দক্ষিণ চীন সাগরে বিতর্কিত ভূখন্ড আবারও নিজের দখলে নেয়ায় চীনের নিন্দা জানিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এটাকে আন্তর্জাতিক আইন বহির্ভূত কাজ বলেও চীনকে হুঁসিয়ার করে দিয়েছেন মার্কিন কর্তৃপক্ষ।

চীনের এই পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়ে অনতিবিলম্বে এই পথ থেকে দেশটিকে ফিরে আসার আহবান জানিয়েছেন মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব এ্যাশ কার্টার।

তবে, যুক্তরাষ্ট্রের এই হুঁসিয়ারিকে ভিত্তিহীন ও অগঠনমূলক বলে মন্তব্য করেছেন চীনের এক সেনা কর্মকর্তা। শনিবার (৩০মে ২০১৫) সিঙ্গাপুরে “এনুয়াল সাংরিলা ডায়ালগ”- শীর্ষক আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত এক বার্ষিক সম্মেলনে চীনা সেনাকর্মকর্তা এরুপ মন্তব্য করেন।  

এদিকে, সম্মেলনে মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব কার্টার বলেছেন, আমরা সব ধরনের দ্বন্দ্বের শান্তিপূর্ণ সমাধানে আগ্রহী। আর এক্ষেত্রে সবার আগে এবং তাৎক্ষণিকভাবে যা দরকার তা হলো সাগরের ওই বিতর্কিত জমিতে মালিকানা দাবিদার সব পক্ষকেই নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসতে হবে।

দক্ষিণ  চীন সাগরে কৃত্রিমভাবে তৈরি দুই দ্বীপে চীনের বিশাল সামরিক যান (artillery vehicles) পাঠানোর বিষয়ে সামরিক কর্মকর্তাদের তথ্য প্রকাশের পরই কার্টারের এই মন্তব্য আসলো।  

বিশেষ করে কয়েক সপ্তাহ আগে যুক্তরাষ্ট্র ও এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর পক্ষ থেকে আশংকা প্রকাশ করা বলা হয়- চীন ওই দুই কৃত্রিম দ্বীপকে সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে চায়।

এমনকি গত সপ্তাহে চরমভাবে বিতর্কিত স্পার্টলি দ্বীপ (Spratly Islands) এলাকা ত্যাগ করার জন্য চীনের সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে আকাশ মনিটরিংয়ে নিয়োজিত মার্কিন বিমানকে (US Navy P-8 Poseidon surveillance aircraft) নির্দেশ দেয়া হয়। তবে, চীনের দাবিকে উপেক্ষা করে মার্কিন বিমানের নজরদারি অব্যাহত রাখা হয়।

এমনই প্রেক্ষাপটে সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত শনিবারের সম্মেলনে কার্টার স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, আন্তর্জাতিক আইনে যতটা অনুমোদন রয়েছে ততটা আকাশে চলাচল বা সমুদ্রে বিচরণে যুক্তরাষ্ট্র কখনো পিছপা হবে না। সারা বিশ্বব্যাপীই যুক্তরাষ্ট্র এ কাজ করে আসছে বলেও সাফ জানিয়ে দেন তিনি।

তিনি অবশ্য বলেন, এই সাগরের অনেক স্থানেই অনেক দাবিদার রয়েছে। যেমন ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইন আটটি জায়গায়, মালয়েশিয়া পাঁচটি স্থানে এবং তাইওয়ান একটি অংশে নিজেদের মালিকানা দাবি করে আসছে।

কার্টারের ভাষায়, "Yet, one country has gone much farther and much faster than any other, and that's China” অর্থাৎ- “তবে, একটি দেশ অন্য যে কোন দেশের তুলনায় বড় বেশি বাড়াবাড়ি করছে, বড় তাড়াহুড়ো করছে। আর সেই দেশটিই হলো চীন।”

মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব কার্টার আরও অভিযোগ করেন, চীন সাগরে দাবিদার সব দেশ মিলে যতটা দাবি না করছে, চীন একাই তার চেয়ে বেশি দাবি করছে, যা এই অঞ্চলের ইতিহাসে আর কখনই ঘটেনি। শুধুমাত্র গত একমাসেই চীন এমন বাড়াবাড়ি করেছে।

ক্ষোভের সাথে কার্টার আরও বলেন, চীন আর কতটা বাড়বে তা এখনও পরিস্কার নয়। আর এ কারণেই শুধুমাত্র এই পানি নিয়ে টানা-হেচড়াকে কেন্দ্র করে অত্র অঞ্চলে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর এটাই বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যমে শিরোনাম হয়ে আসছে দিনের পর দিন।

উল্লেখ্য, দক্ষিণ চীন সাগরের প্রায় সবটাই চীন নিজের বলে দাবি করে আসছে। ১৯৪০ সালে প্রকাশিত চীনের ম্যাপের ওপর ভিত্তি করে অঙ্কিত লাইন ধরেই এমনটা দাবি করছে চীন। আর এটা করতে গিয়েই ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন এবং মালয়েশিয়াসহ দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার প্রতিবেশীদের সাথে ক্রমেই বিরোধে জড়িয়ে পড়ছে দেশটি।

এই বিরোধকে উস্কে দিয়েই চীনকে কাবু করতে কুটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বর্তমান বিশ্বের সুপার পাওয়ার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ভবিষ্যত বিশ্বের এক নম্বর সুপার পাওয়ারের দৌড়ে যে কোনভাবেই চীনকে হারিয়ে দেয়াই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মার্কিনিদের সামনে। এই ইস্যুই এখন প্রতি মুহুর্তে ভাবিয়ে তুলছে দেশটির কর্তা ব্যক্তিদের।

তবে, সুপার পাওয়ারের এই লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত চীনেরই যে বিজয় হবে সে ব্যাপারে নানা হিসেব-নিকেশ এরই মধ্যে কষেছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। কিন্তু এই লড়াইয়ে কি সহজেই কেউ হার মানতে চায়? তাই সম্ভাব্য সব উপায়েই নিজের অবস্থান ধরে রাখতে মরিয়া যুক্তরাষ্ট্র। আর হয়তো বা বেশিদিন নয়, অদূর ভবিষ্যতেই বিশ্ববাসী দেখতে পাবেন এই খেলার শেষ পরিণতি।

(সহায়ক সূত্র: আলজাজিরা)