আজ ৮ মে বিশ্ব থেলাসেমিয়া দিবস। থেলাসেমিয়া অর্থ হচ্ছে রক্ত শূন্যতা। এটি এমন একটি রোগ যা শিশু জন্মের সময় তার বাবা-মায়ের কাছ থেকে পেয়ে থাকে।

থেলাসেমিয়া হচ্ছে এক ধরনের বংশগতির রক্তের সমস্যা। এ রোগটির ফলে দেহে হিমোগ্লেবিন ও রক্তের লোহিত কনিকা উৎপাদন ব্যাহত হয়। এ কারণে রোগীর দেহে স্বাভাবিকের চেয়ে কম লোহিত কণিকা ও কম হিমোগ্লোবিন থাকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রক্তে লোহিত কণিকার মাত্রা থাকে খুবই কম।

যার ফলে এই রোগে আক্রান্ত রোগীকে নিয়মিত রক্ত সঞ্চালন না করলে তার পক্ষে বেঁচে থাকা সম্ভব হয় না। রোগীকে এক মাসে একবার অথবা ২ বার রক্ত সঞ্চালন করতে হয়।

বাংলাদেশ থেলাসেমিয়া ফাউন্ডেশন (বিটিএফ)-এর হিসাব অনুযায়ী ২০০৭ সালে এ দেশে থেলাসেমিয়ায় আক্রান্ত লোকের সংখ্যা ছিলো ৭ শতাংশেরও বেশি। এ হিসেবে আনুমানিক ১ কোটি ১২ লাখ বাংলাদেশী থেলাসেমিয়া বাহক। বিটিএফ আরো জানায়, এ দেশে প্রতি বছর প্রায় ৭ হাজার ৪৮৩টি শিশু এ রোগ নিয়ে জন্মায়।

বিটিএফ’র মহাসচিব ডা. মো. আব্দুর রহিম জানান, ‘এই রোগ সম্পর্কে প্রকৃত জ্ঞানের অভাবের কারণে প্রতিনিয়ত এই রোগে আক্রান্ত লোকের সংখ্যা বাড়ছে। সন্তান নেয়ার আগে পিতা-মাতা অজ্ঞতাবশত কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষাই করান না।’

থেলাসেমিয়া কত প্রকার ও কি কি:

থেলাসেমিয়া ২ রকমের যথা

১. মাইনর

২. মেজর।

থেলাসেমিয়ার উপসর্গগুলো হল:

১. মুখের হাড়ে বিকৃতি

২. শক্তি কম থাকা, অবসাদ অনুভব করা, ঘুম ভাব

৩. চামড়া হলুদ হওয়া (মনে হবে জন্ডিস)

৪. শারীরিক বৃদ্ধি না হওয়া

থেলেসেমিয়া রোগ সম্পর্কে ডাক্তারি ব্যাখ্যা:

থেলেসেমিয়া এক ধরনের বংশগত রোগ যাতে হিমোগ্লোবিন তৈরীতে বাধার সৃষ্টি হয়ে শরীরে রক্তশুন্যতা সৃষ্টি হয়।

শিশুরা যখন মায়ের গর্ভে থাকে তখন রক্তের হিমোগ্লবিন কে বলে হিমোগ্লবিনএফ (HBF)। জন্মের পরে তা পরিনত হিমোগ্লবিনে পরিনত হয়।থেলাসেমিয়াতে HBF পরিনত হিমোগ্লোবিনে রুপান্তরিত হয়না। ফলে তা ১২০দিনের আগেই ভেঙে যায়। ১২০ হলো পরিনত হিমোগ্লবিনের লাইফসাইকেল।

মাইনরে ২৫% হিমোগ্লবিন HBF থাকে। ফলে মাইনর প্যাশেন্ট স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে। কিন্তু মেজরে ৭৫% এরবেশী HBF থাকে। ফলে হিমোগ্লোবিন নির্দিস্ট সময়ের আগেই ভেঙে যায় এবং রোগী অস্বাভাবিক রক্ত শুন্যতায় ভুগতে থাকে।

যদি বাবা ও মার দুজনেরই থেলেসেমিয়া মাইনর থাকে তাহলে বাচ্চা মেজর হবে। এক্ষেত্রে রক্তের গ্রুপের কোনো সম্পর্ক নাই। বিকলাংগ হবারও কোনো সম্ভাবনা নাই। থেলাসেমিয়া রক্তের গ্রুপের কোনো সমস্যা নয়, বোন মেরুর সমস্যা যা হলো হিমোগ্লোবিনের কারখানা। যদি বাবা পজেটিভ ও মা নেগেটিভ রক্তের (একই গ্রুপের) হয় এবং বাচ্চা পজেটিভ হয় তাহলে ২য় বাচ্চার ক্ষেত্রে কিছু জটিলতা হতে পারে।

কিন্তু, এখন মাকে এন্টিডি ভ্যাকসিন দেয়া হয়, তাই ২য় বাচ্চার ক্ষেত্রেও জটিলতার সম্ভাবনা ০%। ১ম বাচ্চার ক্ষেত্রে কোনোই সমস্যা নাই। আর যদি বাচ্চা নেগেটিভ হয় তবে কোনোই সমস্যাই নাই। বাবা নেগেটিভ, মা পজেটিভ হয় এবং বাচ্চার নেগেটিভ হয় তবে বাচ্চাকে এন্টিডি দেয়া হয়। বাবা নেগেটিভ, মা পজেটিভ এবং বাচ্চাও পজেটিভ; তবে কোনোই সমস্যা নাই।

বাবা ও মায়ের রক্তের গ্রুপ এক এবং আর এইচ ফেক্টর (পজেটিভ/নেগেটিভ) একই হলে কোনো সমস্যা হয় না বাচ্চার ক্ষেত্রে। ডাক্তারের সাথে পরামর্শ অবশ্যই করতে হবে।

থেলাসেমিয়া রোগের প্রতিকার:

এই রোগের স্বাভাবিক কোন প্রতিকার নেই। থেলাসেমিয়া বা রক্ত শূন্যতা যাদের মেজর তাদের প্রতি ১৫-৩০ দিনে একবার করে রক্ত সঞ্চালন করতে হয় তা না হলে রোগীর পক্ষে বেঁচে থাকা সম্ভব হবে না।

আর এই রোগের চিকিৎসা অনেক ব্যয়বহুল যা সবার পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। এই রোগের একটাই মাত্র চিকিৎসা আর তা হল বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট। বাংলাদেশে এই চিকিৎসা করার কোনো ব্যবস্থা নেই। এর জন্য ভারত কিংবা সিঙ্গাপুর যেতে হবে। এই চিকিৎসার জন্য ২০ লক্ষ টাকার মতো ব্যয় হয়। এই চিকিৎসার সফলতার শতকরা হার ৭০-৮০ ভাগ।

এছাড়া কিছু চিকিৎসক দাবি করছেন আকু প্রেসার থেরাপি এবং ফুড থেরাপির মাধ্যমে থেলাসেমিয়া ভাল করা সম্ভব।

থেলাসেমিয়া থেকে বাঁচার কিছু সম্ভাব্য উপায়:

১. আন্তঃপরিবার বিবাহ বন্ধ করা উচিত।

২. যদি আপনার থেলাসেমিয়া থাকে (মেজর/মাইনর) তাহলে যাকে বিয়ে করবেন তার থেলাসেমিয়া আছে কিনা তা অবশ্যই পরীক্ষা করে নেয়া।

৩. রক্তের গ্রুপ ম্যাচ করে বিয়ে করতে হবে যাতে পরবর্তীতে সন্তান যেন এই রোগের ধারক না হয়।

৪. যার থেলাসেমিয়া মাইনর তাকে অবশ্যই খাওয়া দাওয়ার প্রতি যত্মশীল হবে হবে।

 

ইআর