অনেকের গলাতে টনসিলের সমস্যা হয়। টনসিলের সমস্যা বেশি ভয় করেন আবৃত্তি কিংবা সঙ্গীতশিল্পীরা। টনসিলের সমস্যা বলতে সাধারণেরা যে সমস্যাটিকে বুঝিয়ে থাকেন সেটি হল, টনসিলাইটিস বা টনসিলের প্রদাহ। টনসিলাইটিস হলে গলা ব্যথা হয়। এ করণে খাবার খেতে বা ঢোক গিলতে অসুবিধা হয়, সাথে কিছুটা জ্বর থাকে। তবে রোগটি টনসিলাইটিস কি না, তা পর্যবেক্ষণ করে বলবেন নাক কান গলা বিশেষজ্ঞ।
একইভাবে বারবার টনসিলের ইনফেকশন হতে থাকলে, টনসিলে পুঁজ হলে কিংবা টনসিলের আকার বড় থাকলে, রোগের ইতিহাস বিবেচনা সাপেক্ষে নাক কান গলা বিশেষজ্ঞই অপারেশন করে টনসিল ফেলে দেয়ার সিদ্ধান্তটি নিয়ে থাকেন। টনসিল ফেলে দেয়ার এই অপারেশনের নাম- টনসিলেক্টটমী।
টনসিল অপারেশন নিয়ে অনেকের মধ্যে নানারকম ভুল ধারণা রয়েছে। তার একটি হল, টনসিল অপারেশনে গলার স্বর নষ্ট হয়। বিশেষ করে কণ্ঠশিল্পীদের মাঝে এই ভুল ধারণা খুবই প্রচলিত। তাদের ধারণা টনসিল অপারেশনের পর গলার স্বর স্বাভাবিক থাকে না।
অপারেশনের পর কণ্ঠস্বরের পূর্বের মান বজায় থাকবে না। কিন্তু এই ধারণাটি ঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে টনসিল অপারেশনের কারণে গলার স্বর নষ্ট হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। যেহেতু স্বাভাবিক কণ্ঠস্বর সৃষ্টিতে টনসিলের তেমন ভূমিকা নেই, তাই এটি ফেলে দিলে তা কণ্ঠস্বরের ওপর প্রভাব ফেলে না। বরং টনসিল অনেক বড় হওয়ার কারণে গলার স্বরের কিছুটা নেতিবাচক পরিবর্তন দেখা যায়।
অপারেশন করলে কণ্ঠস্বরের সেই অস্বাভাবিকতা দূর হয়ে কণ্ঠস্বর স্বাভাবিক হয়ে যায়। স্বরের এই পরিবর্তনকে কখনোই কণ্ঠস্বর নষ্ট হয়েছে বলা যায় না।
একইভাবে গলার মধ্যে বিশাল আকৃতির টনসিল থাকার জন্য ফ্যাসফ্যাসে কণ্ঠস্বরকেও নিশ্চয়ই কাক্সিক্ষত স্বাভাবিক কণ্ঠস্বর বা নরমাল ভয়েস বলে মেনে নেয়া যাবে না। বিশাল আকৃতির টনসিল ফেলে দেয়ার পর গলার মধ্যে এক ধরনের শূন্যতার সৃষ্টি হয়। যাদের গলার মধ্যে বড় টনসিলের সমস্যা নেই তাদের গলার মধ্যে এই ধরনের শূন্যতা এমনিতেই থাকে।
বড় টনসিল অপারেশনের পর গলার মধ্যেকার কাক্সিক্ষত স্বাভাবিক চিত্রটিই পুণঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। আর টনসিলের সাধারণ ইনফেকশনজনিত কারণে টনসিল ফেলে দেয়ার ঘটনায় গলার মধ্যে বিশেষ কোনো অস্বাভাবিকতা সৃষ্টির অবকাশ নেই।
তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে অপারেশনের ফলে গলার মধ্যকার ঝিল্লির কিছুটা বিকৃতি ঘটে থাকলে, সেক্ষেত্রে কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন এতটাই সামান্য যে, নিরূপণ করা সম্ভব হয় না বা বোঝা যায় না। টনসিল অপারেশনে কণ্ঠস্বর নষ্ট হয় না বরং টনসিলের জন্য বিকৃত কণ্ঠস্বর স্বাভাবিকতা ফিরে পায়।
কণ্ঠস্বর তৈরিতে ন্যস্ত অঙ্গটির নাম ভোকাল কর্ড। মূলত ভোকাল কর্ডের মাধ্যমেই কণ্ঠস্বর তৈরি হয়। কণ্ঠস্বরের মান বা কোয়ালিটিও নির্ভর করে মূলত ভোকাল কর্ডের সুস্থতার ওপর। আর তাই ভোকাল কর্ডের অসুস্থতায় কণ্ঠস্বরের বিকৃতি ঘটে।
টনসিল অতিরিক্ত বড় হলে এবং বারংবার টনসিলের ইনফেকশন হলে নাক কান গলা বিশেষজ্ঞের পরামর্শক্রমে টনসিল ফেলে দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে গলার স্বর নষ্ট হয়ে যাবে, এই বিভ্রান্তিতে পড়ে টনসিল অপারেশন থেকে বিরত থাকলে পরিণাম কখনোই সুখকর হয় না। প্রতিনিয়ত অসুস্থ থাকার পাশাপাশি কণ্ঠস্বরের সমূহ ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকি রয়েই যায়।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, নাক কান গলা বিভাগ, হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল।
ওএফ





