মাতৃগর্ভে মস্তিষ্কের স্নায়ু বিকাশজনিত প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির কারণে শিশু অটিজমে আক্রান্ত হয়। সানডিয়াগো’র অটিজম সেন্টার অব এক্সিলেন্স-এর একদল গবেষকের পরিচালিত গবেষণার বরাত দিয়ে ‘নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন’ সম্প্রতি এ তথ্য প্রকাশ করেছে।
গবেষকরা দাবি করেছেন, অল্প বয়সে মৃত্যুবরণ করেছে এমন অটিস্টিক শিশুদের মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষের নমুনা পরীক্ষা করে তাদের মস্তিষ্কে উল্লেখযোগ্য বৈপরীত্য লক্ষ করা গেছে। তাদের মস্তিষ্কের বংশগতি অবস্থা এবং মস্তিষ্কের আভ্যন্তরিণ গঠন ও সংযোগ উভয় ক্ষেত্রেই বৈপরীত্য লক্ষ্য করা যায়, যা অটিজম বিষয়ে বিজ্ঞানীদের বিদ্যমান ধারনাকে আরো জোরালো করেছে। প্রতিষ্ঠিত মতবাদ হচ্ছে, মাতৃগর্ভে মস্তিষ্কের স্নায়ুবিকাশ কোন কারণে বাধাপ্রাপ্ত হলে শিশু অটিজমে আক্রান্ত হয়।
সান ডিয়াগোর ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এরিক কোর্সহেনস গবেষণার ফলাফল বিশ্লেষণ করে বলেন ‘মস্তিষ্কের গভীরে স্নায়ু কোষের ক্ষতিগ্রস্ত অংশে এ পরিবর্তন লক্ষ্যণীয়’। তিনি বলেন, অটিজমে আক্রান্তদর মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষগুলো জটিল অবস্থায় বিদ্যমান। এমন নয় যে সেখানে অনেক ক্ষতিগস্ত স্নায়ুকোষ রয়েছে বরং বলা যায় যে, তাদের স্নায়ুকোষগুলোর গঠন পরিপক্ক নয়।
এরিকের মতে, ‘তাদের স্নায়ুকোষগুলো আছে, কিন্তু তা যে ধরনের পূর্ণতা লাভ করা দরকার তা হয় নি। স্নায়ুকোষ গঠনের শুরুতেই কোন কারণে তা ব্যাহত হয়েছে’। কোর্সহেনস বলেন, এ থেকে মনে হয় মাতৃগর্ভে শিশুর বৃদ্ধির দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপে এ পরিস্থিতির সৃষ্ঠি হতে পারে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোলজি বিভাগের কনসালটেন্ট ডা. মাজহারুল মান্নান এ প্রসঙ্গে বাসস’কে বলেন, নিউরোলজিস্টরা সন্দেহ করছিলেন যে মাতৃগর্ভে এমন কিছু ঘটে যার কারণে শিশু অটিজমে আক্রান্ত হয়। কিন্তু এতদিন আমাদের কাছে কোন প্রমাণ ছিলো না। এই গবেষণার ফলাফল আমাদের ধারনার সত্যতা প্রমাণ করেছে।
তিনি বলেন, এ গবেষণা থেকে আরো একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে যে, মায়ের মানসিক অস্থিরতা বা পারিবারিক সংকট অটিজমের জন্য দায়ী নয়। তবে পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণে অটিজমে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনাটা এখনও রয়েছে।
গবেষণায় বলা হয়, অটিজমে আক্রান্ত হওয়ার পেছনে বংশগতির অবস্থা বড় ভুমিকা রাখে। যদি দুই ভাইবোনের মধ্যে একজন অটিস্টিক হয় অন্যজনেরও অটিজমে আক্রান্ত হওয়ার আশংকা থাকে। এ সংক্রান্ত অন্য গবেষণার তথ্য অনুযায়ী গর্ভকালীন সময়ে মায়ের যে কোন ধরনের সংক্রামক ব্যাধি যেমন- ইনফ্লুয়েঞ্জার কারণেও এ অবস্থা তৈরি হতে পারে।
গবেষকদলের প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এরিক আরো বলেন, মাতৃগর্ভের আভ্যন্তরিন ও বাহ্যিক কারণেও এটি ঘটতে পারে। তবে এটি কোন না কোনভাবে মায়ের সাথে সম্পর্কিত।
নিউরোলজিস্ট ডা. মাজহারুল মান্নান বলেন, পর্যাপ্ত গবেষণা না থাকায় আমরা এখনও এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারি না। যেহেতু মাতৃগর্ভে থেকেই শিশু অটিজমে আক্রান্ত হয়ে থাকে তার জন্য প্রসূতি মায়ের শারীরিক সুস্থতা এবং সঠিক পুষ্টি নিশ্চিত করা জরুরী।
এ গবেষণা পরিচালনার জন্য কোর্সহেনস ও তার সহকর্মীরা ১১ জন অটিস্টিক শিশুর স্নায়ুকোষের নমুনা সংগ্রহ করেন। ২ থেকে ১৫ বছর বয়সী এসব শিশু দুর্ঘটনাজনিত, যেমন পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণ করে। গবেষকদল এই অবস্থা তুলনা করার জন্য আকস্মিক মৃত্যুর শিকার এমন ১১ জন স্বাভাবিক শিশুর স্নায়ুকোষের নমুনাও পরীক্ষা করেন।
অটিজমে আক্রান্ত ১১ জন শিশুর মধ্যে ১০ জনের মস্তিষ্কে তারা একই রকম বৈপরীত্য দেখতে পান। তারা মস্তিস্কের যে অংশ সামাজিক বিকাশ, যোগাযোগ ও ভাষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সে অংশের টিস্যুগুলোর মধ্যে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখতে পান।
কোর্সহেনস বলেন, এটি সবার ক্ষেত্রে একই রকম। একই সময়ে একই জায়গায় একই রকম ঘটে থাকে এবং এটি বিস্ময়কর।
শিশুর স্লায়ুবিকাশজনিত সমস্যার কারণে বিশ্বে প্রতিবছর অনেক শিশু অটিজম নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। তবে এ নিয়ে বিশ্বব্যাপি আন্দোলন শুরু হয় মাত্র ৭ বছর আগে। এরই ধারাবাহিকতায় আগামী ২ এপ্রিল সপ্তম বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস পালিত হতে যাচ্ছে। এ দিবসকে সামনে রেখেই সম্প্রতি এ গবেষণা ফলাফল প্রকাশ করা হয়। সূত্র: বিএসএস
[b]ঢাকা, ৩১ মার্চ (টাইমনিউজবিডি) //এমএ[/b]