মায়েরদুধ শিশুর জীবনধারণ এবং পুষ্টি ও বৃদ্ধির জন্য একটি উৎকৃষ্ট সুষম খাদ্য।জন্মের পর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব (আধা ঘন্টার মধ্যেই শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়াতেহবে। পূর্ণ ৪ / ৬ মাস ১৮০ দিন) পর্যন্ত শিশুকে শুধু মাত্র (১ ফোঁটা পানিওনা) মায়ের দুধ খাওয়াতে হবে।
মায়ের বুকে দুধ আসে কিভাবে? :
শিশু পেটে আসার পর থেকেই মায়ের বুকে দুধ তৈরি হওয়া শুরু হয়৷ এর জন্য সাহায্য করে প্রোজেস্টেরন এবং প্রোলাকটিন নামের দুটি হরমোন৷ এই দুধ শিশুকে জন্মের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই পান করানো যায়৷ তবে শিশু কতটা দুধ পাবে তা নির্ভর করে প্রথম স্তন্যপানের ওপর৷ অর্থাৎ শরীরের প্রোলাকটিন হরমনই মায়ের নার্ভ সিস্টেমকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং সেভাবেই প্রয়োজনীয় দুগ্ধ উৎপাদন করে৷

শিশুদের জন্য সবচেয়ে ভালো :
মায়ের দুধ শিশুদের শরীরে ম্যাজিকের মতো কাজ করে৷ শিশুর জন্মের প্রথম সপ্তাহে মায়ের দুধ পান করলে তা বাচ্চাকে অন্ত্র সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে এবং হজম করতে ও দুধ পান করার সময় পেটে বাতাস জমা থেকে রেহাই পেতেও সহায়তা করে৷ মায়ের দুধ শিশুর প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং অ্যালার্জির বিরুদ্ধে কাজ করে৷ তাছাড়া মায়ের দুধ পান করার কারণে শিশুর মুখের তালু এবং মাড়ি শক্ত হয়৷
মায়ের দুধে কী আছে? :
মায়ের দুধে কী আছে তার হিসেব অনেক লম্বা৷ এতে রয়েছে মিনারেল, ভিটামিন, ফ্যাট, পানি ইত্যাদি৷ মায়ের দুধে বিশেষ এক রকম ফ্যাটি অ্যাসিড রয়েছে, যা শিশুর চোখের জ্যোতি বাড়াতেও সাহায্য করে থাকে৷
শালদুধ কি ? :
সদ্য প্রসূতির স্তন থেকে বের হওয়া প্রথম দুধ৷ হলদেটে রং-এর এই দুধ পরিমাণে কম হলেও এতে থাকে শ্বেতকণিকা এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা৷ শালদুধ শিশুর জন্য অত্যন্ত উপকারি, যা শিশুর জীবনের প্রথম টিকা হিসাবেও কাজ করে৷ শালদুধে থাকে আমিষ ও প্রচুর ভিটামিন-এ৷ শালদুধ শিশুর পেট পরিষ্কার করে এবং শিশুর জন্ডিস হবার সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়৷
মায়ের দুধই কি যথেষ্ট? :
নবজাতকের মা এক লিটারের মতো দুধ উৎপাদন করে থাকেন৷ শিশুরা সাধারণত প্রতিবার ২০০ থেকে ২২৫ মিলিগ্রাম দুধ পান করে৷ তবে একজন শিশুর যতটা দুধ প্রয়োজন শিশু চাইলে ঠিক ততটুকুই পায়৷
কত বয়স পর্যন্ত স্তন্যপান করা উচিত :
মায়ের দুধ শিশুদের আদর্শ পুষ্টিকর খাবার৷ তবে এ দুধ কতদিন শিশু পান করবে – সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে৷ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং জার্মানির জাতীয় মাতৃদুগ্ধ পান কমিশনের পরামর্শ: কমপক্ষে ছয়মাস মায়ের দুধ পান করানো উচিত৷ তবে চার মাসের পর থেকে নবজাতকদের মায়ের দুধের পাশাপাশি অন্য খাবারও দেয়া যেতে পারে৷

দেশ ভেদে রয়েছে পার্থক্য :
মায়ের দুধ খাওয়ানোর ব্যাপারে একেক দেশে একেক রীতি প্রচলিত৷ যেমন মধ্য আফিকার ‘বফি’-তে সাধারণত সাড়ে চার বছর পর্যন্ত মায়ের দুধ পান করানো হয় বাচ্চাদের৷ অবাক করার মতো হলেও অনেক মা ১৬,০০০ লিটার দুধ উৎপাদন করে থাকেন৷ তবে সারা বিশ্বে গড়ে মায়েরা ৩০ মাস পর্যন্ত মাতৃদুগ্ধ পান করিয়ে থাকেন৷
অন্য নারীর নয়, মায়ের দুধ চাই :
বহুদিন আগে কিন্তু শিশুদের অন্য নারীর বুকের দুধ পান করানো হতো৷ পরবর্তীতে ১৮ শতক থেকে একটি প্রচারাভিযান চালানো হয়, যেখানে বলা হয় যে, মা-রাই যেন শিশুকে নিজের বুকের দুধ পান করান৷
প্রকাশ্যে দুধ পান করানো :
মা তাঁর শিশুকে প্রকাশ্যে দুধ পান করাচ্ছেন – এটা কিছু দেশের মানুষের কাছে তেমন পছন্দ নয়৷ তাই সেসব দেশে মা শিশুকে দুধ খাওয়াচ্ছে এমন ছবি কেউ ফেসবুকে দিলে সেগুলো ফেসবুক থেকে মুছে ফেলা হয়৷তবে ডাক্তাররা পরামর্শ মতে সবার সামনে দুধ পান না করাই ভালো।
শুধু শিশু নয়, মায়েরও উপকার হয় :
যে মা তাঁর শিশুকে বুকের দুধ পান করান সেই মায়ের জরায়ু, স্তন ও ডিম্বাশয়ের ক্যানসারের ঝুঁকি কমে যায়৷ তাছাড়া দুধ খাওয়ানোর মধ্য দিয়ে সন্তান ও মায়ের মধ্যে তৈরি হয় এক নিবিড় সম্পর্ক৷
বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় মা যেসব ওষুধ খাবেন না:
কিছু বিশেষ ধরনের ওষুধ খেলে শিশুকে স্তন্যদান করানো অনুচিত। কেননা মা যে ওষুধ খাবেন, তার বেশির ভাগই বুকের দুধ মারফত শিশুর পেটে চলে যায়। যেমন ল্যাক্সেটিভ। পায়খানা না হলে এটি খাওয়ানো হয়। মা এ ওষুধ খেয়ে ব্রেস্টফিড করালে শিশুর ডায়রিয়া হওয়া বিচিত্র নয়।
এ ছাড়া কিছু অ্যান্টিবায়োটিক যেমনÑ টেট্রাসাইকিন, কোরামফেনিকল, কোট্রাইমক্সাজল খেলে শিশুকে বুকের দুধ দেয়া উচিত নয়।সামান্য কারণে পেইনকিলার ট্যাবলেট যেমন কোফেনাক, ডিসপ্রিন খাওয়া যেন অভ্যাসে দাঁড়িয়েছে। পেইনকিলার খেলেও মায়ের উচিত স্তন্যদান থেকে বিরত থাকা।
অনেক সময় শারীরিক বা মানসিক কারণে মা খান ঘুমের বড়ি। সে ক্ষেত্রে মা যদি বুকের দুধ খাওয়ান, সেই ঘুমের ওষুধ অনিবার্যভাবে প্রবেশ করবে শিশুর শরীরে। অ্যান্টি-কোয়াগুলেন্ট জাতীয় ওষুধ রক্তজমাট বন্ধ করে। মা এ ওষুধ খেলে তা বুকের দুধে মিশে শিশুর রক্তস্রোতে চলে যাবে। ফলে শিশুর কোনো কারণে রক্তক্ষরণ হলে তা বন্ধ করা কঠিন হবে। তাই এগুলো স্তন্যদানকারী মায়েদের যথাসম্ভব এড়িয়ে চলতে হবে।
এ ছাড়াও অ্যান্টিইপিলেস্টিক ড্রাগ, যেমন Ñ ফেনাইটয়েন কিংবা অ্যান্টিক্যান্সার জাতীয় কোনো ওষুধ যখন মা নেবেন বা খাবেন, তখন মা অবশ্যই শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াবেন না। পেনিসিলিন-জাতীয় ওষুধ নির্দ্বিধায় মা খেতে পারেন। এ ক্ষেত্রে প্যারাসিটামল খাওয়া নিরাপদ।
বুকের দুধ বৃদ্ধি করবেন যে ভাবে :
প্রতিদিনকম পক্ষে ১৮০০ ক্যালরি ক্ষমতা সম্পন্ন খাবার খাওয়াতে হবে । অবশ্যই আর ওভাল হবে যদি যে সব খাবারে উচ্চ ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার, দুধ ও ডিম জাতীয়খাবার, প্রচুর ভিটামিন যোক্ত ফল, এবং উন্নত মানের কিছু লতা পাতা জাতীয় শাঁকও তরকারী, লবণাক্ত মাছ বা সারটিন জাতীয় মাছ, বাদামী চাল, চর্বিহীন মাংস, এবং কচি মুরগের বাচ্চা ইত্যাদি নিজ সাধ্যমত খাওানোর চেষ্টা করা।
ইআর





