এশিয়ার দুই পরাশক্তির দেশ ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছাড়িয়ে পড়েছে। সীমান্তে বিরাজ করছে যুদ্ধাবস্থা। ভারতের গুপ্তচর ড্রোন গোপনে দু'দেশের সীমানার ছবি তোলা এবং সেটাকে ভূপাতিত করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

এদিকে, নতুন করে দু'দেশের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টির ফলে ২০১৬ সালে সার্ক সম্মেলনে যোগ দিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পাকিস্তান সফর নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

ভারতীয় গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, সে দেশের গুপ্তচর ড্রোন গোপনে ভারত-পাকিস্তান সীমানার ছবি তুলছিল। যা ভেস্তে দিতেই পাক সেনারা গুলি চালিয়ে ড্রোনটিতে নীচে নামায়।

তবে ড্রোনটি ভারতের নয় বলে দাবি করেছে ভারতীয় সেনা। বুধবারের এই ঘটনার পর থেকেই দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনার পারদ ক্রমশ চড়তে শুরু করেছে।

সপ্তাহখানেক আগেই রাশিয়ার উফায় দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে বরফ গলার ইঙ্গিত মিলেছিল। যদিও আদৌ তা বাস্তবায়িত হবে কি না তা নিয়ে প্রথম থেকেই জল্পনা ছিল।

পর পর দু’দিন ‘স্পাই ড্রোন’ ইস্যুতে জম্মু কাশ্মীর সীমান্তে পাক সেনার গুলি চালানোর ঘটনায় এই বৈঠকের ভবিষ্যৎ নিয়ে জল্পনা আরও বেড়ে গেল।

ভারতের গণমাধ্যমের আরো অভিযোগ, বুধবার জম্মু-কাশ্মীরের আখনুর সেক্টরে সংঘর্ষ বিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করে পাক সেনারা গুলি চালায়। গুলিতে এক মহিলার মৃত্যু হয়। বৃহস্পতিবার আর এস পুরাতে পাক সেনার গুলিতে চার জন বাসিন্দা গুরুতর জখম হন।

যদিও পাক সেনার তরফে অভিযোগ আনা হয়েছে পাক অধিকৃত কাশ্মীরের ভিমবার অঞ্চলের উপরে ভারতীয় সেনা ড্রোন উড়িয়ে ছবি নিচ্ছিল। সেই ড্রোনটিকেই তারা গুলি করে নীচে নামায়।

এই অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করা হয়েছে ভারত সেনার তরফে। কৈফিয়ত চেয়ে পাকিস্তানে ভারতীয় রাষ্ট্রদূতকে ইসলামাবাদে ডেকে পাঠানো হয়েছে।

কারণ ব্যাখ্যা করতে প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের মুখপাত্র মনীশ মেহতা এ দিন বলেন, ‘‘বুধবার গভীর রাতে পাক সেনা অনধিকার প্রবেশ করছিল। ভারতীয় সেনা তাদের বাধা দিলে তারা গুলি চালায়।’’

উল্লেখ্য, গত ১০ জুলাই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ রাশিয়া অনুষ্ঠিত সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের (এসসিও) সম্মেলনের ফাঁকে এক বৈঠক করেন।

দেড় ঘণ্টার এই বৈঠকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে ইসলামাবাদ সফরের আমন্ত্রণ জানান। প্রত্যুত্তরে মোদি নওয়াজকে জানান, ২০১৬ সালে সার্ক সম্মেলনে যোগ দিতে পাকিস্তান যাচ্ছেন তিনি।

এদিকে নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠকের পর প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে কাশ্মির প্রসঙ্গের কোনো উল্লেখ না থাকায় পাকিস্তানের মিডিয়া ও রাজনৈতিক মহলে প্রবল সমালোচিত হন নওয়াজ শরিফ।

ওই বিবৃতিতে সন্ত্রাসবাদের কথা ছিল। মুম্বাই হামলা সংক্রান্ত মামলার বিচার দ্রুত এগিয়ে নেয়ার প্রসঙ্গও ছিল। কিন্তু কাশ্মিরের কোনো উল্লেখই না থাকায় বিরোধী শিবিরের ক্ষোভের মুখে পড়তে হয় পাক প্রধানমন্ত্রীকে।

প্রাক্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী তথা পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ নেতা শাহ মেহমুদ কোরেশি থেকে শুরু করে পাকিস্তান পিপলস পার্টির সিনেটর রেহমান মালিক-সকলেই কাশ্মির ইস্যুর কোনো উল্লেখই না থাকায় তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। কোরেশি বলেছেন, কাশ্মির বিবৃতিতে ঠাঁই পেল না! এটা বিস্ময়কর।

পাক থিঙ্কট্যাঙ্ক সেন্টার ফর পাকিস্তান অ্যান্ড গালফ স্টাডিজ-এর কর্ণধার সেনেটর সেহর কামরানও যৌথ বিবৃতির সমালোচনা করেছেন। তার বক্তব্য, বিবৃতিতে শুধু মুম্বাই হামলা মামলার কথা আছে। কিন্তু দীর্ঘদিনের বকেয়া কাশ্মির সমস্যার কোনো উল্লেখই নেই।

উপমহাদেশে স্থিতিশীলতা নষ্ট করায় ভারতের ভূমিকা তুলে ধরার একটা সুযোগ হাতছাড়া হলো। কাশ্মির পাকিস্তানের শিরায় বইছে। আঞ্চলিক শান্তি, স্থিতিশীলতার ভবিষ্যত কিন্তু নির্ভর করছে কাশ্মির সমস্যার সমাধানের ওপর।

অন্যদিকে, মোদি-নওয়াজের বৈঠক নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছে ভারতের হিন্দুত্ববাদী দল শিবসেনা। কংগ্রেসের পক্ষ থেকেও এই বৈঠক নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে তীব্র কটাক্ষ করা হয়েছে। শিবসেনা প্রধান উদ্ধব ঠাকরে মোদি এবং শরিফের মধ্যে বৈঠককে দুর্ভাগ্যজনক বলে আখ্যা দিয়েছেন।

তিনি বলেছেন, পরিস্থিতি এখনো পরিবর্তন হয়নি। কিন্তু আমি আশা করছি প্রধানমন্ত্রী মোদি পরিস্থিতি বদলাতে সক্ষম হবেন। তার উপর মানুষের বিশ্বাস রয়েছে। তিনি আরো বলেন, পাকিস্তানকে অবশ্যই সবক শেখাতে হবে। মিয়ানমারের মতো পদক্ষেপ পাকিস্তানেও নেয়া প্রয়োজন।

এদিকে, কংগ্রেস মুখপাত্র মীম আফজাল বলেছেন, এনডিএ সরকার পাকিস্তানের যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে যে পদক্ষেপ নেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তা রক্ষা করা হয়নি।

মীম আফজাল আরো বলেন, পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভারতকে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের হুমকি দেয়ার পরে দ্রুত মোদি এবং শরিফের মধ্যে আলোচনা অনুষ্ঠিত হলো। এতেই স্পষ্ট, আলোচনায় বসার আগে কী ধরনের বার্তা দিয়েছে পাকিস্তান।

এআর