গত ১৪ নভেম্বর চীনের কাছ থেকে এই প্রথম দুটি সাবমেরিন ক্রয় করেছে বাংলাদেশ। ঢাকায় বেইজিংয়ের অবস্থান জোরদার হওয়ায় ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দিল্লির নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।

বাংলাদেশের কাছে চীনের সাবমেরিন বিক্রয়কে ভারত ঘিরে ফেলার কৗশল বলে মনে করছেন দিল্লির বিশেষজ্ঞরা।

বুধবার এ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া-ভিত্তিক প্রতিরক্ষা বিষয়ক সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘ডিফেন্স নিউজ’। ট্যাবলয়েড পত্রিকাটি এ বিষয়ে ভারতের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একটি সাক্ষাতকার নিয়েছে।

এ প্রতিবেদনে বলা হয়, চীন থেকে সাবমেরিন সংগ্রহের পর ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ৩০ নভেম্বর তড়িঘড়ি করে ঢাকা সফর করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। মূলত তিনি প্রতিবেশি বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক আরও এগিয়ে নিতেই এ সফরে আসছেন।

বাংলাদেশ ২০৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে চীনের কাছ থেকে এই প্রথম দুটি সাবমেরিন ক্রয় করেছে। ‘০৩৫জি’ ধাঁচের ডিজেল-ইলেক্ট্রিক সাবমেরিন দুটি পানির নিচ থেকে শত্রুর জাহাজ, যুদ্ধ বিমান ও সাবমেরিনে হামলা চালাতে সক্ষম। ২০১৭ সালে সাবমেরিন দুটি বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রথম কোন সাবমেরিন হিসেবে যাত্রা শুরু করবে।

ভারতের সাবেক নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল (অবঃ) অরুণ প্রকাশ বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা ও দেশটির তিনদিক ভারতবেষ্টিত হওয়ায় চীনের কাছ থেকে সাবমেরিন সংগ্রহ কেবল অযৌক্তিকই নয়, এতে ভারত উদ্বিগ্ন।

প্রকাশ বলেন, ‘অবশ্যই, এই হস্তান্তর গ্রাহক রাষ্ট্রদের সঙ্গে মিলে ভারতকে ঘিরে ফেলার চীনের আরেকটি কৌশলগত পদক্ষেপ।’

তবে ভারতভিত্তিক থিং ট্যাংক ‘সেন্টার পলিসি রিসার্চের’ গবেষণা অধ্যাপক ভারত কার্নাড এ বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেছেন। তিনি বলেন, ‘এটা কেবলই তাদের জন্য ভাল।

ঢাকা কোন লাভজনক চুক্তি ত্যাগ করতে পারে না। তবে মোদি সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যে, এটা যেন বে্ইজিংয়ের জন্য কৌশলগত উপকার না নিয়ে আসে।’

ভারতীয় নৌবাহিনীর ক্যাপ্টেন ও ন্যাশনাল মেরিটাইম ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক গারপ্রিত খুরানা বলেন, ‘এটা অনুধাবন করা কঠিন যে, কেন বাংলাদেশ তাদের নৌবাহিনীতে সাবমেরিন যুক্ত করেছে, যে দেশটি চিরাচরিতভাবেই কোন সামুদ্রিক-সামরিক হুমকির সম্মুখিন নয়।

একমাত্র দুই সামুদ্রিক প্রতিবেশি মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সামুদ্রিক বিরোধ ছিল, যা আন্তর্জাতিক নিষ্পত্তি আদালতের মাধ্যমে যথাক্রমে ২০১২ ও ২০১৪ সালে মিমাংসীত হয়েছে।

ভারতের জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের কূটনীতি ও নিরস্ত্রীকরণ বিষয়ের অধ্যাপক শরণ সিংহ বলেন, ‘বাংলাদেশ নৌবাহিনী সবসময়ই চীনের হস্তান্তর থেকে লাভবান হয়ে থাকে।

কিন্তু সাবমেরিন হস্তান্তর দুদেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় বড় ধরনের উন্নীতকরণকে বোঝায়। এমন ধরনের হস্তান্তরের পাশাপাশি নতুন নতুন অস্ত্র ব্যবস্থার উপদ্রুব দক্ষিণ এশিয়াকে আরও প্রতিযোগিতাসম্পন্ন এলাকায় পরিণত করতে অবদান রাখবে।’

ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, অক্টোবরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ঢাকা সফরে বাংলাদেশ ও চীন তাদের মধ্যকার বিদ্যমান প্রসস্ত সহযোগিতার সম্পর্ককে কৌশলগত সম্পর্কে উন্নীত করতে সম্মত হয়, যা ভারতের জন্য উদ্বেগ তুলে ধরেছে।

ডিফেন্স নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়, এ বিষয়ে নয়াদিল্লিতে অবস্থিত বাংলাদেশে দূতাবাসের কূটনৈতিকদের মন্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, চীন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জন্য বড় ধরনের অস্ত্র সরবারাহকারী দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তবে কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ গ্রহণের ক্ষেত্রে দূরত্ব রয়েছে। বাংলাদেশ তার সশস্ত্রবাহিনীকে আধুনিকীকরণ করছে এবং বিদেশ থেকে অস্ত্র ক্রয় করছে।

ভারতের এক সিনিয়র সেনা কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশ চীন থেকে প্রথম সাবমেরিন সংগ্রহ করেছে। এর মাধ্যমে সেদেশ থেকে বেশি বেশি অস্ত্র সরবরাহ করার ক্ষেত্রে নির্ভরশীল হয়ে পড়বে বাংলাদেশ।

প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ভারতও বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক জোরদার করছে।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী পরিকরের আগামী সপ্তাহের দুইদিনের সফরে দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বিকশিত হবে। প্রতিরক্ষা সহযোগিতার অংশ হিসেবে ভারত বাংলাদেশে সহজ আর্থিক পদ্ধতিতে অফশোর পেট্রোল যানবহন রফতানি করার চিন্তা করছে বলে জানান তিনি।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বাংলাদেশের বর্তমান ক্ষমতাসীনদের আমলে ঢাকা-দিল্লির মধ্যে আন্তরিক সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও দুইদেশ এখনও পানি বণ্টন চুক্তি নিষ্পত্তি করতে পারেনি। যা ইন্দো-বাংলাদেশ সম্পর্কে একটি বড় তিক্ততাকে প্রমাণ করে।

মাহমুদ