ভারতে মহিলাদের স্যানিটারি প্যাডকে ব্যবহার করে অভিনব এক প্রতিবাদের পদ্ধতি দিল্লির জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া থেকে এখন কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়েও ছড়িয়ে পড়েছে।
দুটোই ভারতের প্রথম সারির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, এবং এ মাসের গোঁড়ায় জামিয়া-র ক্যাম্পাসে স্যানিটারি প্যাড সেঁটে লিঙ্গ-বৈষম্যর প্রতিবাদ জানানোর ঘটনা ঘটার পর এবার একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে যাদবপুরেও।
প্রতিবাদকারীরা এই পদ্ধতিকে একটা শক থেরাপি বলে বর্ণনা করতে চাইছেন। তবে স্যানিটারি প্যাডকে প্রতিবাদের হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগানোর প্রশ্নে যাদবপুরে সবাই একমত হতে পারছেন না।
সপ্তাহ তিনেক আগে ৮মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবসে ‘প্যাডস অ্যাগেইনস্ট সেক্সিজম’ নামে একটি ক্যাম্পেইনের সূচনা করেন ইলোন কাস্ট্রাশিয়া নামে একজন জার্মান।
এই ক্যাম্পেইনের মূল কথা ছিল পুরুষ যেমন রজ:স্রাবের রক্তকে ঘৃণা করে – ঠিক তেমনই ধর্ষণকেও যেন তারা ঘৃণা করে।
নিজের এই বক্তব্য তুলে ধরতে শহরময় স্যানিটারি প্যাড সেঁটে স্লোগান লেখেন ওই মহিলা। আর তার ঠিক চারদিনের মাথায় একই ছবি দেখা যায় দিল্লির অভিজাত বিশ্ববিদ্যালয় জামিয়া মিলিয়ার ক্যাম্পাসেও।
তবে জামিয়ার দেওয়ালে স্যানিটারি প্যাড সেঁটে কর্তৃপক্ষর শো-কজের মুখে পড়তে হয়েছে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের জনাচারেক ছাত্রছাত্রীকে।
এ বিষয়ে জামিয়া-র ইসলামী চর্চাকেন্দ্রের প্রধান আখতারুল ওয়াসি বলেন, ‘এমন একটা সংবেদনশীল প্রশ্নে এত কুৎসিত উপায়ে কেউ নিজের মনোভাব প্রকাশ করবে ভাবাই যায় না।’
তার যুক্তি হল, ‘মহিলাদের সম্মান দেখাতে হলে তাদের অনুভূতির প্রতি আমাদের মর্যাদা দিতে হবে, কিন্তু তার বদলে এটা তো তাদের প্রতি চরম অবমাননা! জেন্ডার সেন্সিটাইজেশন তৈরি করার সঠিক রাস্তা এটা নয়–আর আইনে বাধা নেই বলেই এভাবে প্রতিবাদ করা যাবে, সেটাও ঠিক নয়।’
জামিয়ার ওই ছাত্রছাত্রীদের মাথার ওপর যখন শাস্তির খাঁড়া ঝুলছে, তখন গতকাল শনিবার কলকাতার যাদবপুর ক্যাম্পাসেও দেখা গেছে স্যানিটারি প্যাডে আঁকা পোস্টার।
তার কোনওটায় লেখা, ‘ধর্ষিতাকে দোষ-দেওয়াটাও কিন্তু লিঙ্গ-সহিংসতা’। কোনওটায় আবার লেখা হয়েছে, ‘ধর্ষিতার নাম প্রকাশ করে তাকে লজ্জায় ফেলাটা যৌন সহিংসতা’।
যে ছাত্রছাত্রীরা এই সব পোস্টার সেঁটেছেন বা সেটাকে সমর্থন করছেন তারা প্রায় কেউই নাম প্রকাশ করতে চান না– তবে তাদের প্রতিবাদের এই পদ্ধতি ক্যাম্পাসকেও কিন্তু কার্যত দুভাগ করে দিয়েছে।
ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাবিভাগের অধ্যাপিকা সুচরিতা চ্যাটার্জি বলছিলেন এই ধরনের প্রতিবাদ কিন্তু অনেককে অস্বস্তিতেও ফেলতে পারে।
তার বক্তব্য হল, ‘প্রতিবাদের পদ্ধতি কাউকে আহত করছে কি না বা অস্বস্তিতে ফেলছে কি না সেটাও দেখা দরকার।’
তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে তারই সহকর্মী ও ইতিহাসের অধ্যাপক অমিত ভট্টাচার্যর আবার এটাকে ন্যায্য প্রতিবাদের পথ হিসেবে মানতে আপত্তি নেই।
তিনি বলেন, ‘সব প্রতিবাদের পদ্ধতি সবার মনোমত হতে নাও পারে, কিন্তু মানুষের ভাবনাকে একটা ধাক্কা দিতে বা নাড়া দিতে এধরনের পদ্ধতি কিন্তু প্রয়োগ করা হতেই পারে। আর ছাত্ররাই তো তাদের প্রতিবাদে উদ্ভাবনী শক্তি দেখাবে, তাই না?’
সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনের জেরে খবরের শিরোনামে থাকা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ এই স্যানিটারি প্যাড পোস্টারিংয়ের বিরুদ্ধে এখনও কোনও পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে খবর নেই।
কিন্তু ষাটের দশকে আমেরিকায় নারীবাদীদের ব্রা পোড়ানোর আন্দোলনের মতোই ভারতের নানা ক্যাম্পাসে যে স্যানিটারি প্যাড প্রতিবাদের হাতিয়ার হিসেবে সাড়া ফেলছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই! বিবিসি বাংলা
ইআর





