এদিকে, ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা (এলডিসি) থেকে বাংলাদেশ বের হলে ওষুধের দাম কয়েকগুণ বাড়তে পারে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা। এতে করে প্রথম শ্রেণীর কাঁচামালের মেধাস্বত্ত আইনে আটকে যেতে পারে সহজে আমদানি ও ওষুধ তৈরির সুযোগ পাবে না।

বর্তমানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও জাতিসংঘের আইন অনুযায়ী স্বাল্পোন্নত দেশুগুলো নতুন উদ্বাবিত যেকোনো জেনেরিকের ওষুধ নিজেদের জন্য উৎপাদন করতে পারে। এলডিসি থেকে বের হলে এই সুবিধা পাবে না। এতে জেনেরিকের উদ্ভাবনকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর থেকে স্বত্ত ক্রয় করতে হবে। এতে ওষুধের উৎপাদন খরচ বাড়তে পারে কয়েকগুণ। এ অবস্থায় গবষেণায় বিনিয়োগের পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।

এদিকে, ১০ বছর আগে ওষুধের কাচাঁমাল উৎপাদানের লক্ষ্যে ২০১৩ সালে মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ায় ২শ একর জায়গায় নির্মাণ করা হয় একটিভ ফার্মাসিউটিক্যালস ইনগ্রিডিয়েন্ট-এপিআই পার্ক। ৪৩টি প্লট বরাদ্ধ দেয়া হলেও ১০ বছরে দৃশ্যমান কোনা অগ্রগতি নেই। গবেষণায় অর্থ লগ্নির আগ্রহ নেই বড় কোম্পানিগুলোর। এতে অনেকটা মুখ থুবড়ে পড়েছে সরকারের বড় এ প্রকল্প। এমনকি কাঁচামাল উৎপাদনে করছাড় এবং রপ্তানিতে ২০ শতাংশ প্রণোদনার ঘোষণা দেয়া হলেও আগ্রহ নেই কোম্পানিগুলোর।

এবিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. সায়েদুল ইসলাম খসরু বলেন, ‘এপিআই খাতে বিনিয়োগ এখন এ খাতের বড় দাবি। আমাদের ওষুধ কোম্পানিগুলো অনেক ভালো করেছে এটা আমাদের স্বীকার করতেই হবে। তবে সরকার যেভাবে এ খাতকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে বড় করেছে সে অনুযায়ী কোম্পানিগুলো নিজেদেরকে করতে পারেনি। তারা কোনোভাবেই ওষুধের প্রথম শ্রেণীর মলিগুলের জন্য গবেষণায় বিনিয়োগের ঝুঁকি নিতে চায়নি। ২০২৬ সালের পর যদি আমাদের স্বল্পোন্নত দেশের সুবিধা না পায় তাহলে এ খাত বড় সংকটের মধ্যে পড়তে পারে।’

গবেষণা খাতে দেশের বিজ্ঞানিরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মৌলিক গবেষণা করে নতুন ওষুধ আবিষ্কার করতে সক্ষম হলেও দেশে তা এখনও সম্ভব হয়নি। এবিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাসি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. সীতেশ চন্দ্র বাছার বলেন, ‘গবেষণা খাতে ওষুধ কম্পানিগুলোকে বিশ্ববিদ্যালয়মুখি হতে হবে। আমদের দেশে অনেক ভালো গবেষক আছে। তারা যথাযথ ফান্ড না পাওয়ায় গবেষণা এগিয়ে নিতে পারছে না। এছাড়া আমদের দেশ থেকে গ্রাজুয়েট করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গিয়ে ভালোমানের গবেষণা করছে। তাদেরকে প্রয়োজনে কাজে লাগাতে হবে।’

ডা. সীতেশ চন্দ্র এ ব্যপারে আরও বলেন, উন্নত বিশ্বে সাধারণত কোম্পানিগুলো তাদের সমস্যা নিয়ে প্রতিষ্ঠানে যায়। সেখানে নির্দিষ্ট সময় ধরে গবেষণার পর নতুন কিছু আবিষ্কার এবং সমাধান বের করে। এতে কোম্পানিগুলো যেমন লাভবান হয়, তেমনি একটা দেশের সক্ষমতাও বাড়ে। এজন্য ইন্সিটিটিউশন এবং কোম্পানিগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই। এজন্য প্রয়োজনে সবাইকে এ ব্যপারে মধ্যস্ততার পরামর্শ দেন এই বিশেষজ্ঞ।

অন্যদিকে কোম্পানিগুলোর আগ্রহ না থাকার ব্যপারে ইউনিমেড ইউনি হেলথ ফার্মাসিউটিক্যালসের উপ-মহা ব্যববস্থাপক ও বিশ্ব ব্যাংকের সাবেক কনসালট্যান্ট ড. আবু জাফর সাদেক বলেন, এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের কোম্পানিগুলোর বড় আকারে কাঁচামাল উৎপাদনের সক্ষমতা নেই। ফলে অল্প পরিমাণ কাঁচামাল উৎপাদন এবং এর প্রযুক্তিগত ব্যায়ে আমদানির চেয়ে অনেক বেশি পড়ে। এ কারণে অনেক কোম্পানি এখন পর্যন্ত আমদানিকেই লাভজনক বলে মনে করছে।’

এদিকে এলসিডির প্রভাবে কাঁচামালের দামে কোনো প্রভাব পড়বে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে ডা. সাদিক বলেন, সবগুলো কাঁচামালে দামে প্রভাব পড়বে না। কারণ একটা নতুন উদ্ভাবিত ওষুধের ১৫ বছর পর্যন্ত মেধাস্বত্ত্ব থাকে। ১৫ বছরের বেশি যেসব ওষুধ সেগুলোতে তেমন প্রভাব পড়বে না। তবে নতুন ওষুধ আবিষ্কার হওয়ার সঙ্গেই আমরা যেভাবে সেই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ওষুধ উৎপাদন করে আসছি, সেটি হয়তো সম্ভব হবে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘এ শিল্প যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং বিশ্ববাজারে ১৫০টিরও বেশি দেশে বাংলাদেশ ওষুধ রপ্তানি করছে তাতে আমাদের এখন গবেষণায় অনেক বেশি বরাদ্ধ বাড়াতে হবে। তাছাড়া যে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জগুলো দেখা দিবে সেগুলো মোকাবিলা করা কঠিন হবে।’

এইচএম