দক্ষিণ চীন সাগরের উপর চীনা যুদ্ধবিমানের টহলদারি নতুন করে ওই বিতর্কিত এলাকায় উত্তেজনা বাড়িয়ে দিয়েছে।
বেইজিং জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার চীনা বিমানবাহিনীর ফাইটার জেট এইচ-৬কে বোম্বার বিমান দক্ষিণ-চীন সাগর ও আশাপাশের এলাকায় পেট্রলিং করে। চীন এই টহলদারিকে ‘রুটিন’ বলে দাবি করলেও সে কথা মানতে নারাজ আন্তর্জাতিক সামরিক বিশেষজ্ঞরা।
পিপলস লিবারেশন আর্মি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, দক্ষিণ চীন সাগরে তাদের বিমানবাহিনীর রুটিন টহলদারি চলেছে। কিন্তু সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টহলদারি চলেছে চীন বিরোধী একাধিক প্রতিবেশী দেশগুলির পানিসীমান্তেও। যে আকাশপথ চীনা বোমারু বিমান উড়ে গেছে তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মত ওয়াকিবহাল মহলের।
নির্ধারিত রুটের বদলে বৃহস্পতিবার চীনা বিমান ফিলিপাইনস ও তাইওয়ানের বাণিজ্যিক পানিসীমা বশি চ্যানেলের খুব কাছ দিয়ে উড়ে যায়। এই পানিসীমা নিয়ে চীনের সাথে প্রতিবেশীদের প্রবল বিরোধ রয়েছে। চীন কিছুতেই একে তাইওয়ানের বলে মানতে রাজি নয়।
তবে এই বশি চ্যানেল চীন ও তাইওয়ান ছাড়াও দক্ষিণ চিন সাগরে বাণিজ্যের নিরিখে অনেকের কাছেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই এলাকায় সমুদ্রের নিচে রাশি রাশি ‘আন্ডারসি কেবল নেটওয়ার্ক’ ছড়িয়ে রয়েছে। টেলিফোন ও ইন্টারনেট সংযোগের জন্য তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
শুধু বশি চ্যানেলই নয়, চীনা যুদ্ধবিমান ‘মিয়াকো স্ট্রেট’-এর খুব কাছেও টহল দিয়ে গেছে। জাপানের ওকিনাওয়া ও মিয়াকো দ্বীপ দুটি এই পানিপথেই একে অপরের সাথে যুক্ত। তাই চীনের এই পদক্ষেপে আতঙ্কিত টোকিওও-।
প্রশান্ত মহাসাগরের ওই এলাকা বাণিজ্যের জন্য বিখ্যাত। বিভিন্ন দেশের প্রায় ৩২টি সেনাঘাঁটি রয়েছে সেখানে। মিয়াকো স্ট্রেটের খুব কাছেই জাপানের সেনকাকু দ্বীপ। এই দ্বীপকেও নিজেদের বলে দাবি করে। চীনা বোমারু বিমানে সুপারসনিক ল্যান্ড অ্যাটাক ক্রুজ মিসাইলও মজুত ছিল। বেজিংয়ের এই বক্তব্যের পরই টহলদারি নিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে উত্তেজনা আরো বেড়েছে।
বিশ্বে চীনের প্রভাব বাড়ছে
যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিভিন্ন দেশে সামরিক হস্তক্ষেপ করে প্রভাব বিস্তার করার বিশ্বনীতি চীন বরাবরই এড়িয়ে চলেছে। বরং মিয়ানমার কিংবা জিম্বাবুয়ের মতো অস্থিতিশীল দেশগুলোতে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করে প্রভাব বিস্তার করছে দেশটি। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এর ফলে দিন দিন বিশ্বে চীনের ভূমিকা আরো জোরদার হচ্ছে।
চীনের পররাষ্ট্রনীতির মূল বিষয় ‘অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা’। ১৯৫৪ সালে এই নীতি গ্রহণ করেছে চীন, যখন অনেক বেশি দুর্বল ছিল দেশটি; কিন্তু এত বছর পর বিশ্বের সবচেয়ে বড় সেনাবাহিনী ও দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হয়েও একই নীতিতে অটল রয়েছে চীন। এই ঘটনার সাথে সম্প্রতি একটি কূটনৈতিক পদক্ষেপের মিল রয়েছে।
মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুবিষয়ক সঙ্কট সমাধানে মধ্যস্থতা করতে এগিয়ে এসেছে চীন। মধ্যপ্রাচ্যেও চীন তার ভূমিকা জোরদার করেছে, সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ ও ফিলিস্তিন-ইসরাইল দ্বন্দ্বে মধ্যস্থতা করার প্রস্তাব দিয়েছে। ক্ষমতার দ্বন্দ্বে ক্ষতবিক্ষত মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে চীনের অংশগ্রহণ সব সময়ই কম ছিল। এই অঞ্চলটির ওপর দেশটির রয়েছে তেলনির্ভরতা।
চীনের এসব কূটনৈতিক তৎপরতার বিষয়ে লন্ডনের কিংস কলেজের ল্যান চায়না ইনস্টিটিউটের পরিচালক কেরি ব্রাউন বলেন, ‘চীন বিশ্বে নিজেদের ভূমিকা আরো জোরদার করতে চাইছে, যদিও দেশটি কখনোই এর বাইরে ছিল না’।
‘ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড’ প্রকল্পের মাধ্যমেও বিশ্বব্যাপী চীনের প্রভাব বাড়ছে। এশিয়া ও ইউরোপ মহাদেশে রেল ও নৌ যোগাযোগের মাধ্যমে প্রাচীন বাণিজ্য রুট পুনরায় চালু করতে বেইজিং বিনিয়োগ করছে এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার।
চীনকে পরাশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে একটি উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছেন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। গত মাসে দেশটির ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির কংগ্রেসে একই সাথে চীনের জন্য একটি শীর্ষস্থানীয় সেনাবাহিনী গঠনের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
তবে চীনা রাজনৈতিক বিশ্লেষক চেন দাওইন মনে করেন চীন যতই বিদেশে হস্তক্ষেপ না করার নীতি অনুসরণ করুক, বিদেশে তাদের জাতীয় স্বার্থ, তাদের প্রতিষ্ঠান বা প্রবাসী নাগরিকেরা হুমকির সম্মুখীন হলে দেশটি সেখানে সেনা মোতায়েন করবে সেটিই স্বাভাবিক।
তার প্রমাণ পাওয়া যায় পূর্ব আফ্রিকার দেশ জিবুতিতে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন ও দক্ষিণ চীন সাগরের কৃত্রিম দ্বীপগুলোতে সামরিক স্থাপনা নির্মাণের মাধ্যমে।- এএফপি
এএস





