ডায়াবেটিক রোগীদের অনেকেরই পায়ে ঘা হয়, যাকে বলে ডায়াবেটিক ফুট। পায়ের ঘা বিস্তার লাভ করলে একপর্যায়ে পচন ধরে এবং তখন পুরো পা কেটে ফেলতে হয়। অথচ সময়মতো সঠিক চিকিৎসা নিলে এ রোগ সম্পূর্ণ ভালো হয়।

এই বিষয়ে আলোচনা করেছেন এইমস হাসপাতাল লিমিটেড, (মেরুল বাড্ডা, ঢাকা) এর প্রতিষ্ঠাতা জনাব ডাঃ মোঃ আনোয়ারুল ইসলাম।

কারণ :

দীর্ঘদিন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীদের যেসব কারণে পায়ে ক্ষত তৈরি হওয়ার প্রবণতা অনেক বেশি, সেগুলো হলো : নিউরোপ্যাথি, পরিফেরাল ভাস্কুলার ডিজিজ, ছোট কোনো ক্ষত বা পায়ের তলায় তৈরি হওয়া ফাটল বা ক্র্যাক ইত্যাদি।

নিউরোপ্যাথি :

নিউরোপ্যাথির কারণে পায়ের বোধশক্তি কমে আসে। পা তখন গরম বা ঠাণ্ডা কোনো বস্তুর সংস্পর্শে এলেও রোগী তা বুঝতে পারে না। তৈরি হয় ছোট একটি ক্ষত, যেটা পরবর্তী সময়ে বড় হতে থাকে। আবার বোধশক্তি না থাকায় অনেক সময় পায়ে ছোটখাটো আঘাত বা পায়ে কোনো কিছু ফুটে গেলেও রোগী বুঝতে পারে না। সেখান থেকে তৈরি হয় বড় ক্ষত।

পেরিফেরাল ভাস্কুলার ডিজিজ :

পায়ের হাড়, মাংস—অর্থাৎ পায়ের টিস্যু বা কোষগুলো বাঁচিয়ে রাখার জন্য সঠিক মাত্রায় রক্তপ্রবাহ প্রয়োজন। ডায়াবেটিক রোগীদের এই রক্তপ্রবাহে ব্যাঘাত ঘটে, ফলে পায়ে সহজে ক্ষত সৃষ্টি হয়, তৈরি হওয়া ক্ষত সহজে সারে না। রক্তপ্রবাহ একেবারেই বন্ধ হয়ে গেলে পায়ে পচন ধরে, যেটাকে বলা হয় গ্যাংগ্রিন। রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা না নিলে পায়ের ওই অংশ কেটে ফেলতে হতে পারে।

পায়ের তলায় ফাটল (ক্র্যাক) :

দীর্ঘদিনের ডায়াবেটিক রোগীদের পায়ের তলার চামড়া শুকিয়ে ফাটল তৈরি হয়। এই ফাটলগুলো দিয়ে রোগজীবাণুর সংক্রমণ ঘটে এবং পায়ে ও পায়ের হাড়ে ক্ষত সৃষ্টি হতে পারে।

বাড়তি সতর্কতা:

১) পায়ে হঠাৎ করে ব্যথা ও ফুলে লাল হয়ে গেলে, ফোসকা পড়লে, ছোট কোনো ক্ষত তৈরি হলে, পায়ে কিছু বিঁধলে, গরম পানি বা গরম কোনো বস্তুতে পা ঠেকলে সতর্ক হতে হবে।

২) পায়ের নখ পুরু ও বাঁকা হয়ে আঙুলের মধ্যেই প্রবেশ করলে, পায়ের হাড়ের গঠনগত কোনো ত্রুটি থাকলে। পায়ে এর আগে কোনো ক্ষতের ইতিহাস থাকলে, পায়ের বোধশক্তি এতটাই কম যে ঠাণ্ডা বা গরমের অনুভূতি বোঝা যাচ্ছে না—এমন হলেও সতর্ক হয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।জুতা ব্যবহারেও হতে হবে সতর্ক।

৩) বাইরে বের হওয়ার সময় স্যান্ডেল না পরে চামড়ার জুতা পরার চেষ্টা করুন।

৪) জুতা হতে হবে সমতল, নরম, হালকা; কিন্তু জুতার সোল শক্ত হওয়া আবশ্যক, যাতে কোনো ধারালো বস্তু জুতার সোল ভেদ করে পায়ে ক্ষত তৈরি না করে।

৫) জুতার মাপও সঠিক হওয়া চাই, যাতে বড়ও না হয় আবার ছোটও না হয়। দরকার হলে মাপ দিয়ে জুতা বানান।

পরিশেষ:

পরিশেষে এটাই বলতে চাই, সময়মতো সঠিক জায়গায় চিকিৎসা করালে ডায়াবেটিসজনিত পায়ের ঘা নিয়ন্ত্রতযোগ্য, নিরাময়যোগ্য ও সম্পূর্ণভাবে প্রতিরোধযোগ্য।

অর্থাৎ সময়মতো সঠিক চিকিৎসা নিলে পা না কেটে চিকিৎসা দিয়ে রক্ষা করা যায়। অনেক সময় হয়তো একটা আঙুল কেটে ফেলতে হয় অথবা সব আঙুল কেটে ফেলতে হয়। এতে পা রক্ষা করা সম্ভব হলে রোগীটি হাঁটতে পারে।

কিন্তু বিলম্বের কারণে ঘা বিস্তৃতি লাভ করে অনেক সময় হাঁটু পর্যন্ত উঠে যায়। তখন হাঁটুর ওপর থেকে পা কেটে ফেলে দিতে হয় রোগীকে বাঁচানোর জন্য।
তাই ডায়াবেটিক রোগীদের পায়ে সামান্য ক্ষত তৈরি হলে সঙ্গে সঙ্গে ডায়াবেটিক ফুট বিষয়ে অভিজ্ঞ কোনো চিকিৎসককে দেখানো উচিত।

ডাঃ মোঃ আনোয়ারুল ইসলাম
এমবিবিএস, এফসিপিএস
ডায়াবেটিক ফুট ও প্লাস্টিক সার্জন
বার্ণ ও প্লাস্টিক সার্জন
প্রতিষ্ঠাতা, এইমস হাসপাতাল লিমিটেড,
মেরুল বাড্ডা, ঢাকা।

এবিএস/এইচএন