মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃক প্রকাশিত হামের সার্বিক পরিস্থিতি বিষয়ক নিয়মিত দৈনিক প্রতিবেদনে এই আশঙ্কাজনক চিত্র উঠে এসেছে।
এক নজরে ২৪ ঘণ্টার চিত্র
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দেশে নতুন করে হামের উপসর্গ এবং নিশ্চিত সংক্রমণের হার উভয়ই আশঙ্কাজনক পর্যায়ে রয়েছে। বিগত ২৪ ঘণ্টার সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য নিম্নরূপ:
নতুন মৃত্যু (উপসর্গসহ): ৫ জন (এর মধ্যে চারজনই ঢাকা মহানগরীতে)।
নতুন উপসর্গযুক্ত রোগী: ৯৮৬ জন।
ল্যাব পরীক্ষাসাপেক্ষে নতুন নিশ্চিত আক্রান্ত: ৯১ জন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উপসর্গ দেখা দেওয়ার পরও হাসপাতালে দেরিতে আসার কারণে এবং শিশুদের পুষ্টির ঘাটতি থাকায় মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে এই সংক্রমণের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে।
মার্চ থেকে আগস্ট: মৃত্যুর সংখ্যা পৌঁছেছে সাড়ে ৯ শ’র ঘরে
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে সারাদেশে হামের প্রকোপ আনুষ্ঠানিকভাবে ট্র্যাক করা শুরু হয়। ১৫ মার্চ থেকে ২৫ আগস্ট পর্যন্ত উপাত্ত পর্যালোচনা করলে এই মহামারীর এক ভয়াবহ চিত্র সামনে আসে।
গত সাড়ে পাঁচ মাসে দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ৮৪৪ শিশুর করুণ মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে, ল্যাবরেটরি পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে আরও ৯৯ শিশু। ফলে এই নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে নিশ্চিত হাম এবং হামের উপসর্গ—উভয় মিলিয়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯৪৩ জনে।
শিশুমৃত্যুর এই উচ্চ হার দেশের সার্বিক টিকাদান কর্মসূচি ও মাঠপর্যায়ের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের প্রশ্নচিহ্ন দাঁড় করিয়েছে। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেসব শিশুর মধ্যে আগে থেকেই কুসংস্কার, অপুষ্টি বা অন্যান্য শারীরিক জটিলতা ছিল, তারা এই ভাইরাসে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সংক্রমণ ও উপসর্গযুক্ত রোগীর বিশাল পরিসংখ্যান
কেবল মৃত্যু নয়, আক্রান্তের সংখ্যাও লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় ল্যাব টেস্টে নিশ্চিত হওয়া ৯১ জন রোগীকে ধরে গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত দেশে মোট ১৮ হাজার ৫৭৮ জনের শরীরে হামের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে।
অন্যদিকে, শুধু পরীক্ষাগারে নিশ্চিত রোগীরাই নন, উপসর্গের বিশাল তালিকাও উদ্বেগজনক। ২৪ ঘণ্টায় আরও ৯৮৬ জনের শরীরে লক্ষণ ও উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর, সাড়ে পাঁচ মাসে সারাদেশে মোট ১ লাখ ৫১ হাজার ৬৩৮ জন রোগীর মধ্যে হামের লক্ষণ পাওয়া গেছে।
স্বাস্থ্য খাতের পর্যবেক্ষকদের মতে, অনেক প্রত্যন্ত অঞ্চলে নমুনা পরীক্ষা করার সুযোগ সীমিত হওয়ায় উপসর্গযুক্ত রোগীদের বিরাট অংশকে 'অনশ্চিত' তালিকার অন্তর্ভুক্ত রাখতে হচ্ছে। বাস্তবে প্রকৃত আক্রান্ত ও উপসর্গযুক্ত রোগীর সংখ্যা সরকারি হিসেবের চেয়ে আরও বেশি হতে পারে।
হাসপাতালগুলোর চাপ ও সুস্থতার হার
হামে আক্রান্ত শিশুদের সামাল দিতে গিয়ে দেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলো হিমশিম খাচ্ছে। বিশেষ করে শিশু হাসপাতাল ও বিশেষায়িত সংক্রামক ব্যাধি কেন্দ্রগুলোতে শয্যা সংকটের খবর পাওয়া যাচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদন জানাচ্ছে, গত ১৫ মার্চ থেকে ২৫ আগস্ট পর্যন্ত সময়ের মধ্যে হামের জটিল উপসর্গ নিয়ে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে ১ লাখ ৩২ হাজার ৫৫৪ জন রোগীকে।
তবে স্বস্তির বিষয় হলো, বিপুল সংখ্যক রোগী হাসপাতালে এলেও চিকিৎসকদের প্রচেষ্টায় সুস্থতার হারও আশাব্যঞ্জক। এ পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে চিকিৎসা সেবা শেষে ১ লাখ ২৭ হাজার ৮১১ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে কয়েক হাজার রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন, যাদের মধ্যে অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ও জনস্বাস্থ্য সতর্কতা
হাম একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত রোগ, যা প্রধানত শ্বাসপ্রশ্বাস এবং হাঁচি-কাশির মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, হামের প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দিলে—যেমন তীব্র জ্বর, চোখ লাল হওয়া, সর্দি এবং শরীরে লালচে দানা বা র্যাশ ওঠা—অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলোর ওপর জোর দিচ্ছেন:
টিকাদান নিশ্চিতকরণ: যেসব শিশু নির্ধারিত সময়ে হাম ও রুবেলার (এমআর) টিকা পায়নি, তাদের দ্রুততম সময়ে সম্পূরক টিকার আওতায় আনা।
অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার রোধ: হাম একটি ভাইরাসজনিত রোগ। তাই এতে অপ্রয়োজনে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার না করে উপসর্গভিত্তিক চিকিৎসা ও সঠিক পুষ্টির ওপর গুরুত্ব দেওয়া।
পৃথকীকরণ (Isolation): আক্রান্ত শিশুকে অন্তত এক থেকে দুই সপ্তাহ অন্য শিশুদের কাছ থেকে আলাদা রাখা, যাতে সংক্রমণ ছড়িয়ে না পড়ে।
পর্যাপ্ত তরল ও পুষ্টি: আক্রান্ত শিশুকে প্রচুর পরিমাণে তরল খাবার, ডাবের পানি, ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ খাবার এবং বুকের দুধ খাওয়ানো নিশ্চিত করা।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ইতোমধ্যে উপদ্রুত এলাকাগুলোতে বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করার পরিকল্পনা করছে। অভিভাবক ও সুশীল সমাজকে সতর্ক থাকার পাশাপাশি শিশুদের সময়মতো টিকা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এমএম