আগামী সপ্তাহে দুই দিনের সফরে মিয়ানমার যাবেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদী। আসন্ন সেই সফরে অং সান সুকি সরকারের সাথে রোহিঙ্গা ইস্যুতে তার আলোচনার কথা রয়েছে। শুক্রবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের পক্ষ থেকে এমন তথ্য জানানো হয়।

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপির বরাত দিয়ে পাকিস্তানের প্রভাবশালী ইংরেজি দৈনিক দি ডন (Dawn) এর প্রতিবেদনে বলা হয়, মোদি দুই দিনের সফরে এমনই এক সময় মিয়ানমারে যাচ্ছেন যখন দেশটির রাখাইন প্রদেশে নতুন করে শুরু হওয়া সহিংসতায় হাজার হাজার রোহিঙ্গা মুসলমান গৃহহারা হচ্ছেন। তাদের অনেকেই দেশ ছেড়ে পালাচ্ছেন এবং উদ্বাস্তু হিসাবে প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশের দিকে ছুটে আসছেন। অনেকেই আবার নৌকাযোগে সীমান্ত পাড়ি দিতে গিয়ে নদীতে ডুবে মারা যাচ্ছেন।

রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিবিহীন এই সংখ্যালঘু ধর্মীয় গোষ্ঠী রোহিঙ্গা মুসলমানদেরকে মিয়ানমার সরকার তার দেশের অবৈধ বাসিন্দা হিসেবে আখ্যায়িত করে আসছে, যদিও রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গা মুসলমানদের বসতি শত শত বছরের পুরোনো। এমনকি এক সময় স্বাধীন আরাকান রাজ্যে মুসলমানদের শাসন কায়েম ছিল এবং সেখানে সব ধর্মের মানুষ সুখে শান্তিতে বসবাস করতেন। আর এই রাখাইন প্রদেশ ছিল আরাকান রাজ্যেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এমনকি মধ্যযুগের সমগ্র বাঙ্গালি কবিদের অন্যতম শীরোমনি মহাকবী আলাওল ছিলেন এই আরাকান রাজ্যের রাজসভার কবি।

মিয়ানমার সরকারের সেনা ও সন্ত্রাসী বৌদ্ধদের অব্যাহত হত্যাযজ্ঞ ও নৃশংতার ফলে হাজার হাজার রোহিঙ্গা মুসলমান নিজ মাতৃভূমি থেকে পালিয়ে বাংলাদেশের দিকে আসছেন। বাংলাদেশের পাশাপাশি কিছু রোহিঙ্গা পার্শ্ববর্তী ভারতের দিকেও ছুটে পালাচ্ছেন।

রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো বর্বরোচিত গণহত্যার ব্যাপারে কোন প্রতিক্রিয়া না দেখালেও চলতি মাসে এক ঘোষণায় ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয় শিগগিরই সে দেশে এ যাবত আশ্রয় নেয়া ৪০ হাজার রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠানো হবে।

এদিকে, আসন্ন মিয়ানমার সফর প্রসঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয় সূত্রে আরো জানা যায়, আগামী মঙ্গলবার (৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭) চীন সফর শেষে দেশে ফেরার পথে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মিয়ানমারের রাজধানী নাইপেডুতে (Naypyidaw) এসে পৌঁছবেন। মোদি ব্রিকস সম্মেলনে (Brics summit) যোগ দিতে চীন সফর করেছিলেন যেখানে রাশিয়া, ব্রাজিল এবং দক্ষিণ আফ্রিকাও অংশ নিয়েছিল।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের সিনিয়র কর্মকর্তা শ্রীপ্রিয়া রাগানাথান (Sripriya Ranganathan) সাংবাদিকদের জানান, দেশটিতে উদ্ভুত পরিস্থিতি মোকাবেলায় ভারত কিভাবে সহায়তা করতে পারে সে ব্যাপারে সফরে মিয়ানমার সরকারের সাথে আলোচনা করা হবে।

তিনি আরো বলেন, ঘটনাচক্রে মিয়ানমার পরিস্থিতিতে অনেক দেশই সম্পৃক্ত হয়ে পড়ছে। তবে শেষ পর্যন্ত মিয়ানমারকেই তার নিজ দেশের সমস্যা মোকাবেলা করতে হবে।

এদিকে, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (Human Rights Watch) এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ (Amnesty International) আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে নয়াদিল্লীকে রোহিঙ্গাদের জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে। এশিয়ার অন্যতম বৃহত দেশ ভারতকে তার আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতার বিষয়টিও স্মরণ করিয়ে দেয়া হয় মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে।

অবশ্য রাগানাথান মনে করেন, অবৈধ অভিবাসীদের ব্যাপারে ভারতীয় আইনের ভিত্তিতে দেশটি দীর্ঘদিন ধরে যে নীতিমালা মেনে আসছে সেই অবস্থান থেকে তার দেশ কিছুতেই সরে আসবে না।

উল্লেখ্য, ভারত এমনই এক দেশ যেখানে বর্তমানে লাখ লাখ উদ্বাস্তু দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করে আসছেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও দেশটি ১৯৫১ সালের উদ্বাস্তু সংক্রান্ত কনভেনশন (1951 Refugee Convention) কিংবা ১৯৬৭ সালের উদ্বাস্তুদের মর্যাদা সংক্রান্ত প্রোটোকলে (1967 Protocol Relating to the Status of Refugees) স্বাক্ষর করেনি।

এদিকে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে প্রায় ৪০০ শতাধিক রোহিঙ্গা হত্যার মতো মানবিক বিপর্যয়কর ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেজ (Antonio Guterres) সেই অবস্থান থেকে সরে আসার জন্য মিয়ানমার সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

এর আগে, গত ২৯শে আগস্ট (২০১৭) আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আলজাজিরায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর দেশটির সেনাবাহিনী ও উগ্র বৌদ্ধদের নারকীয় তাণ্ডবের নতুন তথ্য প্রকাশ করা হয় যা স্যাটেলাইটে পাওয়া যায়।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, রাখাইন প্রদেশের অন্তত ১০টি অঞ্চলে সেনাবাহিনী অভিযানের নামে মুসলিম বসতিতে ব্যাপক জ্বালাও পোড়াও চালিয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন “হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (Human Rights Watch -HRW)” এর কর্মীদের পক্ষ থেকে আরো অভিযোগ করা হয়, নিরস্ত্র রোহিঙ্গা পুরুষ, নারী ও শিশুদের ওপর মিয়ানমার সেনারা নির্বিচারে গুলিবর্ষণ ও আগুন হামলা চালাচ্ছে। তারা রোহিঙ্গা নারীদের ধর্ষণ করেছে এবং পুরুষদের নির্মভাবে হত্যা করছে।

এদিকে, রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর চালানো গণহত্যা ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে হুঁসিয়ারি উচ্চারণ করেছে ইরান ও তুরস্ক। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোগান এ ব্যাপারে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদকে টেলিফোন করেছেন। অপরদিকে, তুরস্কের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৃহস্পতিবার (৩১ আগস্ট ২০১৭) এক টেলিফোন আলাপে ইরানের প্রেসিডেন্ট ড. হাসান রুহানি রোহিঙ্গা ইস্যুতে হতাশা ও উদ্বেগের কথা তুলে ধরে বলেন, বিশ্বের যেকোনো জায়গায় মুসলমানদের বিরুদ্ধে নির্যাতন হোক না কেন ইরান তা সহ্য করবে না।

আর এমনই প্রেক্ষাপটে রোহিঙ্গা ইস্যুতে মোদির আলোচনা কতটা ফলপ্রসূ হবে তা নিয়ে দেখা দিয়েছে সংশয়। বিশেষ করে ভারতের মূল লক্ষ্য হলো তার দেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের ফেরত দেয়া। সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর চালানো বর্বরোচিত গণহত্যা বন্ধ ও রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব প্রদান মাধ্যমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার যে পরামর্শ জাতিসংঘসহ বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে দেয়া হয়েছে সে ব্যাপারে ভারতের পক্ষ থেকে মিয়ানমারের ওপর কোন চাপ সৃষ্টি করা না হলে মোদির আলোচনা সমস্যা সমাধানে তেমন কোন ভূমিকা রাখবে না বলেই অভিমত বিশেষজ্ঞদের।

(সূত্র: ডন, আলজাজিরা ও অন্যান্য সংস্থা)