বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তির বিরোধী নন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ঢাকা সফর থেকে ফিরে মোদিকে লেখা এই চিঠিতে মমতা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে জটিলতা কাটাতে প্রস্তুত তিনি।
বুধবার কলকাতা থেকে প্রকাশিত আনন্দবাজার পত্রিকায় একটি প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
‘তিস্তা-জট কাটাতে চেয়ে মোদীকে চিঠি মমতার’ শিরোনামে প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছে।
পাঠকদের জন্য প্রতিবেদনটির অংশ বিশেষ তুলে দেওয়া হলো।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ থেকে ফিরেই মমতা নিজে তাঁর সফরের খুঁটিনাটি জানিয়ে চিঠি লিখেছেন প্রধানমন্ত্রীকে। সেই চিঠিতে বলা হয়েছে, তাঁর সফর ইতিবাচক হয়েছে। তিস্তা চুক্তি নিয়ে তিনি যে হাসিনাকে আশ্বাস দিয়েছেন, সে কথাও প্রধানমন্ত্রীকে জানাতে ভোলেননি মমতা।
মুখ্যমন্ত্রী লিখেছেন, পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ জলের ভাগ নিয়ে দু’পক্ষেরই কিছু দাবি-দাওয়া রয়েছে। এই চুক্তি নিয়ে যে জট পাকিয়েছে, তা আলোচনার মাধ্যমেই কাটিয়ে ফেলা সম্ভব। এ বিষয়ে সহযোগিতার প্রস্তাবও দিয়েছেন মমতা। সরকারি সূত্রের খবর, ৯ তারিখে মোদী-মমতা বৈঠকেও তিস্তা চুক্তি ও বাংলাদেশ সংক্রান্ত বিষয়গুলি উঠবে।
আনন্দবাজার প্রতিবেদনটিতে বলে, তিস্তা চুক্তি বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকারের ভাবমূর্তি অনেকটাই বাড়িয়ে দেবে বলে মনে করা হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকারের সামনে এখনই নির্বাচন নেই।
গত বছর নির্বাচনের আগে যখন এই চুক্তি করার বিশেষ প্রয়োজন ছিল, তখনই এ দেশে কেন্দ্র-রাজ্য বিবাদে আটকে যায় বিষয়টি। তবে পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন আসন্ন। আগামী বছর মে মাসের মধ্যে ভোট হওয়ার কথা। সে ক্ষেত্রে ২০১৬ সালের গোড়ায় মমতা তিস্তা চুক্তির বিষয়ে সবুজ সঙ্কেত দিতে পারেন বলে কূটনীতিকদের একটা অংশ মনে করছেন। আবার কারও কারও ধারণা, কলকাতা ও অন্য পুর নির্বাচনগুলিতে সাফল্য এলে মমতা নির্ধারিত সময়ের আগে এ বছরের শেষেই বিধানসভা ভোটে যেতে পারেন। সে ক্ষেত্রে আরও আগে তিনি এই চুক্তি নিয়ে রাজি হয়ে যেতে পারেন।
আনন্দবাজারের প্রতিবেদনে বলা হয়, মমতা এ বছরেই তিস্তা চুক্তি নিয়ে সবুজ সঙ্কেত দিয়ে দিতে পারেন। কিন্তু, রাজ্য বঞ্চিত হবে এই যুক্তিতে এত দিন মমতা যে তিস্তা চুক্তির বিরোধিতা করে এসেছেন, কোন যুক্তি তুলে আবার সেটিকে মেনে নেবেন, তা নিয়ে কৌতূহলী সকলেই।
সূত্রের খবর, মমতা শেখ হাসিনাকে বলেছেন তিনি তিস্তা চুক্তির বিরুদ্ধে নন। কিন্তু ইউপিএ জমানায় রাজ্যের সঙ্গে কোনও আলোচনা না-করে কেন্দ্র যে ভাবে চুক্তিটি করতে চলেছিল, তাতে এ বাংলার উত্তরাঞ্চলের কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হতেন। কেন্দ্রের সচিবরা অনেক বুঝিয়েও তাঁকে এ বিষয়ে নরম করতে পারেননি।
বাংলাদেশের তৎকালীন বিদেশমন্ত্রী দীপু মণি তাঁকে বোঝাতে কলকাতায় এলে তাঁর সঙ্গে মমতার কথা কাটাকাটি হয়। এর ফলে তিস্তা চুক্তিও বিশ বাঁও জলে চলে যায়। এ বারে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল কলকাতায় গিয়ে মমতার সঙ্গে কথা বলেছেন।
দিল্লিতে রাষ্ট্রপতি ভবনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদের সম্মানে আয়োজিত নৈশভোজেও মমতার সঙ্গে ডোভালের বাংলাদেশ নিয়ে কথা হয়। মমতার বক্তব্য, তিস্তার জলের ভাগ কী হবে, তা নিয়ে আলোচনা হোক। এই আলোচনার মাধ্যমেই একটি সন্তোষজনক সমাধানে পৌঁছনো যাবে।
মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, এর আগে ইউপিএ আমলে চুক্তির খসড়া তৈরির সময়ে দেশের নিরাপত্তার যুক্তি তুলে রাজ্যের প্রয়োজনের বিষয়টি খারিজ করে দেওয়া হয়েছিল।
আনন্দবাজার পত্রিকা তাদের প্রতিবেদনে আরও জানিয়েছে, সব ঠিক থাকলে এপ্রিল মাসেই ঢাকা সফরে যেতে চান প্রধানমন্ত্রী। বিদেশসচিব এস জয়শঙ্করের হাত দিয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে একটি চিঠিও পাঠিয়েছেন মোদী। সেখানে তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ সফরের জন্য তিনি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে আছেন।
মোদী হাসিনাকে জানিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীকে সঙ্গে নিয়েই ঢাকায় যেতে চান তিনি। ১৯৯৬-এর ১২ ডিসেম্বর দিল্লিতে হাসিনার সঙ্গে গঙ্গার জলবণ্টন নিয়ে চুক্তি করার সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এইচ ডি দেবগৌড়া যে ভাবে পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুকে সঙ্গে রেখেছিলেন, তিস্তা চুক্তিতেও মমতাকে ঠিক একই ভাবে সঙ্গে নিয়ে চলতে চাইছেন মোদী। এই নীতি মেনেই শ্রীলঙ্কার সঙ্গে আলোচনা প্রক্রিয়াতেও তিনি তামিলনাড়ুকে সঙ্গে রাখছেন।
তবে বুধবার বিকালে সাংবাদিক সম্মলনে এক প্রশ্নের উত্তরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, তিস্তা নিয়ে এখনও মোদী সরকারের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি।
পরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে মমতা বলেন, বাংলাদেশ সফরের আগে বিদেশমন্ত্রী কয়েকটি বিষয় নিয়ে ফোন করেছিলেন আমাকে। রাজনীতি নিয়ে বিরোধিতা থাকলেও সরকার চালাতে গেলে সরকারী বিষয়ে সেসব আসে না। নান বিষয়ে আমরা তাদেরকে জানাই। তারাও নিয়মিত আমাদের নানা বিষয়ে জানান। তাই বাংলাদেশ সফর নিয়ে আমি আমার অভিজ্ঞতা প্রধানমন্ত্রী এবং বিদেশমন্ত্রীকে জানিয়েছি।
এমকে





