অযোধ্যার ঐতিহাসিক বাবরী মসজিদের ভূমি সংক্রান্ত মামলার রায় প্রকাশের আগে ভারতের সব রাজ্যকে বিশেষ সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (০৭ নভেম্বর) এই বিষয়ে এডভাইসরি পাঠিয়েছে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই এই বিতর্কিত মামলাল রায় ঘোষনার কথা সুপ্রিম কোর্টের।
সুপ্রিম কোর্টের বর্তমান প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ আগামী ১৭ নভেম্বর অবসর নেবেন। তার আগেই তিনি অযোধ্যা কাম বাবরি মসজিদ মামলার রায় দেবেন বলে জানা গেছে।
গত মাসেই এই মামলার দীর্ঘ শুনানী শেষ হয়েছে। রায় বেরনোর আগে সংযত মন্তব্য করতে সব রাজনৈতিক দলগুলিকে বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। মন্ত্রীদেরও তিনি কোনরকম বিতর্কিত মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকার কথা বলেছেন। একই বার্তা দেয়া হয়েছে যোগী আদিত্যনাথ সরকারের তরফেও।
এদিকে, উত্তর প্রদেশ সরকারকে স্পর্শকাতর এই মামলার রায় বেরোনোর আগে নিরাপত্তামূলক সব রকমের সতর্কতা মূলক ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এবং এসএমএস’র মাধ্যমে রায় বেরোনোর পর যাতে কোনোরকম গুজব ছড়িয়ে পড়তে না পারে সেজন্যও ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
ইতিমধ্যে অযোধ্যায় জারি করা হয়েছে ১৪৪ ধারা। এখনও পর্যন্ত যা নিরাপত্তাবাহিনী মোতায়েন হয়েছে, তাতে কার্যত দুর্গে পরিণত হয়েছে অযোধ্যা।
জানা যাচ্ছে, ৪০ কোম্পানি আধা সেনা (প্রায় ৪০০০) মোতায়েন হয়েছে। এর মধ্যে ১৬ কোম্পানি সিআরপিএফ, ৬ কোম্পানি আইটিবিপি, সিআইএসএফ, এসএসবি। শুধু কয়েক হাজার সেনা কর্মী মোতায়েন নয়, অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে কিছু অস্থায়ী জেলও তৈরি করতে চলেছে যোগীর প্রশাসন।
জানা গেছে, অম্বেদকরনগরের কলেজগুলিকে জেলে পরিণত করা হচ্ছে। এক নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, বিভিন্ন কলেজে ৮টি অস্থায়ী জেল বানানো হচ্ছে।
এদিকে, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, অযোধ্যা মামলায় সুপ্রিম কোর্টের রায় যাইহোক, তাতে যেন কোথাও শান্তিভঙ্গ না হয়। দেশজুড়ে এ ব্যাপারে সকলকে সতর্ক থাকতে বলেছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (০৭ নভেম্বর) দলীয় বৈঠকের পরে সাংবাদিক সম্মেলনে মমতা বলেছেন, রায় কী হবে না হবে, জানি না। কিন্তু রায় বেরোলে যাতে কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি না হয়, সেজন্য দলের সকলকে সতর্ক থাকতে বলেছি। শান্তি বজায় রাখতে বলেছি। আর সংবাদমাধ্যমকে এ বিষয়ে যা বলার, তা শুধু আমি বলব। আর কেউ বলবেন না। দলের সকলকে তা জানিয়ে দিয়েছি।
আরও পড়ুন: বাবরি মসজিদ মামলার রায় ১৭ নভেম্বর
কী হতে যাচ্ছে বাবরী মসজিদের ভাগ্যে ?
কয়েক দশক ধরে চলা এ ভূমি বিরোধ মেটাতে বেশ কয়েকবার মধ্যস্থতার উদ্যোগ নেয়া হলেও শেষ পর্যন্ত সব চেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছে।
ভেঙে ফেলা বাবরি মসজিদের স্থানে রামমন্দির নির্মাণের দাবি জানানো পক্ষের আইনজীবীকে পরাসরণ মঙ্গলবার আদালতে বলেন, মুসলমানরা অন্য যেকোনো মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়তে পারেন। শুধু অযোধ্যাতেই ৫৫ থেকে ৬০টি মসজিদ রয়েছে। কিন্তু হিন্দুদের কাছে এটি রামের জন্মস্থান। আমরা জন্মস্থান পরিবর্তন করতে পারি না।
মুসলিম সম্প্রদায়ের সদস্যরা বলছেন, ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত বাবরি মসজিদের জমি নিয়ে হিন্দুদের পক্ষ থেকে কোনো দাবি তোলা হয়নি। ১৯৯২ সালের ডিসেম্বরে উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা মসজিদটি ভেঙে দেয়। তাই এখন সেখানে মসজিদটি পুনঃস্থাপনই যৌক্তিক।
এ দিকে এই মামলা নিয়ে জটিল পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে; এমন আশঙ্কায় উত্তরপ্রদেশ সরকার আগে থেকেই অযোধ্যায় চার বা ততোধিক লোকের যে কোনো জমায়েতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। জমি সমস্যা নিয়ে মধ্যস্থতা কমিটি কোনো সমাধান খুঁজে বের করতে সক্ষম না হওয়ায় গত ৬ আগস্ট থেকে ভারতের প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে পাঁচ বিচারকের বেঞ্চ এই মামলার দৈনিক শুনানি শুরু করে।
২০১০ সালে এলাহাবাদ হাইকোর্টের চারটি দেওয়ানি মামলার রায়ের বিরুদ্ধে শীর্ষ আদালতে ১৪টি আবেদন জমা পড়ে। এলাহাবাদ আদালত রায় দিয়েছিল যে, অযোধ্যার ২ দশমিক ৭৭ একর জমি সুন্নি ওয়াকফ বোর্ড, নির্মোহী আখড়া এবং রামলল্লা, এই তিনটি দলের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে দেয়া উচিত।
হিন্দুদের এই স্থানটি রামের জন্মস্থান ছিল। সেখানে একটি প্রাচীন মন্দিরের ধ্বংসাবশেষের ওপর বাবরি মসজিদ নির্মিত হয়েছিল। কিন্তু তাদের এ দাবির পক্ষে কোনো সাক্ষ্য প্রমাণ পেশ করতে পারেনি। ষোড়শ শতকে নির্মিত মসজিদটি ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর ভেঙে দেয় উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা। এর জেরে শুরু হয় ব্যাপক মুসলিমবিরোধী দাঙ্গা। নিহত হয় প্রায় দুই হাজার মানুষ।
গতকাল বুধবার নির্ধারিত সময়ের আগেই শুনানি শেষ হয়। ৩৯ দিন টানা শুনানির শেষে ৪০ দিনের মাথায় এ দিন শুনানি শেষের নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ।
সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চে বুধবার মামলার শুরুতেই আরো সময় চাওয়া হলেও প্রধান বিচারপতি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন, ‘যথেষ্ট হয়েছে। বিকেল ৫টায় শুনানি শেষ হতেই হবে।’ সে মতোই শুনানি শেষ হলো। তবে রায় হতে পারে কমপক্ষে ২৩ দিন পর। আগামী ১৭ নভেম্বর অবসর নিচ্ছেন প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ। রায় ঘোষণা হতে পারে তার আগেই।
এমবি





