রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার মধ্যরাত থেকে সিরিয়ার সর্বত্র যুদ্ধবিরতি কার্যকর হতে যাচ্ছে। আর এই শান্তি প্রক্রিয়ায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করবে রাশিয়া ও তুরস্ক।
আজ (বৃহস্পতিবার) এক ভাষণে পুতিন বলেন, সিরিয়াজুড়ে যুদ্ধবিরতিতে একটি চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। আর রাশিয়া ও তুরস্ক এক্ষেত্রে মধ্যস্থতাকারী (Guarantors) হিসেবে ভূমিকা রাখবে।
স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার মধ্যরাত বা গ্রিনিচমান সময় রাত ১০টা থেকে এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হতে যাচ্ছে জানিয়ে পুতিন বলেন, এই সময়ে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ ও যুদ্ধরত বিরোধী শক্তিগুলোর মধ্যে শান্তি আলোচনা চলবে। কাজাখস্তানের রাজধানী আস্তানায় (Astana) এই শান্তি আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে।
পুতিন অবশ্য এই যুদ্ধবিরতি ও শান্তি প্রক্রিয়ার কার্যকরিতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে বলেন, শান্তি আলোচনা ও যুদ্ধবিরতির ব্যাপারে যে চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে তা নি:সন্দেহে তা খুবই নড়বড়ে। এজন্য নিয়মিত ফলোআপ জরুরী এবং সব পক্ষের অগ্রগতির বিষয়ে নজর রাখতে হবে।
তবে, যতটুকুই অগ্রগতি হয়েছে চলমান পরিস্থিতিতে তাকে তাৎপর্যপূর্ণ আখ্যা দিয়ে পুতিন বলেন, এটা অর্জনে তার সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রনালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয় অত্র অঞ্চলে রাশিয়ার বন্ধুত্বপূর্ণ অংশীদারদের সাথে একযোগে কাজ করেছে।
পুতিন বলেন: “এখন আমাদের দরকার এই চুক্তি কার্যকরে সম্ভাব্য সবকিছু করা। সমঝোতা প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত সব পক্ষই যাতে আস্তানায় আসে এবং সত্যিকারের শান্তি প্রক্রিয়া শুরুতে ভূমিকা রাখে তা নিশ্চিত করতে হবে। আমি সিরিয়ার সরকার ও বিরোধী সশস্ত্র গ্রুপগুলোর সাথে কথা বলেছি। একই সাথে এই চুক্তিতে আরো যেসব দেশের সম্পৃক্ততা রয়েছে তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছি।”

এদিকে, পুতিন যখন সবাইকে নিয়ে শান্তি প্রক্রিয়ার কথা জানালেন তার খানিক পূ্র্বেই অবশ্য সিরিয়ার সংবাদ মাধ্যম সানায় (SANA) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গৃহিত শান্তি চুক্তি থেকে বাদ দেয়া হয়েছে সিরিয়ায় সক্রিয় দুটি শক্তিশালী সশস্ত্র গ্রুপকে। এরা হলো আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএসআইএল (Islamic State of Iraq and the Levant -ISIL) এবং জাভাত ফাতেহ আল শাম (Jabhat Fateh al-Sham) যা পূর্বে আল-নুসরা ফ্রন্ট (Al-Nusra Front) নামে পরিচিত ছিল।
তবে, নতুন করে বৃহস্পতিবার মধ্যরাত থেকে যেই যুদ্ধবিরতি শুরু হতে যাচ্ছে এবং আস্তানায় যে শান্তি আলোচনার কথা বলা হচ্ছে সেখান থেকেও আইএসআইএল ও আল শামকে বাদ দেয়া হয়েছে কিনা সে বিষয়টি অবশ্য এখনো পরিস্কার করেননি প্রেসিডেন্ট পুতিন। তাই এই পুরো শান্তি প্রক্রিয়া নিয়ে ধোয়াশা থেকেই যাচ্ছে।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রী সারজেই শইগু (Sergei Shoigu) অবশ্য বলেন, সিরিয়াজুড়ে থাকা ৬২ হাজার বিরোধী যোদ্ধাকে এই যুদ্ধবিরতির আওতায় আনা হচ্ছে। আর এই পুরো প্রক্রিয়াটি রাশিয়ার সেনাবাহিনী তুরস্কের সেনাদের সাথে মনিটর করছে।
এদিকে, তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের পক্ষ থেকেও চুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। একইসাথে শান্তি প্রক্রিয়াকে স্থায়ীরুপ দিতে সিরিয়ায় যুদ্ধরত বিভিন্ন গ্রুপের ওপর প্রভাব রয়েছে এমন সব দেশের সহযোগিতা কামনা করা হয়েছে তুরস্কের পক্ষ থেকে।
তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয় দাবি করছে, এই যুদ্ধবিরতিকে দৃঢ়ভাবে রাশিয়া ও তার দেশ সমর্থন করছে। তারা একত্রে এই বিষয়টির ওপর নজরদারি রাখবে।
এদিকে, রাশিয়ার রাজধানী মস্কো থেকে আলজাজিরার প্রতিনিধি নাতাসা গোনেইম (Natasha Ghoneim) জানান, তিনটি বিষয়ে অগ্রগতি সাধনে কাজ করতে এক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে তিন দেশ। এরা হলো রাশিয়া, তুরস্ক ও ইরান।
যেই তিন ধাপে কাজ করার জন্য চুক্তি করা হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে- প্রথম ধাপে, বিবদমান সিরিয়ার সরকার ও বিরোধী গ্রুপগুলোর মধ্যে সমঝোতা চুক্তি করানো; দ্বিতীয় ধাপে, কিভাবে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা যায় তার নকশা প্রণয়ন এবং সবশেষ তৃতীয় ধাপে, শান্তি আলোচনার পর দেশটিতে উদ্ভুত পরিস্থিতিতে কী দরকার হতে পারে যাতে এই প্রক্রিয়া ভবিষ্যতে আবার নস্যাত হয়ে না যায় তা ঠিক করা।
আলজাজিরার প্রতিনিধি অবশ্য আরো জানান, চুক্তির বিষয়টি এখনো অনেকটাই অপরিস্কার এবং বিরোধী কোন কোন পক্ষ সমঝোতা প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভূক্ত হতে যাচ্ছে সেটিও অদ্যবদী স্পষ্ট নয়।
আলজাজিরার ওই প্রতিনিধি জানান, পুতিনের শান্তি আলোচনা ও যুদ্ধবিরতির এই ঘোষণার মাত্র একদিন আগেও মুক্ত সিরিয় সেনা (Free Syrian Army) এর ব্যানারে সিরিয়ার সবচেয়ে বড় যেই বিদ্রোহী গ্রুপটি যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা কোন শান্তি আলোচনায় যোগ দেয়ার দাওয়াত পাননি এবং তাদের সাথে কেউ যোগাযোগ করেনি।
এদিকে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আরো বলেন, সিরিয়ায় রাশিয়ান সেনাদের উপস্থিতি কমিয়ে আনার ব্যাপারে তিনি নির্দেশ দিয়েছেন, যদিও বর্তমানে সিরিয়ায় আসাদ সরকারকে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে রাশিয়ার সেনারাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
অবশ্য কী পরিমান সেনা নিজ দেশে ফেরত নেয়া হবে বা অস্ত্রের মজুদ কতটা কমানো হবে সে ব্যাপারে কিছু জানাননি পুতিন। একইসঙ্গে সিরিয়ায় আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যখনই দরকার হবে রাশিয়া জল, স্থল ও আকাশপথে তার সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখবে বলেও জানান পুতিন।
উল্লেখ্য, ২০১১ সালের মার্চে প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের বিরুদ্ধে সিরিয়ায় বিদ্রোহ শুরু হয়। প্রথমে গণবিদ্রোহের আকারে আন্দোলন শুরু হলেও শিগগিরই তা সশস্ত্র বিদ্রোহের রুপ ধারণ করে।
চলতি বছরের এপ্রিলে সিরিয়ায় নিযুক্ত জাতিসংঘের বিশেষ দূত স্টাফেন ডি মিস্তুরা (Staffan de Mistura) এক প্রতিবেদন জমা দেন। সেখানে তিনি বলেন, ২০১১ সালের মার্চ মাস থেকে এ পর্যন্ত সিরিয়ায় ৪ লাখ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে।
তবে, হতাহতের প্রকৃত চিত্র সঠিকভাবে নিরুপন করা অত্যন্ত দূরুহ বলেও উল্লেখ করেন মিস্তুরা। তিনি বলেন, বহু লোককে অপহরণ করা হয়েছে এবং অনেকেই নিখোঁজ রয়েছেন যাদের ভাগ্যে শেষমেষ কি জুটেছে বা তারা এখন কোন অবস্থায় আছেন তার কোন খবর পাওয়া যায়নি।
এছাড়া, জাতিসংঘ থেকে শুরু করে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠনের হিসাব মতে, সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরুর পর এ পর্যন্ত প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ মানুষ গৃহহারা হয়েছেন যা দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক।
কামরুজ্জামান বাবলু





