প্রচন্ড গরমে ঘেমে গিয়ে বেরিয়ে আসে শরীরের নানান খনিজ লবণ। যাতে দেহ হয়ে যায় পানি শূন্য। পিপাসায় বুক ফেটে যায়। পানি খেলে তো আমাদের শুধু পিপাসা মেটে। শরীর থেকে যে সব লবণ বের হওয়ার কারণে শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়ে সেই লবণ তো আর পূরণ হলো না।
এই সমস্যা দূর করার জন্য আমাদের খাদ্য তালিকায় থাকে নানান ধরনের ফলের শরবত, কোমল পানীয়, ডাবের পানি আরো কত কি! অনেকে এই গরমে কিছুটা আরাম পেতে প্রচুর পরিমাণে সফটড্রিকংস পান করেন। কিন্তু কোমল পানীয় নাম হলেও তা কিন্তু আসলেই কোমল না। শরীরের জন্য মারাত্তক ক্ষতিকর।
এই সব নানান কোমল পানীয় অর্থাৎ যাকে আমরা আদর করে ডাকি এনার্জি ড্রিকংস। এটা খেতে ভারি মজাদার। তবে অনেকেই জানি না যে এই সব এনার্জি ড্রিকংসগুলোতে আসলে কি থাকে।
মূলত কোমল পানিতে আছে ফসফরিক এসিড, ক্যাফেইন, সুগার, কার্বন ডাই অক্সাইড, অ্যালুমিনিয়াম ইত্যাদি। যা আমাদের দেহের ক্ষতি করার পাশাপাশি কোলেস্ট্রল মানে অতিরিক্ত মেদ বাড়িয়ে দেয়। সহজ কথায় আমাদের শরীরের ওজন বৃদ্ধি করে।
স্বাস্থ্যের কথা মাথায় থাকলে গলার পিপাসা আর শরীরকে সতেজ রাখতে ডাবের পানির কোন তুলনা নেই। ডাবের পানি শুধু পানীয় হিসেবেই সীমাবদ্ধ নয়, এটিতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে লবণ ও নানারকম রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। যা অনেক জটিল রোগ নিরামক হিসেবেও কাজ করে।
ডাবের পান আর কোমল পানীয়র মধ্যে পার্থক্য :
o ডাবের জলে সোডিয়াম রয়েছে ২৫ গ্রাম। এনার্জি ড্রিকংসে যার পরিমাণ ২০০ গ্রাম। বেশি সোডিয়াম শরীরের পক্ষে ক্ষতিকর।
o সুগারের দিক থেকেও ডাবের জল খুবই উপকারী। কেননা ডাবের জলে সুগার আছে মাত্র ৫ গ্রাম। কিন্তু কোমল পানীয়তে সুগারের মাত্রা ১০-২৫ । যা আমাদের জন্য ক্ষতিকর।
o ডাবের জলে প্রচুর পরিমানে পটাশিয়াম রয়েছে । যা আমাদের হার্টের জন্য অত্যন্ত উপকারী। কোমল পানীয়তে যা নেই।
o কোমল পানীয়তে ক্লোরাইড ৩৯ গ্রাম। ডাবের জলে এর পরিমাণ ১১৭ গ্রাম। যার ফলে ডাবের জল আমাদের শরীরের ইলেকট্রোলাইট ব্যালেন্স বজায় রাখতে সাহায্য করে।
এবার ডাবের পানির পুষ্টিগুণ সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক :
প্রতি ১০০ গ্রাম ডাবের পানিতে জলীয় অংশ ৯৫ গ্রাম, মোট খনিজ পদার্থ ০.৩ গ্রাম, আমিষ ২.৩ গ্রাম, শর্করা ২.৪ গ্রাম, চর্বি ০.১ গ্রাম, ক্যালসিয়াম ১৫ মিলিগ্রাম, ফসফরাস ০.০১ মিলিগ্রাম, আয়রন ০.১ মিলিগ্রাম, ভিটামিন বি ১-০.১১ মিলিগ্রাম, ভিটামিন বি২ ০.০২ মিলিগ্রাম, ভিটামিন সি ৫ মিলিগ্রাম ও খাদ্যশক্তি ২৩ কিলোক্যালরি।
ডাবের পানির উপকারিতা :
o ডাবের পানি আমাদের তৃঞ্চা মিটায়, কিছু কিছু ক্ষেত্রে রোগের প্রতিরোধক ও প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে। ডাবের পানি কিডনির পাথর সৃষ্টি রোধ করে। বিশেষ করে ডায়রিয়া, আলসার, গ্যাসটাটাইটিস বা অ্যাসিডিটি, Urinary Infection, Urolithiasis, Urinary tract Infection প্রতিরোধ করে।
o ডাবের পানিতে Antiseptic গুণাগুণ থাকাতে কাটা-ছেড়া জায়গায় ব্যবহার করলে ভালো ফল পাওয়া যায়। মুখের ক্ষত যেমন—ব্রণ, মেছতা ও পক্সের ক্ষত ডাবের পানি দিয়ে ধৌত করলে ভালো ফল পাওয়া যায়।
o ডাবের পানিতে ক্যালসিয়াম, পটাসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ভিটামিন সি, রিবোফ্লেভিন ও কার্বোহাইড্রেট আছে। ডাবের পানিতে বিশেষ করে স্যালাইন গুণাগুণ থাকে। তাই অধিক Sweating বা ঘাম থেকে শরীরের ডিহাইড্রেশন রক্ষার জন্য ডাবের পানি পান করা হয়।
o ডাবের পানি ৯৯ শতাংশ চর্বি বা কোলস্টেরলমুক্ত ও বিশুদ্ধ। নারকেলের ভেতরের শাঁসের চেয়ে পানি অনেক বেশি পুষ্টি ও স্বাস্থ্যকর। ডাবের পানিতে মৃদু জোলাপের (Purgative) গুণাগুণ বিদ্যমান থাকায় শরীরের কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয়। তাই নিয়মিত ডাবের পানি পান করলে মানুষের শরীর সুস্থসহ বিভিন্ন রোগ থেকে মুক্ত থাকা যায়।
o দেহে ক্যালসিয়াম ও পটাশিয়ামের অভাব হলে এবং বিভিন্ন অসুখ-বিসুখ হলে ডাক্তার ডাবের পানি পান করার পরামর্শ দেন ৷ ডায়রিয়া বা কলেরা রোগীদের ঘনঘন পাতলা পায়খানা ও বমি হলে দেহে প্রচুর পানি ও খনিজ পদার্থের ঘাটতি দেখা যায়। ডাবের পানি এই ঘাটতি অনেকাংশেই পূরণ করতে পারে।
o নিয়মিত ডাবের পানি পান করলে কোষ্ঠকাঠিন্য এবং কিডনি সংক্রান্ত রোগ প্রতিরোধ হয়। ডাবের পানিতে যথেষ্ট পরিমাণে আয়রনও রয়েছে। রক্ত তৈরি করার জন্য আয়রন হলো গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। সারা শরীরে সঠিকভাবে রক্ত তৈরি হলে প্রতিটি অঙ্গ হবে বেশি শক্তিশালী, ফলে কর্মশক্তিও বাড়বে। দেহে আয়রনের পরিমাণ ঠিক থাকলে ত্বক হবে উজ্জ্বল ও মসৃণ।
o ডাবের পানিতে খনিজ লবণ, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম ও ফসফরাসের উপস্থিতিও উচ্চমাত্রায়। এসব খনিজ লবণ দাঁতের ঔজ্জ্বল্য বাড়ায়। দাঁতের মাড়িকে করে মজবুত। অনেকের দাঁতের মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়ে। মাড়ি কালচে লাল হয়ে যায়। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ দেবে খনিজ লবণ।
o এই গরমে সবারই দেহের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক তাপমাত্রা বেড়ে যায়। এতে ত্বকে ফুটে ওঠে লালচে কালো ভাব। ডাবের পানি দেহের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা কমিয়ে শরীরকে রাখে ঠান্ডা। তারুণ্য ধরে রাখতে এর অবদান অপরিহার্য। এটি সৌন্দর্যচর্চার প্রাকৃতিক মাধ্যম ও চর্বিবিহীন পানীয়। ডাবের পানি মিষ্টি হওয়া সত্ত্বেও ডায়াবেটিসের রোগীদের জন্য উপকারী।
o মুখে জলবসন্তের দাগসহ বিভিন্ন ছোট ছোট দাগের জন্য সকাল বেলা ডাবের পানি দিলে দাগ মুছে এবং মুখের লাবণ্য ও উজ্জ্বলতা বাড়ে। গ্লুকোজ এবং স্যালাইন হিসেবেও ডাবের পানি ব্যবহৃত হয়। ডাবের পানিতে উল্লেখযোগ্য কোনো পুষ্টি না থাকলেও স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী।
সতর্কতা :
ডাব নিয়মিত খেলে কিডনি রোগ হয় না। আবার কিডনি রোগ হলে ডাবের পানি পান করা সম্পূর্ণ নিষেধ। কারণ কিডনি অকার্যকর হলে শরীরের অতিরিক্ত পটাশিয়াম দেহ থেকে বের হয় না। ফলে ডাবের পানির পটাশিয়াম ও দেহের পটাশিয়াম একত্রে কিডনি ও হৃদপিণ্ড দুটোই অকার্যকর করে। এ অবস্থায় রোগীর মুত্যু অনিবার্য। তাই যাদের দেহে প্রচুর পটাশিয়াম আছে এবং বের হয় না তাদের ডাবের পানি পান করা ঠিক না। ডাবের পানি রোগীকে পান করানোর আগে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
কেএইচ





