পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলায় এক রাতে তিন গ্রামবাসী নিহত হওয়ার পর সেখানে এখন চরম উত্তেজনা ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। পবিত্র রমজান মাসে সংঘটিত এ ঘটনায় সংখ্যালঘু মুসলিমরা কার্যত হতভম্ব হয়ে গেছে।
রোববার গভীর রাতে বর্ধমানের খন্ডঘোষ থানা এলাকার দুটি গ্রামে দুষ্কৃতিদের হাতে নৃশংসভাবে খুন হয় শেখ জামালউদ্দিন (৪৪) এবং শেখ শওকত (৪৫) এবং আয়নাল লায়েক (৪৫)। প্রথম দু’জনের বাড়ি ওয়াড়ি গ্রামে। তৃতীয় জনের বাড়ি উজ্জ্বলপুকুর গ্রামে। এদের বাড়ি থেকে ডেকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে এবং গুলি করে হত্যা করা হয়।
নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে রাজ্যে ক্ষমতাসীন তৃণমূলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব কাজ করছে বলে জানা গেছে। গত চার বছরে গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের জেরে পশ্চিমবঙ্গে শতাধিক তৃণমূল কর্মী-সমর্থক খুন হয়েছেন। তৃণমূলের সাবেক ব্লক প্রেসিডেন্ট মোয়াজ্জেম হোসেন মণি এবং অলোক মাঝি গোষ্ঠীর মধ্যে বিবাদের জেরে এই হত্যার ঘটনা বলে অনেকেই মনে করছেন। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশের অনুমান- অবৈধ বালি খাদানের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিবাদের জেরে এমন ঘটনা ঘটতে পারে।
পুলিশ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ৪৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছে। এ ঘটনায় পুলিশ মোট ১৮ জনকে গ্রেফতার করেছে। এদের অধিকাংশই নিরীহ বলে গ্রামবাসীরা দাবি করেছেন।
মঙ্গলবার ধৃতদের বর্ধমান জেলা আদালতে তোলা হলে ৫ জনকে পুলিশ রিমান্ড এবং অন্য ১৩ জনকে জেল হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন বিচারপতি সেলিম আনসারি।
এদিকে, দুষ্কৃতি হামলায় হত্যার ঘটনার পর এখন ওই এলাকার দখল নিয়েছে পুলিশের বিশেষ বাহিনী। পুলিশ নির্বিচারে ধরপাকড় চালাচ্ছে বলে গ্রামবাসীর অভিযোগ। ধরপাকড়ের ভয়ে পুরুষদের পাশাপাশি অনেক মহিলারাও গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র গা ঢাকা দিয়েছে। মাঠে লুকিয়ে থাকা ওয়াড়ি গ্রামের বাসিন্দা আনোয়ার মণ্ডল মঙ্গলবার জানান, ‘পুলিশ যাকে সামনে পাচ্ছে, তুলে নিয়ে যাচ্ছে। প্রাণ বাঁচাতেই লুকিয়ে রয়েছি।’
বয়ষ্ক পুরুষ এবং মহিলারা যারা অন্যত্র যেতে পারেননি তারা বাড়ির সদর দরজা বন্ধ করে বাড়িতে রয়েছেন। গোটা এলাকা জুড়ে র্যাফ জওয়ানরা টহল দিচ্ছে।
স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নাসের লায়েককে পুলিশ গ্রেফতার করায় স্কুলের পঠনপাঠন বন্ধ হয়ে গেছে। আতঙ্কে কোনো ছাত্র-ছাত্রী স্কুলে যেতে চাচ্ছে না। বাসিন্দাদের দাবি, ওই স্কুল শিক্ষক কোনোভাবেই এ ঘটনার সঙ্গে যুক্ত নন। তাকে অন্যায়ভাবে গ্রেফতার করা হয়েছে। আসল অপরাধীরা আগেই এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গেছে।
গ্রামবাসী নজরুল লায়েক এবং ইয়াসমিন আরা বেগম জানান, ‘ঘটনার পর থেকে আতঙ্কে ভুগছে গোটা গ্রাম। ভয়ে কেউ গ্রামে থাকতে পারছে না। রমজান মাসে এমন ঘটনাতে আমরা খুবই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছি।’
পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়ার আশঙ্কায় রোজাদাররা সেহরি খেতে এবং ইফতার করতে ব্যাপক সমস্যায় পড়েছেন। পুলিশের ডিএসপি (হেডকোয়াটার) মাকসুদ হাসান অবশ্য অভয় দিয়ে বলেছেন, ‘রোজাদারদের রোজা রাখা বা নামাজ পড়ার কোনো অসুবিধা হবে না। আমরা পুরো ঘটনার ওপর নজর রেখেছি।’ তিনি মসজিদে ইফতারও করেছেন। যদিও নিরীহদের ধরপাকড়ের ঘটনায় গ্রামবাসীরা বেশ আতঙ্কেই রয়েছেন।
ইআর





