পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূলদলীয় সংসদ সদস্য তাপস পাল বিরোধীদলের উদ্দেশে যে অশালীন মম্তব্য করেছেন তা নিয়ে সারা দেশে তোলপাড় শুরু হয়েছে। বিরোধী দলের নারীদের ধর্ষণের হুমকি সম্বলিত ভিডিও ফুটেজ একটি বেসরকারি টেলিভিশনে প্রকাশ হওয়ার একদিন পর দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চাইলেন তাপসের স্ত্রী নন্দিনী পাল।
মঙ্গলবার সকালে তিনি বলেন, "বিরোধী দলের মহিলাদের ‘রেপ করিয়ে’ দেয়ার যে হুমকি দিয়েছেন তাপস,তা তার উচিত হয়নি।" এর আগে সোমবার নন্দিনী পাল তার ফেসবুকে লিখেন, ‘আমি নীরবে কেঁদেছি। নিজের মধ্যে কেঁদেছি। কোনও আশা নেই জেনেই কেঁদেছি।’
কী বলেছেন তাপস?
গত ১৫ জুন নিজের নির্বাচনী কেন্দ্র কৃষ্ণনগরের নাকাশিপাড়ার হরনগর গ্রামে নিহত তৃণমূল কর্মী আসাদুল মণ্ডলের স্মরণসভায় যোগ দিতে যান অভিনেতা তাপস পাল। ওই সভায় আসার পথে দুর্ঘটনায় আহত হন নাকাশিপাড়ার শেষ সীমানা চৌমাহা গ্রামের কয়েকজন তৃণমূল কর্মী-সমর্থক। এ খবর শুনে স্মরণসভা থেকে সোজা চৌমাহা গ্রামে চলে যান তাপস।
সেখানে উত্তেজিতভাবে তিনি বলেন, “আমি প্রচুর মস্তানি করেছি। একটা কেউ বিরোধী যদি মস্তানি করতে আসে, আমাদের ছেলেদের ঢুকিয়ে রেপ করে দেব! এই তাপস পাল ছেড়ে কথা বলবে না। তাপস পাল নিজের রিভলভার বের করে গুলি করে মারবে!”
মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় ধারণ করা তাপস পালের ওই বক্তব্য সোমবার একটি বেসরকারি টেলিভিশনসহ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ হলে রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়।
তৃণমূল মহাসচিবের প্রতিক্রিয়া
বিরোধীদের খুন, ধর্ষণ করানোর হুমকির মতো গুরুতর অভিযোগ উঠায় তাপস পালকে সভা-সমাবেশে এ ধরনের ভাষা প্রয়োগে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন দলের শীর্ষ নেতা পার্থ চ্যাটার্জি।
রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী, তৃণমূল কংগ্রেসের মহাসচিব পার্থ চ্যাটার্জি বলেছেন, "উত্তেজনার বশে তিনি যে ভাষা ব্যবহার করেছেন, তাতে সংযত হওয়া উচিত ছিল। এই বক্তব্য কখনোই অনুমোদন করতে পারি না। এটা ঠিক হয়নি, অন্যায় হয়েছে। তাপস পালের সঙ্গে দেখা হলে কথা বলব।"
তিনি আরো বলেন, "তৃণমূল কংগ্রেস সংসদ সদস্যদের কাছে মানুষ অনেক সহনশীলতা আশা করেন। দলীয় নেতার এমন ভাষা হতে পারে বলে মনে হয় না। তবে বিরোধীরা এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে, যার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে এই মম্তব্য করেছেন তিনি। কোন্ পরিস্হিতিতে, কোন্ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বলেছেন, সেটাও দেখা দরকার।"
কৈফিয়ত তলব তৃণমূলের
তাপস পালের মম্তব্যের প্রেক্ষিতে তার কাছে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কৈফিয়ত তলব করেছে তৃণমূল। তৃণমূলের মুখপাত্র ডেরেক ও’ব্রায়েনও বলেছেন, "এ ধরনের অসংবেদনশীল মন্তব্য আমাদের দল কখনোই অনুমোদন করে না। স্বাভাবিক ন্যায়বিচারের নীতি অনুযায়ী যে কোনও ব্যক্তিকেই আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তাপসকেও লিখিতভাবে জবাবদিহি করতে হবে। এর বেশি কিছু বলতে পারব না।”
তৃণমূল সূত্রে বলা হয়েছে, আজ অথবা আগামীকাল দলের সংসদীয় কমিটির পূর্বনির্ধারিত বৈঠকেই তাপসের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি।
কংগ্রেস-বিজেপির প্রতিক্রিয়া
এদিকে, তাপস পালের মন্তব্যকে 'খুবই দুর্ভাগ্যজনক' বলে মম্তব্য করেছে কংগ্রেস। প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরী বলেছেন, এমন কুরুচিকর কথা বলার পর তাপসের আর জনপ্রতিনিধি থাকার নৈতিক অধিকারই নেই।
তৃণমূল নেতাদের মুখে এমন কথা স্বাভাবিক বলে মন্তব্য করেও বিজেপি'র রাজ্য সভাপতি রাহুল সিংহের দাবি, সংসদ সদস্য থাকার যোগ্যতা হারিয়েছেন তাপস। আর তৃণমূলেরও উচিত অবিলম্বে তাকে সংসদ সদস্য পদ থেকে সরানো।
অন্যদিকে, এ পি ডি আর বলেছে, সংসদ সদস্যসহ সব পদ থেকে এখনই তাপস পালকে সরাতে হবে। তৃণমূল সাংসদকে গ্রেফতারের দাবি তুলেছে সি পি আই (এম এল) লিবারেশনের নেতা পার্থ ঘোষ।
উল্লেখ্য, তাপসের মুখে এ ধরনের লাগামহীন মন্তব্য নতুন নয়। ২০০৯ সালে প্রথমবার সংসদ সদস্য হওয়ার পরেই আগস্ট মাসে নাকাশিপাড়াতেই এক ধর্ষণের ঘটনা নিয়ে তৎকালীন শাসক দলের বিরুদ্ধে তিনি বলেন, “যারা ধর্ষণ করেছে, তাদের হাতের কাছে পেলে পিটিয়ে মেরে ফেলুন। আমি তাপস পাল বলছি।”
এরপর গত বছর জুলাই মাসে তেহট্টে পঞ্চায়েত নির্বাচনের প্রচারে গিয়ে তার মন্তব্য, “সিপিএম বদমাইশের দল, শয়তানের দল, জঘন্য দল। এদের জুতিয়ে সোজা করে দিতে হবে। যেখানে সিপিএমকে দেখবেন, ধরে কেলানি দেবেন।”
এদিকে, তীব্র সমালোচনা ও চাপের মুখে তাপস পাল তার সুর নজর করলেও দোষ স্বীকার করতে রাজি হননি। তার দাবি- তিনি ‘রেপ’নয় ‘রেড’বলেছিলেন। সূত্র: আইআরআইবি
ঢাকা, ০১ জুলাই (টাইমনিউজবিডি.কম) //এমএ





