সফল সমাপ্তির পথে এগিয়ে যাচ্ছে সিরিয়ার পাঁচ বছরের যুদ্ধ। গত ৩০ সেপ্টেম্বর সিরিয়ায় রুশ হামলা শুরুর পর ১২০ দিনে মূলত দোজখ দেখেছে দোর্দণ্ড প্রতাপে এগিয়ে যাওয়া আইএস-সহ সবগুলো সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। জানা যাচ্ছে- ইরান, রাশিয়া, সিরিয়া ও ইরাক মিলে যে জোট গঠন করেছে সে জোট এখন বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে।
সিরিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে প্রকৃতপক্ষে কী হচ্ছে- তার সঠিক চিত্র পশ্চিমা গণমাধ্যমে পাওয়া মুশকিল। তাদের খবর, প্রতিবেদন ও বিশ্লেষণে সত্য-মিথ্যের মিশেল থাকে, আসল সত্যের প্রতিফলন ঘটা দুরূহ বিষয়। কিন্তু মার্কিন সাংবাদিক মাইক হুইটনি খানিকটা ব্যতিক্রম ঘটিয়েছেন।
তিনি ‘কাউন্টার পাঞ্চ’ ম্যাগাজিন লিখেছেন, “রাশিয়ার বিমান বাহিনীর সহায়তায় সিরিয়ার বাহিনী যুদ্ধের জোয়ার সৃষ্টি করেছে এবং তারা উগ্রপন্থি ও গোঁড়াবাদী সন্ত্রাসীদেরকে সে জোয়ারে ধুয়েমুছে দিতে চলেছে।”
হুইটনি বলেছেন, “আফগানিস্তান ও ইরাকে মার্কিন হামলার মতো সিরিয়ায় রুশ যুদ্ধ-প্রক্রিয়া অতটা প্রলম্বিত হবে না।” তিনি আরো বলেছেন, “সিরিয়ার যে ঘটনাকে পশ্চিমা গণমাধ্যম কঠিন অবস্থা বলে চিত্রায়িত করছে সেখানে বাস্তবতা হচ্ছে রুশ নেতৃত্বাধীন জোট বিস্ময়কর বিজয়ের দিকে এগিয়ে চলেছে এবং তারা ধীরে ধীরে সমস্ত সিরিয়ায় নতুন করে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করছে।
রুশ জোটের অভিযানে আগ্রসনকারীরা এখন প্রতিনিয়ত নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে রয়েছে। তিনি আগ্রাসনকারী বলতে বিদেশি ভাড়াটে সন্ত্রাসীদেরকে বুঝিয়েছেন যারা আইএস বা দায়েশ ও আল-নুসরাসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হয়ে সিরিয়ায় সরকারি সেনাদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে।
সিরিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রের রিপোর্টই সেখানকার আসল চিত্র বলে দিচ্ছে। সিরিয়ার সেনারা যুদ্ধে জড়িত হওয়ায় রাশিয়াকে ধন্যবাদ দিচ্ছে। এছাড়া, প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ নিজে ব্যক্তিগতভাবে ইরান ও রাশিয়াকে ধন্যবাদ দিয়েছেন।
বার বার বলেছেন, এ দু দেশের সম্পৃক্তির ফলে সিরিয়ার সেনারা সন্ত্রাসীদেরকে এখন সিরিয়া থেকে বিতাড়িত করতে সক্ষম হচ্ছে। যুদ্ধক্ষেত্রের চিত্র হচ্ছে- সিরিয়ার সেনারা এখন সব ফ্রন্টে সন্ত্রাসীদের ওপর হামলা চালাচ্ছে, কৌশলগত শহরগুলো মুক্ত করছে এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশে সন্ত্রাসীদেরকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। অথচ, এই ছয় মাস আগেও সিরিয়ার সেনারা প্রতিদিনই ভূখণ্ড হারাচ্ছিল এবং কঠিন অবস্থার মধ্যে তাদের দিন যাচ্ছিল।
হুইটনি বলছেন, মার্কিন নাগরিকরা খানিকটা শর্তসাপেক্ষে বিশ্বাস করতে চায় যে, বিদেশির মাটিতে যেকোনো বাহিনীর জন্য ভয়াবহ কঠিন অবস্থা তৈরি হওয়াটা জরুরি বিষয়। তাদের এই উদ্বেগের কারণ সহজেই বোধগম্য।

কারণ ইরাক ও আফগানিস্তানে যুদ্ধে জড়িয়ে আমেরিকা চোরবালিতে আটকে গিয়েছিল যে যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলকে আরো বেশি সহিংসতা এবং অনেক বেশি অস্থিতিশীলতা উপহার দিয়েছে!
কিন্তু রাশিয়ার বিষয়টি আলাদা। প্রকৃত ঘটনা হচ্ছে সিরিয়ায় আটকে যাওয়ার নাম করে সেখানে এক/দুই দশকের জন্য থাকার কোনো ইচ্ছা নেই রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের।
তিনি যে পরিকল্পনা করেছেন তা হচ্ছে- সন্ত্রাসীদের পরাজিত করা এবং তাদেরকে বিতাড়িত করা। সিরিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রের সর্বসাম্প্রতিক যে রিপোর্ট তাতে এটি পরিষ্কার যে, খুব সুচারুভাবে এগিয়ে যাচ্ছে পুতিনের সে পরিকল্পনা।
‘দোজখ’ দেখেছে আইএস:
গত ৩০ সেপ্টেম্বর সিরিয়ায় বিমান হামলা শুরু করে রাশিয়া। সেই থেকে এ পর্যন্ত চার মাস চলে গেছে। এই ১২০ দিন ধরে ‘দোজখের যন্ত্রণা’ ভোগ করতে হচ্ছে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএস-কে।
এ সময়ের মধ্যে রুশ বাহিনী ৬,০০০ বার বিমান হামলা চালিয়েছে যা সন্ত্রাসবাদ-বিরোধী লড়াইয়ে অত্যন্ত ফল বয়ে এনেছে। আইএস এখন পালাচ্ছে এবং সিরিয়ার বাহিনী সব ফ্রন্টে এগিয়ে যাচ্ছে।
আইএস-সহ সিরিয়ার সব সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সম্মিলিত শক্তি কম ছিল তা ভাবারও কারণ নেই। স্মরণ রাখতে হবে, তাদের পেছনে রয়েছে আমেরিকা, ইসরাইলসহ আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক সব বড় বড় শক্তির মদদ। অস্ত্র, অর্থ ও প্রশিক্ষণ দিয়ে কতটা নিষ্ঠুরতার সঙ্গে সহিংসতা চালাতে হবে তার সব ব্যবস্থা পাকা করেছিল এসব শক্তি। আইএস তাদের হাতেরই পুতুল বটে।
বাশার আসাদ সরকারের আনুষ্ঠানিক অনুরোধের পর রাশিয়া সিরিয়ায় বিমান হামলা শুরু করে। রুশ যুদ্ধবিমানগুলো সিরিয়ার সেনাদেরকে চরমপন্থিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সহযোগিতা করছে।
এই চরমপন্থিরা সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের নেতৃত্বাধীন সরকারকে উৎখাত করে সেখানে কথিত খেলাফত কায়েম করতে চায়। এ কাজে তারা শুধুই সন্ত্রাস ও নিষ্ঠুরতা পথ বেছে নিয়েছে। একসময় যে সিরিয়া ছিল নিতান্তই শান্তির আধার, সে সিরিয়াকে তারা এখন সন্ত্রাস ও সাম্প্রদায়িকতার জনপদে পরিণত করেছে।
রাশিয়ার মিশন বেশ সফলভাবেই এগিয়ে চলেছে। ইসলামের নামে তাদের খেলাফত প্রতিষ্ঠার নিষ্ঠুর তামাশাও শেষ হতে চলেছে। চার মাসে ৬,০০০ দফা বিমান হামলা ও রুশ আন্তরিকতার কারণে আইএস’র যোদ্ধারা মারা যাচ্ছে, পালাচ্ছে এবং দল ছেড়ে চলে যাচ্ছে।
তারা অস্ত্র ও সারমিক উপকরণ হারাচ্ছে; সেইসঙ্গে হারাচ্ছে নিজেদের দখলে থাকা সিরিয়ার ভূখণ্ড। ১৫টি ফ্রন্টের মধ্যে সিরিয়ার সেনারা ১০টি ফ্রন্টে হামলা চালিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।
এ তথ্য দিয়েছেন খোদ রুশ সামরিক বাহিনীর চিফ অব জেনারেল স্টাফ জেনারেল ভ্যালেরি গেরাসিমভ। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে- সিরিয়ার সেনারা এখন মনোবলের দিক দিয়ে তুঙ্গে রয়েছে এবং যুদ্ধে বিজয়ের ব্যাপারে নিজেদের সক্ষমতার ওপরে আস্থা রাখছে।
আন্তর্জাতিক নানা ডামাডোলের মধ্যেও রাশিয়ার বিমান বাহিনী তাদের লক্ষ্য সুস্থির রেখেছে। প্রতিদিন তারা বিমান হামলা চালাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ- ২২ জানুয়ারি থেকে পরবর্তী ৭২ ঘন্টায় রুশ যুদ্ধবিমানগুলো ১৬৯ দফা অভিযানে সন্ত্রাসীদের ৪৮৪টি অবস্থানে হামলা চালিয়েছে। এছাড়া, গত ১০ দিন ধরে রুশ বিমান বাহিনী প্রতিদিন সিরিয়ার বাহিনীর সমর্থনে ১০০’র বেশি বড় বড় হামলা চালাচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে আশা করা যাচ্ছে- ফলাফল দেখতে আর বেশি সময় লাগবে না। শুধু চলতি সপ্তাহে সিরিয়ার বাহিনী লাতাকিয়া প্রদেশের ২৮টি এলাকা মুক্ত করেছে। এ প্রদেশের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ শহর ‘রাবিয়া’ যা ছিল সন্ত্রাসীদের সর্বশেষ শক্ত ঘাঁটি, তাও মুক্ত করা হয়েছে।
গত ১৫ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ২১৭টি এলাকা হতে উগ্র সন্ত্রাসীরা পালাতে বাধ্য হয়েছে। অবশ্য, রুশ কর্মকর্তারা বার বার বলছেন, পাইলটদেরকে বিমান অভিযানে পাঠানোর আগে কয়েক দফায় সন্ত্রাসীদের অবস্থান নিশ্চিত হন তারা। তারা এও বলছেন, কোনো অভিযানে বেসামরিক লোকজন মারা যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে -এমন অবস্থা থাকলে সে অভিযান বাতিল করা হয়।
এক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে- সিরিয়ার সেনারা ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে ৩০ জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ে নিজেদের দখলে থাকা এলাকা ১.৩ ভাগ বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। এর আগে সিরিয়ার সরকার শুধু ভূমি হারাচ্ছিল এবং ভবিষ্যত পরিস্থিতি দিন দিন জটিল হয়ে উঠছিল।
কিন্তু রুশ হামলা শুরুর পর যুদ্ধপরিস্থিতি দ্রুতই সিরিয়ার বাহিনীর পক্ষে ঘুরে গেছে। যার কারণে ফ্রন্টলাইনেও স্থিতিশীলতা এসেছে; ফলে সরকারের টিকে থাকার ব্যবস্থা পোক্ত হয়েছে। একজন গবেষক বলেছেন, সিরিয়া পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি হচ্ছে কিন্তু তা ‘সুদৃঢ়’।
হ্যা, এ কথা সত্য যে- আইএস এখনো সন্ত্রাসী রিক্র্যুট করছে, অস্ত্র ও অন্যান্য রসদের সরবরাহও রয়েছে, তবে তার বেশিরভাগই তুর্কি সীমান্ত দিয়ে চোরাইপথে চলছে। তবে এটি কোনোমতেই কৌশলগত অগ্রগতি নয়।
সন্ত্রাসীদের অস্ত্র সরবরাহ বন্ধের জন্য রাশিয়া অনেক উন্নত অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, স্টেট অব দ্যা আর্ট ফাইটার জেট এবং দূরপাল্লার বোমারু বিমান। যদিও এসব সরঞ্জাম স্বল্পমাত্রায় মোতায়েন করা হয়েছে তবে তা যে খুব যুঁৎসই এবং কর্মক্ষম তা এরইমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে।
যে ক্ষতির মুখে পড়েছে আইএস:
৩০ সেপ্টেম্বর থেকে বিমান হামলা শুরুর পর রুশ বাহিনী এ পর্যন্ত সিরিয়ায় সন্ত্রাসীদের অবস্থানে ৬,০০০ বার বিমান হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রবাহী ও বোমারু বিমান থেকে ১৪৫ দফা হামলা হয়েছে। আর সমুদ্র ও বিমান থেকে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র মারা হয়েছে ৯৭টি।
রাশিয়ার চিফ অব দ্যা মেইন অপারেশনাল ডিরেক্টরেট অব দ্যা জেনারেল স্টাফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল সের্গেই রুদস্কয় এসব তথ্য দিয়েছেন।
তিনি জানিয়েছেন, ১০০ দিনের বেশি সময়ে সন্ত্রাসীদের কাছ থেকে ২১৭টি জনবহুল এলাকা ও ১,০০০ বর্গকিলোমিটার ভূমি মুক্ত করা হয়েছে। রুশ বাহিনীর বিমান হামলায় সিরিয়ায় সন্ত্রাসীদের কমান্ড সেন্টার ও সাপ্লাই চ্যানেল ধ্বংস হওয়ার কারণে তারা জ্বালানি, অস্ত্র ও রসদ সংকটে পড়েছে।
পেছনের আরো কথা:
মজার বিষয় হচ্ছে- রাশিয়া শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই বিজয়ী হচ্ছে না বরং সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে আন্তর্জাতিক শান্তি প্রক্রিয়া শুরু করাতে সক্ষম হয়েছে। শুধু তাই নয়, সিরিয়ার পক্ষে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ২২৫৪ নম্বর প্রস্তাবও পাস করা সক্ষম হয়েছে।
এ প্রক্রিয়ায় সবার অংশগ্রহণে সিরিয়ায় যুদ্ধবিরতি হবে, প্রেসিডেন্ট ও সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং স্থায়ী শান্তি ফিরে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি, সিরিয়ায় সন্ত্রাসীদের দখলে থাকা শহর ও নগরে আটকে পড়া বেসামরিক লোকজনের জন্য মানবিক ত্রাণ তৎপরতাও চালাচ্ছে রাশিয়া।
পরিস্থিতি যা তাতে সবকিছু ঠিক থাকলে রুশ নেতৃত্বাধীন জোটের বিজয় অনেকটা সময়ের ব্যাপার। এ বিজয় অর্জিত হলে মধ্যপ্রাচ্যে রাজনীতির সামগ্রিক চিত্র পাল্টে যেতে পারে। তখন সবচেয়ে সংকটে পড়বে রাজতান্ত্রিক আরব দেশগুলো।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, রেডিও তেহরান
এমকে





