ধূমপান, মদ্যপান ইত্যাদি যে ক্যানসার উদ্দীপক, তা সবাই জানে। কিন্তু একবার অভ্যাস গড়ে উঠলে তা ছাড়া সহজ নয়। প্রশ্ন হলো, ক্ষতিকর জেনেও কেন আমরা এগুলো ছাড়া চলতে পারি না? মনস্তত্ত্ববিদরা এর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন।
জার্মানিতে প্রাপ্তবয়স্কদের এক চতুর্থাংশ ধূমপান করেন। ৯.৫ মিলিয়ন মানুষ অতিরিক্ত মদ্যপান করেন। এ ছাড়া ৬৭ শতাংশ পুরুষ এবং ৫৩ শতাংশ নারীর ওজন মাত্রাতিরিক্ত। সূর্যস্নানের বিকল্প হিসেবে ‘সোলারিয়াম'বা ‘সান' স্টুডিওগুলিতেও খদ্দেরের অভাব হয় না।
'বিচারবুদ্ধি নয়, অভিজ্ঞতাই মানুষকে প্রেরণা দেয়', বলেন বন ইউনিভার্সিটির মনস্তত্ত্ব ও সাইকোথেরাপি বিভাগের পরিচালক ফ্রান্সিসকা গাইসার৷ তার ভাষায়, ‘‘আমরা সাধারণত নিজেদের ভালো ও মন্দ অভিজ্ঞতা মস্তিষ্কে সংরক্ষণ করে রাখি। ক্যানসার সম্পর্কে পত্র-পত্রিকার পরিসংখ্যানটা মাথায় রাখি না।"
মানুষের মধ্যে অনেক আচরণ গড়ে ওঠে পুরানো অভ্যাস থেকে বা বড়দের অনুকরণ করে৷ যেমন বাড়িতে মা যা রান্না করতেন, তা থেকেই মানুষের খাওয়া-দাওয়ার অভ্যাস গড়ে ওঠে৷ বলেন লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের ক্যানসার গবেষক এলিয়ো রিবোলি৷ ছেলে-মেয়েরা ধূমপান শুরু করে বাবা-মা কিংবা বন্ধু-বান্ধবকে অনুকরণ করে৷
‘‘আমি এমন কাউকে চিনি না, যার কাছে প্রথম সিগারেটটা ভালো লেগেছে,’’ বলেন বার্লিনের মাক্স প্লাঙ্ক ইন্সটিটিউটের শিক্ষাগবেষণা বিভাগের পরিচালক গ্যার্ড গিগারেনৎসার৷
গায়ের রং ‘ট্যান' করার জন্য সোলারিয়াম বা সান স্টুডিওতে যাওয়ার ব্যাপারেও আশেপাশের মানুষরাই ‘দায়ী' বলে জানান হাইডেলব্যার্গের ‘ন্যাশনাল সেন্টার ফর টিউমার ডিজিস'-এর সিনিয়র ডাক্তার জেসিকা হাসেল৷ তার ভাষায়, ‘‘বেশিরভাগ মানুষই জানে ‘সানবাথ' ক্ষতিকর। কিন্তু তবুও কাজটি করে থাকেন তারা৷ কেননা তারা ছুটি কাটিয়ে এসে লক্ষ্য করেন যে, গায়ের রং ঠিকমতো বাদামি হয়নি৷ পরিচিতরা প্রশ্ন করেন, তুমি কি ছুটি কাটিয়ে এসেছ? দেখলে তো বোঝাই যায় না৷'' অনেকে অবশ্য ফ্যাশন বা নিতান্ত ভালোলাগার কারণেই গায়ের চামড়া ট্যান করান৷
কাজটা ক্ষতিকর জেনেও মানুষ যদি তা করতে থাকে, তাহলে একটা অন্তর্দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়৷ বলেন মনস্তত্ত্ববিদ গাইসার৷ ক্যানসারের কারণ সম্পর্কে পাওয়া তথ্যাদি ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়৷ কিংবা কিছু খোঁড়া যুক্তি দাঁড় করান: ‘‘উইনস্টন চার্চিল ধূমপান করতেন এবং খেলাধুলাও করতেন না৷
‘আপনার ক্যানসার ধরা পড়েছে’ এমন দুঃসংবাদ শোনার জন্য কেউ কখনো অপেক্ষা করেনা৷ তবে একটু সাবধানতা অবলম্বন করলে হয়তো ক্যানসার রোগীর সংখ্যা অর্ধেক হতে পারে৷ ক্যানসার রোগীর প্রতি পাঁচজনের একজনই হচ্ছে ধূমপায়ী৷ বিষাক্ত তামাকের ধোঁয়া যে শুধু ফুসফুসের ক্যানসারের জন্যই দায়ী তা নয়, ধূমপান অন্যান্য ক্যানসারের হওয়ারও একটি কারণ৷ তবে ধূমপান ক্যানসার হওয়ার একমাত্র কারণ নয়৷
'কিন্তু তিনি তো অতিবৃদ্ধ হয়েছিলেন।' অথবা বলা হয়, ‘‘আমার খালা ধূমপান করতেন৷ তিনি ১০৬ বছর বয়সে বার্ধক্যজনিত দুর্বলতায় মারা গিয়েছেন৷ এসব শুধু ভয় দেখানো৷''
মাঝে মাঝে প্রাক্তন জার্মান চ্যান্সেলর হেলমুট শ্মিটের দৃষ্টান্তও দেওয়া হয়৷ তিনি ‘চেইন স্মোকার' এবং তার বয়েস এখন ৯৭৷
আর একটি জনপ্রিয় যুক্তি হলো, প্রত্যেককেই মৃত্যুবরণ করতে হবে৷ ‘‘জীবনটাই তো বিপজ্জনক৷ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তার শেষ হয় মৃত্যুতে।" এভাবেই ফেসবুকে লিখেছেন একজন।
গাইসার বলেন, ‘‘এইসব দৃষ্টান্ত থেকে বোঝা যায় কীভাবে মানুষ অস্বস্তিকর তথ্যগুলিকে পাশ কাটাতে চায়৷
সঠিক সময় চিকিৎসা করালে বিষাক্ত মাশরুম খেয়ে ফেললেও বেঁচে যায় মানুষ আর তা না হলে মারা যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি৷ এক্ষেত্রে একটি ঘটনার পর সাথে সাথে একটি ফলাফল পাওয়া যায়৷ কিন্তু ক্যানসারের ক্ষেত্রে বিষয়টি কিছুটা ভিন্নরকম৷ আমাদের অনেক অভ্যাস ক্যানসারের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।"
‘‘মানুষ আশা করে, ধূমপান করলে কিংবা স্থূলকায় হলেও রোগটি নাও হতে পারে৷ আর এই আশা থেকেই অভ্যেসটাও বদলাতে চায় না মানুষ।" বলেন জার্মান ক্যানসার রিসার্চ সেন্টারের গবেষক রুডলফ কাক্স।
মনস্তত্ত্ববিদ গ্যার্ড গিগারেনৎসার-এর মতে মানুষের মনোজগৎ নয়, বরং সমাজই এক্ষেত্রে দায়ী৷
সবাই চায় নিজেকে সুন্দর দেখাক, তার দিকে তাকিয়ে থাকুক অন্যরা৷ কিন্তু তাই বলে ক্যানসারের মতো মারণব্যাধিকে উপেক্ষা করে? হ্যাঁ, তাই করছে জার্মানিসহ বিশ্বের নানা দেশে এই প্রজন্মের অনেক ছেলে-মেয়ে৷
জীবনের জন্য কোন ঝুঁকিটা বেশি তা ভালোভাবে পরিমাপ করা উচিত৷ তার ভাষায়, ‘‘আমরা প্রায়ই ভুল জিনিসকে ভয় পাই৷ যা সম্ভবত জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ নয়৷ যেমন অনেকে ‘চেইন স্মোকার' হলেও ক্যানসারের ভয়ে জিন পরিবর্তন করা ভুট্টা খেতে ভয় পান।"
গ্যার্ড গিগারেনৎসার-এর মতে অল্প বয়সেই ক্যানসারের ঝুঁকি সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া উচিত৷ তিনি বলেন, ‘‘ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াইতে যে অর্থ ব্যয় করা হয়, তার অর্ধেকও যদি বাচ্চাদের ক্যানসারের ঝুঁকি বোঝানোর ব্যাপারে ব্যয় করা হতো, তাহলে আমাদের ক্যানসারে মৃত্যুর হারও অনেক কমে যেত।"
যুক্তরাজ্যের ক্যানসার রিসার্চ ইন্সটিটিউট ক্যানসার দমনে জোরালো পদক্ষেপ নিয়েছে৷ ধূমপান, মদ্যপান, বিকল্প সূর্যস্নান ও অতিরিক্ত মেদের ব্যাপারে বিভিন্ন তথ্যাবলী দেওয়া হচ্ছে৷ প্রতিষ্ঠানের স্বাস্থ্যবিষয়ক মুখপাত্র বলেন ‘‘আমরা মানুষকে বলতে চাই না, তাদের কী করা উচিত৷ আমরা শুধু তথ্য সরবরাহ করতে চাই, যা থেকে দৃঢ় একটা সিদ্ধান্ত নিতে পারে তারা।"
তবে শুধু তথ্যই পৌঁছে দেওয়াই অভ্যাস বদলানোর ব্যাপারে যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন মনস্তত্ত্ববিদ গাইসার৷ ‘‘এখানে অনুভূতির একটা বড় ভূমিকা রয়েছে৷ যেমন কেউ যদি মনে করে খেলাধুলার পর ভালো বোধ করবে তাহলে সে খেলতে আগ্রহীও হবে।"
প্রসঙ্গত, অ্যামেরিকায় তামাকবিরোধী লবি ধূমপানকে দুর্বলতা হিসাবে তুলে ধরেছে৷ আর সেটা ফলপ্রসূও হচ্ছে। সূত্র: ডয়চে ভেলে
[b]ঢাকা, ২৪ ফেব্রুয়ারি (টাইমনিউজবিডি.কম)//এমএ[/b]
স্বাস্থ্য
ক্ষতিকর জেনেও অনেক অভ্যাস ছাড়া কঠিন; কিন্তু কেন?
ধূমপান, মদ্যপান ইত্যাদি যে ক্যানসার উদ্দীপক, তা সবাই জানে। কিন্তু একবার অভ্যাস গড়ে উঠলে তা ছাড়া সহজ নয়। প্রশ্ন হলো, ক্ষতিকর জেনেও কেন আমরা এগুলো ছাড়া চলতে পারি না? মনস্তত্ত্ববিদরা এর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন।





