কোরবানির ঈদে অবশ্যই আপনি তৃপ্তি করে মাংস খাবেন। প্রতিদিন বেলায় বেলায় গরুর মাংসের ভুনা অথবা কাবাব লেগেই থাকে খাবারের রেসিপিতে। সঙ্গে খাসীর কাচ্চি, লেগ রোস্ট এসব তো আছেই। লাল মাংস শরীরের জন্য ক্ষতিকর এটা আমরা সবাই জানি। কিন্তু লাল মাংসের যে কিছু স্বাস্থ্য উপকারিতাও আছে তা কি আমরা জানি? আসুন জেনে নেয়া যাক লাল মাংস সম্পর্কে।

প্রোটিনের উৎস
মাত্র ৩ আউন্স গরু কিংবা খাসীর মাংস খেলে একজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের দৈনিক প্রোটিনের চাহিদার অর্ধেক পূরণ হয়ে যায়। লাল মাংসের থেকে যে প্রোটিন পাওয়া যায় তাতে মাংসপেশি গঠনের সব এমিনো এসিড আছে। শারীরিক ভাবে কর্মক্ষম থাকার জন্য সুগঠিত মাংসপেশি অত্যন্ত জরুরি। আর শারীরিক ভাবে কর্মক্ষম থাকলে শরীরে বিভিন্ন এনজাইম ও হরমোন উৎপাদিত হবে। ফলে শরীর সুস্থ্ ও সবল থাকবে।

আয়রনের উৎস
চার বছরের বেশি বয়সের শিশুদের এবং প্রাপ্ত বয়স্কদের প্রতিদিন ১৮ মিলিগ্রাম আয়রনের চাহিদা থাকে। লাল মাংসে প্রচুর পরিমাণে আয়রণ আছে। সপ্তাহে দুইবার গরুর মাংস খেলে রক্তের মাধ্যমে পুরো শরীরে অক্সিজেন সরবরাহের জন্য প্রয়োজনীয় আয়রনের চাহিদা পূরণ করে। আয়রনের অভাব থেকে দুর্বলতা, কিছু শিখতে সমস্যা হওয়া ও আরো নানান রকম সমস্যা হয়। মাত্র ৩ আউন্স লাল মাংসে ২.৪ মিলিগ্রাম আয়রন আছে।

জিঙ্কের উপস্থিতি
খাবার তালিকায় লাল মাংস থাকতে তা আপনার দেহের জিঙ্কের অভাব পূরণ করে। জিঙ্ক মানুষের মাংসপেশিকে সবল করে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়তা করে। বেশিরভাগ মানুষের শরীরের জন্যই প্রতিদিন ১৫ মিলিগ্রাম জিঙ্ক প্রয়োজন। প্রতি ৩ আউন্স লাল মাংসে ৫.৫ মিলিগ্রাম জিঙ্ক থাকে।

বি ভিটামিন
লাল মাংস বিভিন্ন রকম ভিটামিন বি এর একটি প্রাকৃতিক উৎস। সুস্থ শরীরের জন্য প্রাকৃতিক উৎসের ভিটামিন বি গ্রহণ করা জরুরী। লাল মাংসে আছে ভিটামিন বি-১২ যা নার্ভ সচল রাখে ও ভিটামিন বি-৬ যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। এছাড়াও লাল মাংসে নিয়াসিন আছে যা হজমে সহায়তা করে এবং রিবোফ্লাবিন যা চোখ ও ত্বক ভালো রাখে। সপ্তাহে একবার কিংবা দুই বার লাল মাংস খেতে পারেন। তবে লাল মাংস খেতে অবশ্যই সাবধানতা প্রয়োজন। যারা স্থূলতা, ডায়াবেটিস, রক্তচাপ বা হৃদরোগে ভুগছেন তাদের অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী লাল মাংস খাওয়া উচিত। মাংস রান্না না করে পুড়িয়ে কাবাব করার চেষ্টা করুন। কারণ এতে ক্ষতিকর চর্বি অনেকটাই ঝরে যায়। সাথে রাখুন প্রচুর সবজি। তাহলে লাল মাংস খেলে ক্ষতির বদলে উপকার পাবেন।

গরুর মাংস ও স্বাস্থ্য

গরুর মাংসে অনেক পুষ্টি থাকার পরেও অতিরিক্ত খেলে তা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হয়ে থাকে। গরুর মাংসের ক্যালরি ও পুষ্টি উপাদানের তারতম্য নির্ভর করে রান্নার পদ্ধতির ওপর। এ ছাড়া গরুর কোন অংশটি খাওয়া হবে তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে। অতিরিক্ত গরুর মাংস স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর—কারণ গরুর মাংসে থাকে কোলেস্টেরল, ফ্যাট ও সোডিয়াম। কোলেস্টেরল বেড়ে গেলে হৃদরোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই যাদের রক্তে কোলেস্টেরল বেশি, তাঁদের অতিরিক্ত গরুর মাংস খাওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত।

কীভাবে খাবেন ?

কচি গরুর মাংসের চর্বি ভালোভাবে পরিষ্কার করে, প্রয়োজনে একটু সেদ্ধ করে পানিটা ফেলে রান্না করলে স্বাস্থ্যের জন্য তেমন ক্ষতিকর হয় না। এ ছাড়া গরুর মাংসের কিমা বা ছোট করে কাটা মাংস ও স্টেক ইত্যাদি ভালো। তবে গরুর মাংস আপনার জন্য কতটুকু ক্ষতিকর তা নির্ভর করে আপনি কতটুকু খাচ্ছেন তার ওপর। সপ্তাহে একবার বা মাসে দুবার খাওয়া যেতে পারে। গরুর মাংস রান্নায় তেল কম ব্যবহার করবেন। ঘি বা মাখন গরুর মাংস রান্নায় ব্যবহার করা উচিত নয়। সবজি যেমন বাঁধাকপি, ক্যাপসিকাম, কচি কাঁঠাল বা অন্যান্য সবজি দিয়ে গরুর মাংস রান্না করে খেলে উপকার পাওয়া যায়।

যে কোনো খাবার অতিরিক্ত খেলেই তা স্বাস্থ্যের জন্য অবশ্যই ক্ষতিকর। তাই পরিমিতভাবে সঠিক পদ্ধতিতে গরুর মাংস খেলে নিজেকে অনেক ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করা যাবে। অার স্বাস্থ সচেতন মানুষ হিসেবে আরো কিছু কাজ তো করতেই হবে।

খাওয়ার পর:
গরুর মাংস খাওয়ার পর অবশ্যই ব্রাশ দিয়ে দাঁত মাজবেন। নইলে দাঁতের ফাঁকে আটকে থাকা মাংস পঁচে দুর্গন্ধ বের হতে পারে। এছাড়াও দাঁত ও মাড়ির সমস্যা দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা থাকে। মাংস খাওয়ার পর দাঁত ব্রাশ করলে এ সমস্যা কমে আসবে।

পরিপাক:
হজম শক্তি বাড়াতে খাবারে শাকসবজি ও আঁশজাতীয় খাবার প্রয়োজন। গরু, মহিষ, ছাগল, খাঁসির মাংসে ফাইবার বা আঁশের পরিমাণ অনেক কম। এতে পরিপাকে সমস্যা হতে পারে। যাদের খাবার হজমে সমস্যা তারা খাবারের সঙ্গে পর্যাপ্ত সালাদ ও সবজি রাখতে পারেন।

মনে রাখবেন কোমল পানিয় খাবার হজমে কোনো ভূমিকা রাখে না। এ জন্য খাবার তালিকায় আঁশযুক্ত খাবার রাখুন। আর অতিরিক্ত কোমল পানিয় পান করা থেকে বিরত থাকার চেষ্ট করুন।

আর সবশেষে একটি প্রশ্ন জাগতেই পারে অাপনার মনে। য়ে খাবারজনিত কারণে পেটে গুড়গুড় করলে কী করবেন?- এ সম্পর্কে ডা. কামরুল হাসান জানান, প্রথমেই খাবার তালিকায় আঁশজাতীয় খাবার যুক্ত করুন। ডাবের পানি ও স্যালাইন পর্যাপ্ত পানি পান করুন। বেশি সমস্যা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। এক্ষেেত্রে একদম অবহেলা নয়।

এএইচ