ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর ট্রাম্পের সাথে একই কাতারে আলোচনায় বরিস জনসন। বিশেষ করে বরিস জনসন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরে ইউরোপ জুড়ে মুসলিম সমাজ ও বর্ণবাদ বিষয়ে দেখা দিয়েছে আশঙ্কা ও হতাশা।

কারণ ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতোই একজন বর্ণবাদ ও ইসলাম বিদ্বেষী হিসেবে পরিচিত বরিস জনসন। আর এই জন্য যুক্তরাজ্যের মতো দেশে তার প্রধানমন্ত্রী হওয়াটাকে ভবিষ্যতের বড় দুর্ভোগ হিসেবে দেখছে সাধারণ মানুষ।

বরিস জনসন সাংবাদিকা থেকে শুরু করে লন্ডন শহরের মেয়র ও সর্বশেষ দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। দায়িত্ব পালনের সময় তার বর্ণবাদ ও ইসলাম বিদ্বেষী আচরণ সবচেয়ে বেশি সমালোচিত হয়েছে। তার এই আসাটা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা বাড়াতে পারে বলেও ধারণ করছে আন্তর্জাতিক মহল।

বর্ণবাদী বরিস জনসন:

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো ব্রিটেনেও তিনি একজন বিভেদ সৃষ্টিকারী বলে পরিচিত। বিভিন্ন সময় উদ্ভট মন্তব্য করে সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতেও পরিণত হয়েছিলেন তিনি।

অতীতে লন্ডনের সাবেক এই মেয়রের হঠকারী মন্তব্য বিশেষকরে আফ্রিকানদের নিয়ে তিনি মাঝেমধ্যে এমন সব মন্তব্য করতেন, যা সম্পূর্ণ বর্ণবাদী ও অশোভন। ২০০২ সালে ব্রিটেনের পার্লামেন্ট সদস্য থাকাকালে তিনি ভয়ানক কিছু মন্তব্য করেন।

পরবর্তী সময় ২০০৮ সালে লন্ডনের মেয়রপদে নির্বাচনের সময় সেসব মন্তব্যের দরুন ক্ষমাপ্রার্থনাও করেছেন।

২০০২ সালে ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় লেখা এক কলামে তিনি বলেন, কোনো সন্দেহ নেই একে ৪৭ রাইফেলগুলো নিরব হয়ে যাবে, পাঙ্গাসও মানুষের শরীর খাওয়া বন্ধ করে দেবে এবং ব্রিটিশ করদাতাদের তহবিলের বড়ো পাখিতে চড়ে শ্বেতাঙ্গ প্রধানের ভূমি স্পর্শ দেখে উপজাতীয় যোদ্ধারা তরমুজ হাসিতে ভেঙে পড়বে।

পশ্চিমা দেশগুলোতে তরমুজকে বর্ণবাদের বড় প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।

একই বছর স্পেকটেটরে লেখা এক কলামে তিনি বলেন, আফ্রিকা একটি কলঙ্ক হতে পারে, কিন্তু আমাদের চেতনার ওপর এটা একটি কলঙ্ক না। এটা কোনো সমস্যা না যে আমরা একসময় দায়িত্বে ছিলাম, বরং সমস্যা হচ্ছে, আমরা আর কোনো দায়িত্বে নেই।

তিনি বলেন, আফ্রিকা একটি বিশৃঙ্খল অঞ্চল। কিন্তু ঔপনিবেশিকতাকে আমরা দোষী করতে পারি না।

টেলিগ্রাফে লেখা আরেক কলামে তিনি বলেন, ইংল্যান্ডের বাইরে যাওয়া ব্লেয়ারের জন্য কতটা স্বস্তিদায়ক। বলা হয়ে থাকে যে, রানি কমনওয়েলথকে ভালোবাসতে এসেছেন। অংশত সত্য। কারণ, এটা তাকে পতাকা-নাড়ানো উল্লসিত নিগ্রো শিশুদের যোগান দেয়।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার এই ফিরে আসার কারণে সামাজিক মাধ্যম টুইটারে তার বিরোধিতা করে ইতিমধ্যে #নটমাইপিএম হ্যাশট্যাগ ভাইরাল হয়েছে। এভাবেই নিজেদের হতাশার কথা জানিয়েছেন তার বিরোধীরা।

ইসলাম বিদ্বেষী বরিস জনসন:

ইসলাম বিদ্বেষী বরিস জনসনের মতে, মুসলিম বিশ্বে কেন বুর্জোয়া শ্রেণি, উদার পুঁজিতন্ত্র ও গণতন্ত্রের বিস্তার ঘটেনি, তা ব্যাখ্যা করতে সহায়ক হয় ইসলাম সম্পর্কে এখানে এমন কিছু বলা দরকার।

মুসলিম বিশ্বে প্রযুক্তি ও সাংস্কৃতিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে ধর্মীয় বিধিনিষেধ বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলেও একসময় মন্তব্য করেন লন্ডনের সাবেক এই মেয়র।

তিনি লিখেছেন, এমনটি কল্পনা করাও বিস্ময়কর যে রোমান কিংবা বাইজেন্টাইন সম্রাটদের অধীনে কয়েক হাজার বছর ধরে শিক্ষার আলো জ্বালিয়েছে কনস্টান্টিনোপল। কিন্তু ওসমানীয় শাসনামালে উনিশ শতকের মধ্যভাগের আগ পর্যন্ত ইস্তানবুলে ছাপাখানা দেখা যায়নি। এতে বাস্তবিকভাবে তারা কয়েকশ বছর পিছিয়ে যায়।

রোমের ভ্যাটিকানে সিসটাইন চ্যাপলের সিলিংয়ে মাইকেলাঞ্জেলোর ষোড়শ শতকের শিল্পকর্মের সঙ্গে তুলনা করলে মুসলমানরা কিছুই দিতে পারেনি। এগুলো ইসলামি শিল্পকর্মের উৎকর্ষতাকে ছাড়িয়ে গেছে।

ইতালির ফ্লোরেন্সের ভাস্কর, স্থপতি, চিত্রশিল্পী ও কবি মাইকেলাঞ্জেলো। রেনেসাঁর সময় তার অসাধারণ শিল্পকর্মের জন্য তিনি বিশ্বজুড়ে খ্যাতি পেয়েছেন।

এমন সব মন্তব্যের জন্য ব্যাপক সমালোচনা কুড়িয়েছেন তিনি। এটিকে বিব্রতকর ও সমস্যাবহুল বলে বর্ণনা করেছে ব্রিটেনে মুসলিম বিদ্বেষ পর্যবেক্ষণ করা সংস্থা টেল মামা। সংস্থাটি জানায়, এতে ধর্ম নিয়ে জনসনের অজ্ঞতাকেই প্রকাশ করেছে।

গত বছরে টেলিগ্রাফে লেখা একটি কলামে মুসলমান নারীদের পরা বোরকাকে ‘চিঠির বাক্স’ ও ‘ব্যাংক ডাকাতের’ সঙ্গে তুলনা করেন তিনি।

২০০৭ সালে অ্যান্ড দেন কেইম দ্য মুসলিম শিরোনামের এক প্রবন্ধে উইনস্টন চার্চিলের একটি বিবৃতির কথা উল্লেখ করেন। এতে বলা হয়েছে, ইসলামের চেয়ে বিশ্বে আর কোনো জোরালো পেছনমুখী শক্তি নেই।

জেড