মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) বিকেলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে পাঠানো ডেঙ্গুবিষয়ক নিয়মিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরা হয়। বিজ্ঞপ্তির তথ্যমতে, চলতি বছরের এখন পর্যন্ত এটি একদিনে সর্বোচ্চ মৃত্যু ও সংক্রমণের অন্যতম ঘটনা।

সংক্রমণ ও মৃত্যুর ভয়াবহ চিত্র

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া ৯ জনকে নিয়ে চলতি বছর সারাদেশে ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩১৬ জনে। অপরদিকে, এক দিনে আরও ১ হাজার ৯৫৪ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ায় এ বছর মোট আক্রান্তের সংখ্যা ১ লাখের কোটা অতিক্রম করে ১ লাখ ৩ হাজার ৩৯৬ জনে পৌঁছেছে।

পরিসংখ্যান বলছে, গত দুই বছরের তুলনায় চলতি বছরের ডেঙ্গু পরিস্থিতি অধিকতর আশঙ্কাজনক রূপ ধারণ করেছে। এর আগে গত বছরে (২০২৫ সাল) সারাদেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মোট হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন এবং মারা গিয়েছিলেন ৪১৩ জন। তারও আগের বছর, অর্থাৎ ২০২৪ সালে মোট আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন এবং মৃত্যু হয়েছিল ৫৭৫ জনের।

চলতি বছরের প্রথম ১০ মাস পার হওয়ার আগেই আক্রান্তের সংখ্যা গত দুই বছরের মোট আক্রান্তের রেকর্ডকে অতিক্রম করে গেছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, মশা নিধনে কার্যকর পদক্ষেপের অভাব এবং আবহাওয়ার অস্বাভাবিক পরিবর্তনের কারণে এ বছর ডেঙ্গুর বিস্তার লাগামহীন হয়ে পড়েছে।

হাসপাতালগুলোতে শয্যা সংকট ও রোগীদের হাহাকার

হঠাৎ করেই রোগী আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় রাজধানীর সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে তীব্র শয্যা সংকট দেখা দিয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মুগদা জেনারেল হাসপাতাল, সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ (মিডফোর্ড) হাসপাতালসহ ডেঙ্গু ডেডিকেটেড কেন্দ্রগুলোতে রোগীদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে।

কয়েকটি প্রধান হাসপাতালের মেঝেতেও শয্যা পেতে নতুন রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, ভর্তি হওয়া রোগীদের একটি বড় অংশই প্লাটিলেট কমে যাওয়া এবং প্রেসার কমে 'ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোম'-এ ভুগছেন। অনেক রোগী বিলম্বে হাসপাতালে আসায় তাদের আইসিইউ (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) সাপোর্টের প্রয়োজন হচ্ছে, যা চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল।

রোগীদের স্বজনেরা অভিযোগ করছেন, হাসাপাতালে এসে সিট না পেয়ে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটতে হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় ওষুধ ও স্যালাইনের যোগান দিতে গিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ।

ঢাকার বাইরেও ছড়িয়েছে ডেঙ্গু

শুধু রাজধানীতেই নয়, ডেঙ্গুর ভয়াল থাবা এখন ছড়িয়ে পড়েছে ঢাকার বাইরের জেলাগুলোতেও। চট্টগ্রাম, বরিশাল, খুলনা ও রাজশাহী বিভাগের হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন শয়ে শয়ে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হচ্ছেন। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে ডেঙ্গু চিকিৎসার পর্যাপ্ত প্রস্তুতি না থাকায় অনেক রোগীকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকায় স্থানান্তর করতে হচ্ছে, যা পথিমধ্যেই রোগীদের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

ঢাকার বাইরের বিভিন্ন সিটি কর্পোরেশন ও জেলা সদরে মশা নিধন কার্যক্রমে চরম শিথিলতার কারণে এডিস মশার বংশবৃদ্ধি অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়েছে বলে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ।

বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ ও করণীয়

স্বাস্থ্য ও কীটতত্ত্ব বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্ষা মৌসুম পরবর্তী সময়ে জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে এডিস মশার লার্ভা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঘরবাড়ি, বেলকনি, ছাদ ও নির্মাণাধীন ভবনে জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার না করলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।

বিশিষ্ট কীটতত্ত্ববিদদের মতে, “শুধু ওষুধ ছিটিয়ে এডিস মশা নিধন সম্ভব নয়। লার্ভা ধ্বংস করার জন্য উৎসভিত্তিক নিধন অভিযান জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে সচেতন হতে হবে।”

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে জনসাধারণকে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে:

জ্বর হলে কোনো অবস্থাতেই অবহেলা না করে দ্রুত ডেঙ্গু পরীক্ষা (NS1) করানো।

ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোনো ধরনের ব্যথানাশক ওষুধ (যেমন আইবুপ্রোফেন বা নাপ্রোক্সেন) না খাওয়া।

ডাবের পানি, ওআরএস স্যালাইন ও পর্যাপ্ত পরিমাণে তরল খাবার গ্রহণ করা।

ঘুমানোর সময় বাধ্যতামূলকভাবে মশারি ব্যবহার করা এবং ঘরে মশার বিস্তার রোধে জমা পানি নিয়মিত ফেলে দেওয়া।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত মশা নিধনে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম চালু করা না গেলে সামনে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার তীব্র ঝুঁকি রয়েছে।

এমএম