সাম্যবাদের স্বপ্নদ্রষ্ট্রা বিপ্লবী ফিদেল ক্যাস্ত্রোর মৃত্যুতে যখন শোকাহত বিশ্ব ঠিক তখনই যেন ফিদেলহীন পৃথিবীতে স্বস্তি খুঁজছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। শনিবার দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, পলিটিকোসহ বিখ্যাত মার্কিন গণমাধ্যমগুলোর শিরোনাম ছিল, ‘ফিদেল ক্যাস্ত্রোর মৃত্যু, ৫০ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রকে অবজ্ঞা করেছিলেন যিনি।’
৯০ বছরের জীবনে ফিদেল কাস্ত্রোকে ৬৩৮ বার হত্যার চেষ্টা করে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর চরেরা এই চেষ্টা চালায়। হত্যার ষড়যন্ত্র বেশির ভাগই করা হয় তাঁর শাসনামলের শুরুতে। বহু বিদ্রোহের পর কিউবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১৯৫৯ সালে দায়িত্ব নেন ফিদেল কাস্ত্রো। ২০০৮ সালে তাঁর ভাই রাউল কাস্ত্রোর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে বিদায় নেন ফিদেল।
কাস্ত্রোকে হত্যার চেষ্টা বেশির ভাগই হয় ১৯৫৯ থেকে ১৯৬৩ সালের মধ্যে। এ সময়ে পাঁচটি ভাগে সিআইএ, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষাবাহিনী ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র বিভাগ তাঁকে হত্যার বিভিন্ন চেষ্টা চালায়। তাঁকে কিউবার সিংহাসন থেকে নামাতে নেওয়া হয় ‘অপারেশন মঙ্গুজ’পরিকল্পনা।
ফেবিয়ান এসকালান্তে ফিদেলের নিরাপত্তারক্ষী ছিলেন। ৪৯ বছরের শাসনামলে পুরো সময় তাঁর নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন তিনি। তাঁর তথ্যমতে, ৬৩৮ বার কাস্ত্রোকে হত্যার চেষ্টা করে সিআইএ। প্রতিটি ষড়যন্ত্র ছিল অভিনব।
এসব ষড়যন্ত্রের মধ্যে জটিল ছিল কাস্ত্রোর চুরুটের মধ্যে বিস্ফোরক দ্রব্য রাখা। নিউইয়র্কের এক পুলিশ কর্মকর্তা কাছ থেকে এই ফন্দি নেয় সিআইএ। ওই চুরুটের মধ্যে যে পরিমাণ বিস্ফোরক দ্রব্য রাখা হয়, তা তাঁর মাথা উড়িয়ে দেওয়ার মতো। এ ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়। কাস্ত্রোকে দুর্বল করতে একবার তাঁর জুতো ও চুরুটের মধ্যে রাসায়নিক দ্রব্য রাখা হয়। এর প্রভাবে তাঁর শরীরের সব চুল পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। বিভিন্ন সময়ে তাঁর খাবারে বিষ রেখে হত্যার চেষ্টা করা হয়। তাঁর ব্যবহৃত কলমে বিষযুক্ত সুচ রেখে ও পোশাকে জীবাণু ছড়িয়েও তাঁকে হত্যার চেষ্টা চালায় সিআইএ।
সিআইএর আরেকটি ষড়যন্ত্র ছিল সাবেক স্ত্রী মিরতাকে হাত করে কাস্ত্রোকে হত্যার চেষ্টা। বিষযুক্ত ক্যাপসুল দিয়ে তাঁকে হত্যা করার ফন্দি আঁটা হয়। কোল্ডক্রিমের কৌটায় রাখা হয় এই ক্যাপসুল। কিন্তু এ ষড়যন্ত্রের কথা জেনে ফেলেন কাস্ত্রো। তিনি মিরতার হাতে পিস্তল তুলে দিয়ে তাঁকে বিষ দিয়ে নয়, সরাসরি গুলি করে হত্যা করতে বলেন। মিরতা তা পারেননি।
শুধু হত্যার চেষ্টাই নয়, কাস্ত্রোর ভাবমূর্তি নষ্ট করার চেষ্টাও কম করেনি সিআইএ। একবার এক বেতারকেন্দ্রে সাক্ষাৎকার দিচ্ছিলেন ফিদেল। এ সময় স্টুডিওতে নেশাজাতীয় দ্রব্য ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এর প্রভাবে অদ্ভুত আচরণ করেন ফিদেল। বিচলিত হয়ে পড়ে পুরো কিউবা। তবে এবারও ব্যর্থতার পাল্লা ভারী হয় সিআইএর।
প্রেসিডেন্ট হিসেবে শাসনামলের শেষের দিকে ২০০০ সালে পানামা সফরে যান কাস্ত্রো। সেখানেও তাঁকে হত্যার চেষ্টা করা হয়। একটি মঞ্চে বক্তৃতা দেওয়ার কথা ছিল তাঁর। সেই মঞ্চে ভাষণ ডেস্কে ৯০ কেজি বিস্ফোরকদ্রব্য রাখা হয়। কাস্ত্রোর নিরাপত্তাকর্মীরা এই চেষ্টা ব্যর্থ করে দেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে পৃথিবীজুড়ে আধিপত্য কায়েম করা মার্কিন সাম্রাজ্যের তীব্র নিন্দা করেছিলেন ফিদেল। যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি করা নতুন নতুন যুদ্ধক্ষেত্র, অসম বাণিজ্য চুক্তি, জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফকে ব্যবহার করে সাহায্যের আড়ালে অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে মার্কিন নির্ভরশীলতায় অভ্যস্ত ও দেনার দায়ে জর্জরিত করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদি হয়েছিলেন ক্যাস্ত্রো।
১৯৫৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রপন্থি সরকারের পতন ঘটিয়ে বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতায় আরোহণ করেন তিনি। কমিউনিজম প্রতিষ্ঠার পর মার্কিন সরকার তাকে ‘শয়তান’ও অত্যাচারী বলে আখ্যায়িত করে ও মার্কিন আগ্রাসনের মাধ্যমে ক্ষমতা থেকে অপসারণ করার চেষ্টা চালায়। কিন্তু মার্কিন সরকারের নাকের ডগায়ই সফলভাবে দেশকে নেতৃত্ব দেন তিনি। ২০০৬ সালে অন্ত্রনালীর রোগে আক্রান্ত হয়ে ভাই রাহুল ক্যাস্ট্রোকে ২০০৮ সালে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন।
২০১৪ সালের ১৭ ই ডিসেম্বর মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ১৯৬১ সালে ছিন্ন হওয়া কূটনৈতিক সম্পর্ক আবার গড়ে তোলার আশা ব্যক্ত করলে সেটিকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করেন ক্যাস্ত্রো।
তিনি বলেন, মার্কিন সাম্রাজ্য থেকে আমাদের কোন উপহারের প্রয়োজন নেই। ১১ কোটি মানুষের ক্যারাবিয়ান দ্বীপের এই রাষ্ট্রপ্রধান ২০ শতকের জনপ্রিয় বৈশ্বিক নেতা ছিলেন। রাণী এলিজাবেথ ছাড়া অন্য যে কোন নেতার তুলনায় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন তিনি। ২৬ নভেম্বর, ২০১৬ সালে দৈহিকভাবে পৃথিবী থেকে বিদায় নেন ১৯২৬ সালে জন্মগ্রহণ করা এই নেতা।
কাস্ত্রোকে হত্যার ষড়যন্ত্র নিয়ে পরবর্তী সময়ে একটি প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করে যুক্তরাজ্যভিত্তিক চ্যানেল ফোর। ‘৬৩৮ ওয়েজ টু কিল কাস্ত্রো’নামের ওই প্রামাণ্যচিত্রে দেখানো হয়কত কৌশলে তাঁকে হত্যার চেষ্টা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০০৬ সালে যুক্তরাজ্যে সম্প্রচার করা হয় এটি।
এআই





