রোহিঙ্গা মুসলমানদের সন্ত্রাসী হিসেবে আখ্যায়িত করে পরিকল্পিতভাবে তাদের ওপর নির্বিচারে গণহত্যা ও জাতিগত নিধনযজ্ঞ চালায় মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী –আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এমন সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে বহুদিন ধরে। আর এরই পটভূমিতে অবশেষে দায়ী সেনা ও পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণা দিলেন মিয়ানমার সরকারের মুখপাত্র জও হটে (Zaw Htay)।
রোববার (১১ ফেব্রুয়ারি) মিয়ানমার সরকারের ওই মুখপাত্র বলেন, নিরাপত্তা বাহিনীর ১০ সদস্যের বিরুদ্ধে এই ব্যবস্থা নেয়া হবে যারা রাখাইন প্রদেশে আটককৃত রোহিঙ্গা মুসলমানদের হত্যা করেছিল। তবে, এই ব্যবস্থার সাথে সম্প্রতি প্রকাশিত রয়টার্সের প্রতিবেদনের কোনো সম্পর্ক নেই বলেও দাবি করেন তিনি।
বৃটেনভিত্তিক আন্তর্জাতিক প্রভাবশালী সংবাদ সংস্থা রয়টার্স গত শুক্রবার (৯ ফেব্রুয়ারি) এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে যেখানে উত্তর রাখাইনের ইন দিন (Inn Din) গ্রামের ১০ রোহিঙ্গা মুসলমানকে আটকের পর যেভাবে হত্যা করা হয়েছিল তার বিবরণ রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই ১০ রোহিঙ্গাকে তাদের বৌদ্ধ প্রতিবেশী ও মিয়ানমার সেনারা আটকের পর গুলি করে হত্যা করে এবং একটি গণকবরে লাশ মাটিচাপা দেয়া হয়।
মিয়ানমার সরকারের মুখপাত্র জও হটে বলেন, ওই ঘটনায় ৭ সেনা সদস্য, ৩ পুলিশ সদস্য ও ৬ জন গ্রামবাসীর বিরুদ্ধে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।
তিনি দাবি করেন, সেনাবাহিনী কর্তৃক পরিচালিক এক তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকেই এই ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে এবং রয়টার্সের প্রকাশিত প্রতিবেদনের অনেক আগেই এই তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে।
সেনা-পুলিশসহ এই ১৬ অভিযুক্তকে রয়টার্সের প্রতিবেদন প্রকাশের আগেই গ্রেফতার করা হয়েছে দাবি করে ওই মুখপাত্র আরো বলেন, তাদের বিরুদ্ধে কী ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে তা তিনি বলতে পারছেন না।
অবশ্য গত ১০ জানুয়ারি মিয়ানমার সেনাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল যে ২০০ জনের সমন্বয়ে গঠিত একটি ‘সন্ত্রাসী’ গোষ্ঠীর সদস্য ১০ রোহিঙ্গা নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর আক্রমন করেছিল। ওই অঞ্চলের বৌদ্ধরা এদের ওপর রামদা দিয়ে পাল্টা হামলা চালিয়েছিল। তবে, মিয়ানমার সেনারা গুলি করে এদেরকে হত্যা করেছিল।
তবে, রাখাইনে ওই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী অপরাপর বৌদ্ধ ও রোহিঙ্গা মুসলমানরা বার্তা সংস্থা রয়টার্সের কাছে ঘটনার যে বিবরণ দিয়েছেন তা মিয়ানমার সেনাদের দেয়া বর্ণনার সম্পূর্ণ বিপরীত।
এমনকি বৌদ্ধ গ্রামবাসীদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী ইন দিন গ্রামে নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর বিপুল সংখ্যক সন্ত্রাসীদের হামলার কোনো ঘটনাই ঘটেনি। আর রোহিঙ্গা মুসলমানদের দেয়া বর্ণনা অনুযায়ী, ওই গ্রামের নিকটেই একটি নদীর চরে আশ্রয় নেয়া শত শত রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও শিশুদের মধ্য থেকে হত্যার শিকার হওয়া ওই ১০ রোহিঙ্গা মুসলমানকে তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন মিয়ানমার সেনারা ।
উল্লেখ্য, গত বছরের (২০১৭) ২৫ আগস্ট থেকে মিয়ানমারের রাখাইনে এক নারকীয় হত্যাযজ্ঞ ও নির্যাতনে মেতে উঠে চরমপন্থী মিয়ানমার সেনা ও বৌদ্ধরা। নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি- আরসা’র (Arakan Rohingya Salvation Army- ARSA) কথিত হামলার অজুহাতে ওই হত্যাযজ্ঞ ও জাতিগত নিধনযজ্ঞ শুরু করা হয়।
জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে ইতোমধ্যেই গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃত মিয়ানমার সেনা ও চরমপন্থী বৌদ্ধদের সেই নারকীয় অত্যাচারের মুখে এ যাবত রাখাইন প্রদেশ থেকে অন্তত ৬ লাখ ৯০ হাজার রোহিঙ্গা মুসলমান পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় টেকনাফ ও কক্সবাজারে আশ্রয় নিয়েছেন।
সাংবাদিক আটক
উল্লেখ্য, ইন দিন গ্রামের হত্যাযজ্ঞ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করায় রয়টার্সের দুই সাংবাদিককে গ্রেফতার করে মিয়ানমার সরকার। ওই দুই সাংবাদিক হলেন, মিয়ানমারের নাগরিক ওয়া লন (Wa Lone) এবং কায়া সু ও (Kyaw Soe Oo)। গত বছরের ১২ ডিসেম্বর তাদেরকে আটক করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় গোপণ তথ্য ফাঁসের অভিযোগ আনা হয়।
অবশ্য মিয়ানমার পুলিশের পক্ষ থেকে আরো বলা হয়, ওই ঘটনায় দুই পুলিশ কর্মকর্তাকেও গ্রেফতার করা হয়।
মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় প্রসিকিউটরদের পক্ষ থেকে দেশটির অফিসিয়াল নিরাপত্তা আইন (Myanmar's Official Secrets Act) – এর অধীনে রয়টার্সের ওই দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে বিচারের আবেদন জানানো হয়েছে। মিয়ানমারে বৃটিশ উপনিবেশবাদ আমলে প্রণীত ওই আইনের বিধান অনুযায়ী অভিযোগ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ ১৪ বছর কারাভোগের বিধান রয়েছে।
এদিকে, রয়টার্সের সবশেষ প্রতিদেবন প্রকাশের আগের দিন বৃহস্পতিবার (৮ ফেব্রুয়ারি) মিয়ানমারের সরকারী মুখপাত জও হটেকে ইন দিন গ্রামের হত্যাযজ্ঞ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি গণমাধ্যমকে বলেছিলেন যে সেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি তারা অস্বীকার করছেন না।
তিনি বলেন, সেখানে প্রাথমিক তথ্য উপাত্তে যদি মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি শক্ত ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে প্রতীয়মান হয়, তাহলে সরকার তা তদন্ত করে দেখবে।
তবে, শুক্রবার রয়টার্সের সবশেষ ব্যাপকভাবে আলোচিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর মিয়ানমার সরকারের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এখনো পাওয়া যায়নি।
বৃটেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রীর আশ্বাস
এদিকে, বাংলাদেশ সফররত বৃটেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রী বরিস জনসন (Boris Johnson) শনিবার কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনকালে সাংবাদিকদের বলেন, মিয়ানমারের কার্যত নেত্রী (de facto leader) অং সান সুকি’র নিকট তিনি দুই সাংবাদিকের বিষয়টি উত্থাপন করবেন।
তিনি আরো বলেন, রাখাইনে সহিংসতায় জাতিগত নিধনযজ্ঞের (ethnic cleansing) বিষয়টি জোরালোভাবে উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার সদস্যদের ওই অঞ্চল পরিদর্শনের সুযোগ দেয়া দরকার যাতে বিষয়টি ভালোভাবে খতিয়ে দেখা যায়।
উল্লেখ্য, মিয়ানমার এখনো পর্যন্ত কোনো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও সাহায্য সংস্থাকে রাখাইন প্রদেশে প্রবেশ করতে দিচ্ছে না। স্যাটেলাইটে প্রাপ্ত ছবি, প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা ও বিভিন্নভাবে গণমাধ্যমে আসা মোবাইল ও ড্রোনের মাধ্যমে তোলা ভিডিও ফুটেজে সেখানে গণহত্যা, ধর্ষণ ও জাতিগত নিধনযজ্ঞের ভয়াবহ চিত্র পাওয়া গেছে।
এ নিয়ে বিশ্বব্যাপী নিন্দার ঝড় ওঠে। কিন্তু বিশ্ব মোড়লের ভূমিকায় থাকা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘসহ হর্তাকর্তারা রহস্যজনক কারণে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারছে না। শুধু নিন্দা ও লোক দেখানো কিছু হুমকি-ধামকির মধ্যেই তাদের সব পদক্ষেপ যেন আটকে রয়েছে। পার্শ্ববর্তী দুই বৃহৎ শক্তি ভারত এবং চীনও ন্যাক্কারজনকভাবে মিয়ানমারের খুনী সেনা ও বৌদ্ধদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। অনেকেই আক্ষেপ করে বলছেন, কোনো ইহুদি, খ্রিস্টান, হিন্দু বা বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ওপর এমন অমানবিক আচরণ করা হলে বিশ্ব মোড়লদের ভূমিকা কি এমন হতো? তাহলে কি রোহিঙ্গারা মুসলমান- এটাই তাদের বড় অপরাধ?
(সূত্র: রয়টার্স, টিআরটি ওয়ার্ল্ড, আলজাজিরা, বিবিসি)





