মানসিক ভারসাম্যহীনদের চিকিৎসালয় বলতে পাবনার মানুসিক হাসপাতালকেই বেশি চেনে মানুষ। তবে নিরাপদ ও ধারাবাহিক সেবার কারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে রাজধানীর শেরে বাংলা নগরে অবস্থিত জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালটি। এটি শুধু একটি হাসপাতাল নয় একটি মানসিক গবেষণা কেন্দ্রও বটে।

তবে সরকারের নজরদারী আর পর্যাপ্ত বরাদ্দের অভাবে চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হচ্ছে বলে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে।

একাধারে ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালটিতে বিদ্যমান সেবামান নিয়ে জনমনে ক্ষোভের একটাই কারণ সবকিছুর অপর্যাপ্ততা। সেবামান ভাল হলেও চিকিৎসা খরচ তৃণমূল মানুষের সামর্থের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। চিকিৎসা খরচ বেশি। এক্ষেত্রে সরকারিভাবে উদ্যোগ নেয়া হলে এবং অনুদানের পরিমাণ বাড়ানো হলে মানসিক রোগীদের সেবা আরও বেশি পরিমাণে তৃণমূল পর্যন্ত পৌছে দিতে পারে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

জানা গেছে, এখানে রয়েছে বিদ্যমান মানসিক রোগের সব ধরণের চিকিৎসা সেবা দেয়া হয়। বিদ্যমান পরীক্ষা নিরীক্ষা ও পরিবার পরিকল্পনা সেবাও দেয়া হয় এখানে।

কলেবর ছোট হলেও প্রয়োজনে এখানে পাওয়া যায় দ্রুত জরুরি সেবা। নির্যাতিত শিশু, নারী ও অন্যান্য মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সনদও পাওয়া যায় এখানে।

মানসিক রোগ সম্পর্কিত সব ধরণের ডিপ্লোমা ও মাসিক, ৬মাস,৩মাস এমনিক ১২ মাসের ট্রেনিংয়ের সব ধরণের ব্যবস্থা আছে এই ইন্সটিটিউটে। এমনকি সারাদেশে বিভিন্ন হাসাপাতাল, ক্লিনিক ও সরকারি স্বাস্থ্য কেন্দ্রে মানসিক রোগীদের সেবাদানকারী ডাক্তার, নার্সদেরও প্রশিক্ষণ দেয়া হয় এখানে।

এছাড়া সরকারি বেসরকারি প্রয়োজনে, এমনকি সামাজিক প্রয়োজনে নিজ উদ্যোগে নিয়মিত মানসিক রোগ বিষয়ক সার্ভে বা জরিপ কাজও করছে ইন্সটিটিউটটি।

গত একবছরে এখানে দুই হাজার ৬৪ জন মানসিক রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। আর ২২ হাজার এক শ’ ৯৬ জন রোগী সরাসরি হাসপাতালের বহি:বিভাগ থেকে ডাক্তারের পরামর্শ ও ঔষধপত্র পেয়েছেন।

গত ৫ বছরের হিসেব অনুযায়ী এখানে ১০ হাজার তিন শ’ ২০ জন রোগী হাসপাতালে থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন। আর বহি:বিভাগ থেকে ১ লাখ ৯শ’ ৮০ জন নিয়েছেন ডাক্তারি পরামর্শ ও ঔষধপত্র।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালটি সূত্রে জানা গেছে, এতো উন্নত সব চিকিৎসা আর প্রশিক্ষণের কারণে জনপ্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এটি। তবে ডাক্তার ও নার্সের অপর্যাপ্ততা, আর সরকারি কম অনুদানের কারণে সেবা মান সব সময় নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

ভালো চিকিৎসার কারণে পরিচিতি বেড়ে যাওয়ায় আগের তুলনায় রোগীও আসছে বেশি। এক্ষেত্রে রোগীর তুলনায় সবকিছুর অপর্যাপ্ততা রয়েছে।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালটিতে মূল সমস্যা জায়গার অভাব। কম সংখ্যক জায়গা জুড়ে অবস্থিত এটি। ছোট ছোট সব ভবন। এখানে আলাদা আলাদা বিভাগ থাকলেও বিভাগ কেন্দ্রিক আলাদা কোনো ওয়ার্ড, কেবিন নেই।

এখানে বিভাগ রয়েছে ৫টি। ইনডোর বা অন্ত:বিভাগ, আউটডোর বা বহি:বিভাগ, জরুরি বিভাগ, চাইল্ড বা শিশু বিকাশ ক্লিনিক, যা সপ্তাহে দুদিন খোলা থাকে সোমবার ও বুধবার এবং জেটিয়াট্রিক ক্লিনিক যেখানে প্রবীনদের মানসিক সমস্যা সম্পর্কিত চিকিৎসা সেবা দেয়া হয়।

এখানে ওয়ার্ড মাত্র তিনটি। কেবিন মোট ৮টি। রোগীর আসনও সীমিত মাত্র ২০০ টি। এর মধ্যে আবার নেশাগ্রস্থ রোগীরদের জন্যই ৫০ টি আসন বরাদ্দ।

প্রতিদিন রোগীদের কেবিন ভাড়া বাবদ খরচ দিতে হয় ৪২৫ টাকা। এককালীন কেবিন ভাড়া(১০ দিন) ৪২৫০ টাকা। পেয়িং বেডের খরচ ২৭৫০ টাকা। ভর্তি ফি ১৫ টাকা। এখানে পেয়িং বেডের ৬০ শতাংশের খরচ বহন করতে হয় রোগীর পরিবারকে। আর বাকি মাত্র ৪০ শতাংশ বহন করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

এসব মিলিয়ে এতোসব খরচ রোগীর পরিবারের পক্ষে বহন করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই অনেকে চিকিৎসা শেষ না হতেই অনেকে রোগী নিয়ে ফিরে যান বলেও জানা গেছে।

এখানে সবচেয়ে বড় সমস্যা লোকবলের অভাব। মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালের অফিস সূত্রে জানা গেছে, এখানে মোট লোকবলের সংখ্যা মাত্র ১৮৪ জন। হাসপাতালটিতে ডাক্তারের পরিমাণও কম। সরকার কর্তৃক অনুমোদিত সংখ্যা মাত্র ২৪টি। তবে এখানে কর্মরত আছেন ১৯ জন। একজন ডাক্তারকে ওএসডি করে এখানে আনা হয়েছে। মোট ৫টি বিষয়ে এখনো কোনো ডাক্তার নেই।

নার্সের সংখ্যাও কম। মোটে মাত্র ৪১ জন। এরমধ্যে প্রশিক্ষিত নার্সের সংখ্যা আরও কম।
হাসপাতালে রোগীদের সেবাশুশ্রুতার জন্য কমপক্ষে এর তিন গুন বেশি নার্স দরকার। তৃতীয় ও ৪র্থ শ্রেনী মিলে পদ রয়েছে মাত্র ৬৩টি। এর বিপরীতে কর্মরত ৫১ জন। বাকি ১২টি পদ শূণ্য রয়েছে।

তিন শিফটে চলে হাসপাতালটি। লোকবলের অভাবে সব শিফটে পর্যাপ্ত সেবা মান নিশ্চিত করা যাচ্ছে না বলে দাবি জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালের সার্বিক বিষয় নিয়ে কথা হয় পরিচালক অধ্যাপক ডা: মো. ওয়াজিউল আলম চৌধুরীর সাথে। তিনি টাইমনিউজবিডি’কে বলেন, মানসিক রোগ নিয়ে মানুষের মধ্যে ভুল ধারণা আছে। এখনো মানুষ ঝার ফুঁকে বেশি বিশ্বাসী। আবার অনেকেই জানেনই না মানসিক সমস্যা কোনো রোগ।

এই রোগের চিকিৎসার জন্য দেশে মানসিক হাসপাতাল ও ইন্সটিটিউট আছে। দেশের অনেক সরকারি স্বাস্থ্য কেন্দ্রে এখন মানসিক রোগের বিষয়টি গুরুত্বসহ দেখা হয়। এক্ষেত্রে আমাদের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালটি তৃণমূল পর্যন্ত পরিচিতি পেয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

এখানে সব ধরণের মানসিক সমস্যার চিকিৎসা সেবা বিদ্যমান। সাইকো থেরাপির ব্যবস্থাও করা হয়েছে সম্প্রতি। ইলেক্ট্র কনভালসি থেরাপি-ও (ইসিটি) দেয়া হয়। আমাদের এখানে রোগীদের প্রয়োজনীয় সব ঔষধই পাওয়া যায়। সব ঔষধ বিনামূল্যে সরবরাহ করা হয়। রোগীদের তিন বেলা বিনামূল্যে খাবার দেয়া হয় বলেও জানান তিনি।

তিনি বলেন, ছোট্ট কলেবরে আমরা চেষ্টা করি সর্বোচ্চ সেবামান নিশ্চিত করার জন্য। কোনো রোগী যেন নিরাশ হয়ে ফিরে না যায় সে চেষ্টায় করা হয়। তবে ডাক্তারের সংখ্যাও কম। সব মিলিয়ে আমাদের লোকবলের অভাবও রয়েছে। অন্য হাসপাতালের তুলনায় অনেক বেশি পরিচ্ছন্ন আমাদের এখানকার পরিবেশ।

তিনি বলেন, আমাদের মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালে নিজস্ব এম্বুলেন্স নেই। সে কারণে রোগীদের জন্য এম্বুলেন্স সেবাও আমরা দিতে পারি না।

হাসপাতালের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে তৃণমূল মানুষের সেবামান নিশ্চিত করতে পেয়িং বেডে শতকরা ৬০ শতাংশ যেন সরকার বহন করে। সেজন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বরাবর আবেদন করা হয়েছে।

তিনি বলেন, সরকারের কাছে আমাদের দাবি বেশি বরাদ্দ আর লোকবল বৃদ্ধি করা হোক। একাধিকবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়কে অবগত করা হয়েছে। আমাদের আশ্বস্ত করা হয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় কম বরাদ্দ পেয়েছি বারবার।

সরকারি বরাদ্দ কম পাওয়ার কারণে আমরা চাইলেও সামর্থ্য অনুযায়ী সেবা নিশ্চিত করতে হয়। বরাদ্দ বাড়লেই আর কোনো সমস্যা থাকবে না বলে দাবি পরিচালক অধ্যাপক ডা:মো.ওয়াজিউল আলম চৌধুরীর।

ঢাকা, জেইউ, ১২ আগস্ট, টাইমনিউজবিডি.কম, এসআর