্ণাঙ্গ বা কার্যকরভাবে চালু করা সম্ভব হয়নি। তীব্র জনবল সংকটের কারণে রোগীদের চিকিৎসাসেবা পুরোপুরি বন্ধ। উদ্বোধনের পর শুরুতে হাতেগোনা মাত্র কয়েক দিন ভবনটি খোলা রাখা হলেও, এরপর থেকে অধিকাংশ সময় এটি তালাবদ্ধই থাকছে।

দীর্ঘদিন পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সরকারি এই ভবনটি এখন জরাজীর্ণ রূপ নিয়েছে। যে ভবনের আঙিনায় দূর-দূরান্ত থেকে আসা অসুস্থ রোগী ও তাদের স্বজনদের ভিড় থাকার কথা ছিল, সেখানে আজ অবাধে বিচরণ করছে গরু-ছাগল। ভবনের প্রধান ফটক ও প্রবেশপথে জন্মেছে বড় বড় ঘাস ও জঙ্গল। চারপাশে জমে রয়েছে ময়লা-আবর্জনার স্তুপ, আর যত্নের অভাবে ভবনের দেয়ালের উজ্জ্বল রঙ বিবর্ণ হয়ে গেছে।

অনুমোদিত পদের অভাব ও অনিয়মিত স্বাস্থ্যকর্মী

বড়লেখা উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের তথ্যমতে, একটি পূর্ণাঙ্গ ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চার ধরনের পদ থাকার কথা থাকলেও বর্ণি কেন্দ্রে কেবল ‘পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা’ ও ‘আয়া’-এই দুটি পদ অনুমোদিত হয়েছে। তবে অতি গুরুত্বপূর্ণ ‘উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার’ এবং ‘এমএলএসএস’ পদ দুটি আজও অনুমোদন পায়নি।

সম্প্রতি প্রশাসনিক সমন্বয়ের অংশ হিসেবে পাশের নিজবাহাদুরপুর কেন্দ্রের উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার নজরুল ইসলামকে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে বর্ণি কেন্দ্রে পাঠানো হয়। সরকারি সূচি অনুযায়ী সপ্তাহে দুই দিন তাঁর বর্ণি কেন্দ্রে উপস্থিত থেকে সেবা দেওয়ার কথা। তবে স্থানীয় অধিবাসীদের অভিযোগ, বাস্তবে তিনি সপ্তাহে একদিনের বেশি কেন্দ্রে আসেন না। তাও আবার কোনো কোনো দিন এসে মাত্র আধা ঘণ্টা বা ৪০ মিনিট অবস্থান করে চলে যান। এমনকি অনেক সপ্তাহে তাঁকে দেখাই যায় না।

সম্প্রতি সরেজমিনে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে গিয়ে দেখা যায়, প্রধান ফটক খোলা থাকলেও মূল ভবনে ঝুলছে বড় তালা। ভবনের চতুর্দিকে ময়লা-আবর্জনা ও জঙ্গল। আঙিনায় নিশ্চিন্তে ঘাস খাচ্ছে স্থানীয়দের গরু-ছাগল। পুরো পরিবেশ দেখে মনে হয় এটি কোনো সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র নয়, বরং দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত পড়ে থাকা একটি ভুতুড়ে ভবন।

বঞ্চিত সাধারণ মানুষ ও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া

স্বাস্থ্য কেন্দ্রটি সচল না থাকায় বর্ণি ইউনিয়নের হাজার হাজার প্রান্তিক মানুষ নিয়মিত প্রাথমিক সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। প্রসবপূর্ব ও প্রসবকালীন সেবা, নবজাতকের নিবিড় পরিচর্যা, শিশুকালীন ও কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্যসেবা, পরিবার পরিকল্পনা পরামর্শ এবং সাধারণ ও জটিল রোগের প্রাথমিক চিকিৎসার মতো মৌলিক অধিকারগুলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন স্থানীয়রা।

স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ জবলুর অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে বলেন, “উদ্বোধনের সময় আমরা খুব খুশি হয়েছিলাম। ভেবেছিলাম প্রতিদিন ডাক্তার থাকবেন, প্রয়োজনীয় ওষুধ পাব। কিন্তু প্রায় ছয় বছর হতে চলল, এই ভবনটি মানুষের কোনো কাজেই আসছে না। সপ্তাহে একদিন একজন এসে স্বাস্থ্যকেন্দ্র খুলে কিছুক্ষণ বসে থাকেন। ওষুধ চাইলে বলেন ‘ওষুধ নেই’, তারপর চলে যান। আমাদের বর্ণিতে নেতার অভাব নেই, কিন্তু কাজের মানুষের বড্ড অভাব।”

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

প্রান্তিক মানুষের এই দীর্ঘদিনের ভোগান্তি ও জনবল সংকটের বিষয়টি স্বীকার করেছেন বড়লেখা উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সীমা সিদ্দিকা। তিনি জানান, “বর্ণি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রটি অপেক্ষাকৃত নতুন। এখানে এখনও সব পদের প্রশাসনিক অনুমোদন ও পদায়ন হয়নি। ফলে পূর্ণাঙ্গ সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে আমরা প্রয়োজনীয় জনবল চেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে নিয়মিত আবেদন জানিয়েছি। পদ অনুমোদন ও লোকবল পাওয়া গেলে দ্রুততম সময়ে কেন্দ্রটি পুরোপুরি চালু করে জনগণকে মানসম্মত সেবা দেওয়া সম্ভব হবে।”

অবকাঠামো প্রস্তুত থাকলেও কেবল জনবল সংকট ও সদিচ্ছার অভাবে সরকারি সেবা থেকে এভাবে একটি পুরো ইউনিয়নবাসী বঞ্চিত হওয়ায় তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে সর্বস্তরের মানুষের মাঝে। অবিলম্বে প্রয়োজনীয় ডাক্তার ও কর্মী নিয়োগ দিয়ে বর্ণি স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি চালুর দাবি জানাচ্ছেন ভূক্তভোগীরা।

এমএম