‘আহ্’! সম্ভবত বিস্ময়ে হাঁ হয়ে যাওয়া কর্মকর্তারা এই শব্দটিই উচ্চারণ করতে পারেন। জর্ডান নদীর দুই পাড়ে থাকা যথাক্রমে হাশেমি রাজতন্ত্র আর ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ আসন্ন নির্বাচনে খুব সহজে জয়ী হবে বলে আশা করেছিল। কিন্তু তাদেরকে অবাক করে দিয়ে ইসলামপন্থী মুসলিম ব্রাদারহুডের স্থানীয় শাখাগুলো নির্বাচন বয়কটের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে।
ফলে পাল্টে গেছে নির্বাচনের সম্ভাব্য দৃশ্যপট। তারাই এখন বিজয়ী হতে যাচ্ছে। জর্ডানে বাদশাহের লোকজন অনুমান করছেন, জর্ডানে ব্রাদারহুডের রাজনৈতিক শাখা ইসলামিক অ্যাকশন ফ্রন্ট (আইএএফ) ২০ সেপ্টেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে একক বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হবে। পাশের ফিলিস্তিনে মন্ত্রীরা ধারণা করছেন, ব্রাদারহুডের ফিলিস্তিনি শাখা হামাস ৮ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় পশ্চিম তীরের আটটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সবগুলোতেই জয়ী হবে।
এটা হবে বড় ধরনের ঘটনা। ২০১৩ সালে মিসরে ব্রাদারহুডের মোহাম্মদ মুরসিকে প্রেসিডেন্ট পদ থেকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর তাদের ওপর যে অত্যাচারের স্ট্রিম রোলার নেমে এসেছিল, তাতে অনেকে মনে করেছিল, আরব বিশ্ব থেকে দলটি হারিয়ে যাবে বলে মনে হচ্ছিল। সেখান থেকে আজ তারা আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। মিসরে যে কায়দায় নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে উৎখাত করা হলো এবং পাশ্চাত্য যেভাবে এ প্রক্রিয়াকে সমর্থন দিলো তাতে তাদের প্রতি কোনো শ্রদ্ধাবোধ থাকার কথা নয়। বোঝায় যাচ্ছিল, পাশ্চাত্য সত্যিকার অর্থে গণতন্ত্র চায় না। তারা চায়, তাদের তাঁবেদার কাউকে।
এ কারণে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত মুরসিকে বাদ দিয়ে স্বৈরাচার সিসিকে সমর্থন দিতে তাদের বিবেক নড়েনি। আর ব্রাদারহুড নেতাকর্মীদের ওপর সর্বোচ্চ নির্যাতন চালানো হয়। এ থেকে রক্ষা পেতে দলটির নেতাকর্মীরা পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন, নির্বাচনী রাজনীতির প্রতি তাদের বীতশ্রদ্ধার সৃষ্টি হয়েছিল। পুরো অঞ্চল থেকে সুন্নি ইসলামি নেতারা ব্যালট বাক্স ত্যাগ করে ইউরোপ পাড়ি দিচ্ছিলেন। জর্ডানের বাদশাহ আবদুল্লাহ ব্রাদারহুডকে শয়তানি দল হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন, তার দেশে একে নিষিদ্ধ করেছিলেন (তবে মিসরের মতো সেখানে গণগ্রেফতারি চালানো হয়নি)। সৌদি আরবসহ অন্যান্য দেশেও মুসলিম ব্রাদারহুডের অবস্থা নাজুক হয়ে পড়েছিল। এখন ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস এবং বাদশাহ আবদুল্লাহ উভয়কেই আবার ইসলামপন্থীদের সাথে কাজ করতে হবে। এক জর্ডানি কর্মকর্তা এ প্রসঙ্গেই বলেছেন, ‘আমরা কায়রো নই।’
বিপ্লবের আওয়াজ তুলে এবং তা থেকে সামান্যই প্রাপ্তিযোগ হওয়ায় অনেক ইসলামপন্থী নির্বাচন যে সুযোগ দিচ্ছে, তা গ্রহণ করতে আগ্রহী। তবে আবদুল্লাহর বাবা বাদশাহ হোসেনের আমলে তারা ক্ষমতার সাথে যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক উপভোগ করেছিলেন, তেমনটা পাবেন বলে আশা করছেন না। অবশ্য জর্ডান ও পশ্চিম তীর উভয় স্থানে বিশৃঙ্খলা এবং ক্ষমতাসীন দলের কর্মকর্তাদের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব দেখা দেয়ায় ব্রাদারহুডের সম্ভাবনা জোরালো হয়েছে।
বিপরীত দিকে, আইএএফের সদর দফতরে কৌশলবিদ ও পরিসংখ্যানবিদেরা এখন নির্বাচনী প্রচারণা এবং সম্ভাব্য ফলাফল হিসাব করছেন। জর্ডানের ২৩টি নির্বাচনী এলাকার মধ্যে তারা প্রার্থী দিয়েছে ১৫টিতে। তাদের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীরা সামান্যই সুবিধা করতে পারবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আমেরিকান রাজনীতি বিজ্ঞানী সারটিস রাইয়ান বলেন, ‘ব্রাদারহুডেরই শুধু রাজনৈতিক সমর্থন আছে। তাদেরই আছে ভোট পাওয়ার মতো রাজনৈতিক প্লাটফর্ম এবং দেশজুড়ে সংগঠন।’
তাদের বাস্তব বুদ্ধিই তাদের এগিয়ে নিচ্ছে। জর্ডান ও পশ্চিম তীর উভয় স্থানেই কর্তৃপক্ষ ইসলামপন্থীদের কুপোকাত করার জন্য নির্বাচনী ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন এনে খ্রিষ্টান, সারক্যাসিয়ান ও নারীদের জন্য আনুপাতিক হারের চেয়ে অনেক বেশি আসন বরাদ্দ করেছিল। কিন্তু ইসলামপন্থীরা এ ক্ষেত্রেও তাদের হারিয়ে দিয়েছেন। তারা সংখ্যালঘুদের কাছে পৌঁছে গেছেন। আইএএফের তালিকায় পাঁচজন খ্রিষ্টান স্থান পেয়েছেন। হামাস তাদের বহুল ব্যবহৃত ‘প্রতিরোধ’ পরিভাষাটি একটু এড়িয়ে আব্বাসের দুর্নীতিগ্রস্ত ও অথর্ব ফাতাহ টেকনোক্র্যাটিক বিকল্প হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করেছে। তারা খ্রিষ্টান প্রার্থীদেরও মন জয় করেছেন। বর্ষীয়ান ইসলামপন্থী এবং জর্ডানের রাজপরিবারবিরোধী লেইথ শুবেলাত বলেন, ‘ব্রাদারহুড এখন শুধু আর ইসলামি দল হিসেবে নয়, জাতীয় দল হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে।’
বাদশাহ ও আইএএফ
এ নির্বাচন জনসাধারণের অনুভূতি প্রকাশের ব্যারোমিটার বিবেচিত হতে পারে। তবে এর বাস্তব প্রভাব থাকছে সামান্যই। জর্ডানে নির্বাচনের ফলাফল যা-ই হোক না কেন, তাতে যাতে সরকারের প্রভাব না কমে, তা নিশ্চিত করার জন্য পূর্ব তীরের বেদুইনদের জন্য বেশির ভাগ আসন বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এ কারণে আইএএফ যত ভালোই করুক না কেন, নির্বাচনে তারা সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ আসন পেতে পারে। অধিকন্তু বাদশাহ আবদুল্লাহ তার নিরাপত্তা বাহিনীর সাহায্যে শাসন চালাতে পছন্দ করেন এবং আগের মতো আবারো পার্লামেন্টকে দেয়া সব ক্ষমতা নিজের হাতে নিয়ে নিয়েছেন। আইন পরিষদ যখনই বাদশাহর জন্য কোনো ধরনের সমস্যা করবে বলে মনে হবে, তিনি পার্লামেন্ট ভেঙে দেবেন, ডিক্রির মাধ্যমে শাসনকাজ চালাবেন।
পশ্চিম তীরেও মাহমুদ আব্বাস ডিক্রির মাধ্যমে শাসন করেন। এক দশক আগে পার্লামেন্ট স্থগিত করেছিলেন। সাত বছর আগে তার নিজের ম্যান্ডেটও শেষ করে ফেলেছেন। এ গণতান্ত্রিক দুর্বলতায় সিটি নির্বাচন বিরল ব্যতিক্রম। হামাসের জয়ের বিপুল সম্ভাবনা সত্ত্বেও আব্বাস বলেছেন, ভোট যথা সময়েই হবে। অবশ্য হামাসকে বাধা দিতে তার পুলিশ বাহিনী থেমে নেই। তারা ইসলামপন্থী নির্বাচনী কর্মীদের অনেককেই জেলে পুরেছেন। তা ছাড়া তার সমর্থনে রয়েছে ইসরাইলের সেনাবাহিনী। তারা তার পক্ষে এসে নির্বাচন বাতিল করে দিতে পারে। ২০০৬ সালে হামাস নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর ইসরাইল তাদের বেশির ভাগ এমপিকে গ্রেফতার করেছিল।
ফলে ফাতাহ কম ভোট পেয়েও সংখ্যাগরিষ্ঠ দলে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। বিদেশী দাতারা নির্বাচনী ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে। তারা হামাসের পরিচালিত সিটি করপোরেশনগুলোতে তহবিল প্রদান বন্ধ করে দিতে পারে। হামাসের কর্মকর্তা সালাহ আল বারদাবিল বলেন, ‘তারা মনে করে, নির্বাচন মানে কেবল ফাতাহর বিজয়।’
তবে ইসলামপন্থীদের পার্লামেন্টে পাওয়ার মধ্যেও অনেক কল্যাণ রয়েছে। জর্ডানি তরুণ প্রজন্মের অনেক বেশি সদস্য সহিংস বিরোধিতার মুখে নির্লিপ্ত রয়েছে। এক বছরের বেশি সময় ধরে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) নাম করে একটি গ্রুপ তিনবার নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলা চালিয়েছে। বিপুল সহায়তা সত্ত্বেও জর্ডানের অর্থনীতি ভেঙে পড়ছে। ২০১৪ সালে সরকারি ঋণ ৮২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯৪ শতাংশ দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থা থেকে উদ্ধার পেতে বাদশাহকে সঙ্কোচন নীতি গ্রহণ করতে হবে। তবে সেটা করতে হলে বৃহত্তর জনসমর্থন রয়েছে, এমন কাউকে দরকার।
বস্তুত, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য অনেক কিছু করার দরকার। ভোটার হার অনেক সময়ই কম হয়, হতাশায় ভর করে অনেকেই ভোটদান কেন্দ্রে না গিয়ে রাজপথে নেমে আসে। জর্ডানে একটি সাধারণ কথা হলো, ‘পার্লামেন্ট নয়, এমন কিছুকে কিভাবে পার্লামেন্ট বলা যায়’? এমন এক প্রেক্ষাপটে জর্ডান এবং পশ্চিত তীর ব্রাদারহুডের নতুন উত্থানকে মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে। এ ঘটনা হয়তো পুরো এলাকায় নতুন মাত্রার সৃষ্টি করবে।
এসএ সূত্র- ইকোনমিস্ট অবলম্বনে





