কুসুম একজন প্রাণোচ্ছল হাসি-খুশি স্বভাবের মেয়ে। অন্যসব মেয়ের মতো স্বামী-সন্তান নিয়ে সুখী-স্বচ্ছল সংসারের স্বপ্নে বিভোর হয়ে নতুন জীবন শুরু করে। শুরুটা ভালই ছিল। কিন্তু মা হওয়া আর হয় না। একে একে ১১টি বছর কেটেছে বন্ধ্যাত্বের দুর্নাম নিয়ে। প্রতিনিয়ত স্বপ্ন দেখেছে, কবে তার কোলজুড়ে আসবে একটি সন্তান, আর মুক্তি মিলবে বন্ধ্যাত্ব থেকে। এর মধ্যে তার তলপেটে ব্যাথা অনুভব হয়। চেক-আপ করাতে গিয়ে জানতে পারে তার জরায়ুতে বাসা বেঁধেছে এক অনাকাঙ্খিত মাংসপিণ্ড। চিকিৎসা বিজ্ঞানে যার নাম টিউমার।
রিনা, দুই সন্তানের মা। রিনা’র প্রথম সন্তান অপ্রশিক্ষিত ধাত্রী দ্বারা বাড়িতে প্রসব হয়। যিনি প্রসব করান, তার নখের আঘাতে রিনার যৌনাঙ্গে ক্ষতের সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে এটি স্থায়ী ক্ষতে পরিণত হয়। সময় মতো চিকিৎসা না নেয়ায় সেটি মারাত্মক আকার ধারণ করে। চিকিৎসকের পরামর্শে তার জরায়ু কেটে বাদ দেয়া হয়, তা না হলে সেটি ক্যান্সারে রূপান্তরিত হতে পারতো।
উপরোক্ত ঘটনা দু’টি পর্যবেক্ষণ করে আমরা বলতে পারি জরায়ু ক্যান্সার নারীদের জন্য একটি ভয়াবহ ব্যাধি। বিশ্বে প্রতি ২ মিনিটে একজন নারী জরায়ুমুখ ক্যান্সারে মৃত্যুবরণ করে এবং প্রতি বছর ৫০ লাখের অধিক নারী নতুন করে এই ভয়াবহ রোগে আক্রান্ত হন।
জরায়ু ক্যান্সারের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগের চেয়ারম্যান, অধ্যাপক ডা. সালেহা বেগম চৌধুরী বলেন, "১৮ বছরের নিচে মা হলে বা শারিরীক সম্পর্ক স্থাপন করে থাকলে, বহুগামিতা, ২০ বছরের নিচে গর্ভধারণ ও মা হওয়া, অধিক ও ঘন ঘন সন্তান প্রসব, যৌনাঙ্গ অপরিচ্ছন্ন রাখা এবং স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাব, বিভিন্ন রোগ-জীবাণু দ্বারা জরায়ু বারবার আক্রান্ত হওয়া, জরায়ু ক্যান্সারের কারণ।"
তিনি আরো বলেন, "হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস, যেটি শুধুমাত্র অনিরাপদ শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে নারী দেহে সংক্রমিত হয় এবং ইনফেকশন হয়ে ক্যান্সারে রূপায়িত হয়।"
সালেহা বেগম বলেন, "সাধারণত ১৫-৪৫ বছরের নারীদের শরীরে জরায়ু ক্যান্সারের ভাইরাস আক্রমণ করে। কিন্তু এর লক্ষণ প্রকাশের আগে ২-২০ বছর নারী দেহে এর ভাইরাস সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে। আবার এই ভয়ানক ভাইরাস একই শরীরে একাধিক বারও আক্রমণ করতে পারে। আশার বিষয় বর্তমানে এর টিকা আবিস্কৃত হয়েছে। দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এ টিকা দেয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।"
এই রোগের করণীয় সম্পর্কে বলতে গিয়ে ডা. সালেহা আরো বলেন, "রোগের চিকিৎসার পরিবর্তে প্রতিরোধ অর্থাৎ রোগটা হতে না দেয়াই হলো বুদ্ধিমানের কাজ। যদিও সকল রোগের ক্ষেত্রে প্রতিরোধ সম্ভব হয় না, তবে জরায়ু-মুখের ক্যান্সার প্রতিরোধ করা সম্ভব। কারণ চিকিৎসক সহজেই জরায়ু-মুখ দেখতে এবং পরীক্ষা করতে পারেন। প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়লে সামান্য চিকিৎসার মাধ্যমে প্রতিরোধ করা সম্ভব। এক্ষেত্রে জরায়ু ফেলে দেবার প্রয়োজন হয় না।"
বিভিন্ন স্ক্রিনিং টেস্ট যেমন প্যাপ স্মেয়ার টেস্ট, এইচপিভি টেস্ট, ভিস্যুয়াল ইন্সপেকশান অব সার্ভিক্স উইথ এ্যাসিটিক এ্যাসিড (ভায়া) টেস্টের মাধ্যমে জরায়ু-মুখের ক্যান্সার সনাক্ত ও প্রতিরোধ সম্ভব। ক্যান্সারপূর্ব অবস্থায় খালি চোখে জরায়ুমুখে কোন প্রকার ক্ষত বা চাকা দেখা যাবে না। স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যে পদ্ধতিতে জরায়ুমুখের ক্যান্সারপূর্বাবস্থা সনাক্ত করা হয়, তাকে ভায়া বলে। এ পদ্ধতিতে জরায়ুমুখ পরীক্ষা করলে ক্যান্সারপূর্ব অবস্থায় সাদা রং ধারণ করে।
এ রোগের চিকিৎসা বিষয়ে ডা. সালেহা বলেন, "দ্রুত রোগ ধরা পড়লে অপারেশনের মাধ্যমে জরায়ু কেটে বাদ দেয়া যেতে পারে। কিন্তু দেরি হয়ে গেলে রোগের ব্যাপকতা লাভ করবে, সেক্ষেত্রে কেমোথেরাপি এবং রেডিওথেরাপির মাধ্যমে চিকিৎসা দেয়া যেতে পারে।"
জরায়ুমুখ ক্যান্সার মুক্ত রাখতে চাইলে প্রতি তিন বছর অন্তর চিকিৎসকের মাধ্যমে জরায়ুমুখ অবশ্যই পরীক্ষা করাতে হবে। ৩০ বছরের বেশি বয়স হলেই জরায়ুমুখ অবশ্যই পরীক্ষা করাতে হবে, তবে বিয়ের বয়স ১০ বছর হলেই এবং সেক্ষেত্রে বয়স ৩০-এর কম হলেও তাকে অবশ্যই জরায়ুমুখ পরীক্ষা করাতে হবে।
প্রত্যেক দম্পতি যদি সচেতন হন, অধিক সন্তান নেয়া থেকে বিরত থাকেন, গর্ভপাত এড়িয়ে চলেন, জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার করেন, ১৫-৪৫ বছর বয়সী নারী জরায়ু ক্যান্সার রোধে টিকা গ্রহণ করেন, সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা পদ্ধতি গ্রহণ করেন তবে খুব সহজেই এ রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতাই পারে নারীর সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে। একজন সুস্থ নারীই পারে সুন্দর সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখতে। রোগ যতো কঠিনই হোক, সচেতনতাই গড়ে তুলতে পারে প্রতিরোধ। সূত্র: বিএসএস
[b]ঢাকা, ১৫ মার্চ (টাইমনিউজবিডি.কম) //এমএ
[/b]
স্বাস্থ্য
জরায়ু ক্যান্সার, সমস্যা ও সমাধানের উপায়
কুসুম একজন প্রাণোচ্ছল হাসি-খুশি স্বভাবের মেয়ে। অন্যসব মেয়ের মতো স্বামী-সন্তান নিয়ে সুখী-স্বচ্ছল সংসারের স্বপ্নে বিভোর হয়ে নতুন জীবন শুরু করে। শুরুটা ভালই ছিল। কিন্তু মা হওয়া আর হয় না। একে একে ১১টি বছর কেটেছে বন্ধ্যাত্বের দুর্নাম নিয়ে।





