সংস্কৃত, পালি, বার্মিজ ও বাংলা ভাষায় আনন্দ শব্দের অর্থ পরম সুখ। মিয়ানমারের বাগানে সেই পরম সুখ পাওয়ার আশায় রাজা কায়ানজিথা (১০৮৪-১১১৩) নির্মাণ করেন আনন্দ মন্দির। মহামতী গৌতম বুদ্ধের প্রদর্শিত পথে প্রার্থনার জন্য প্রায় ৯০০ বছর আগে ১১০৫ খ্রিষ্টাব্দে পাগান শাসনামলে মন্দিরটি নির্মিত হয়।

বাগান মিয়ানমারের মান্দালয় অঞ্চলের ঐতিহব্যবাহী ও প্রাচীন জনপদ। খর¯্রােতা নদীর তীরে বাগানের সবুজ সমতল ভূমির অপূর্ব দৃশ্য আর ফুলের মতো থোকায় থোকায় ছড়িয়ে থাকা মন্দির-প্যাডোগার অপরূপ সৌন্দর্য সহজেই মন ছুঁয়ে যায়। পা বাড়াতে থাকলে মনে হবে ২ হাজার বছরের ইতিহাসের ওপর দিয়ে আপনি হাঁটছেন। মন্দির-প্যাগোডার পবিত্র ছায়ায় দাঁড়িয়ে বুদ্ধের মহামন্ত্র ‘অহিংসা পরম ধর্ম’ আপনাকে ভাবিয়ে তুলবে। জাল-জঞ্জাল ছিড়ে নির্ভোল জীবনের কিছুটা মুহূর্ত হয়তো ধরা দেবে এখানে। বাগানের অসংখ্য মন্দিরের মধ্যে আনন্দ মন্দিরে বুদ্ধের চার মূর্তির সামনে দাঁড়ালে মোহমুক্ত জীবনের ভাবনা কাজ করতে শুরু করবে, যদি কারো ভেতরে সামান্য বুদ্ধভক্তি থেকে থাকে।

খ্রিষ্টীয় দ্বিতীয় শতকে বাগান জনপদ গড়ে ওঠে। তবে কোনো কোনো ইতিহাসবিদের মতে, খ্রিষ্টীয় নবম শতকের মাঝামাঝি গোড়াপত্তন হয় বাগান জনপদের। তখন এর নাম ছিল পাগান। আদি বার্মিজ শব্দ পাগান থেকে বিবর্তিত হয়ে আধুনিক বার্মিজ ভাষায় বাগান নাম হয়েছে। এই বাগানের ঐতিহ্যবাহী ও নন্দিত স্থাপনার মধ্যে আনন্দ মন্দির একটি।

বাগানকে বলা হয় মন্দিরের শহর। কম্বোডিয়ার অ্যাঙ্কর ওয়াট শহর এবং ভারতের বেনারসকেও মন্দিরের শহর বলা হয়। তবে বাগানকে মন্দিরের শহর বলা হলেও মন্দিরগুলো মূলত বৌদ্ধধর্মের উপসনার জন্য নির্মিত অর্থাৎ প্যাগোডা। খ্রিষ্টীয় নবম থেকে ১৩ শতক পর্যন্ত এখানে নির্মিত হয় প্রায় ১০ হাজার মন্দির। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে টিকতে না পারায় হারিয়ে গেছে অনেক পবিত্র স্থাপনা। তবে এখনো প্রায় ২ হাজার ২০০টির মতো স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ টিকে আছে। আর আদি কাঠামো নিয়ে এখনো দাঁড়িয়ে আছে চারটি মন্দির, যার মধ্যে একটি আনন্দ মন্দির।

আনন্দ মন্দিরের দুনিয়াজোড়া প্রসিদ্ধি আছে। লন্ডনের পবিত্র ওয়েস্টমিন্সটার অ্যাবে গির্জার সঙ্গে তুলনা করা হয় এটিকে। আনন্দ মন্দিরকে বলা হয় ‘মিয়ানমারের ওয়েস্টমিন্সটার অ্যাবে’। এর স্থাপত্যশৈলী ভারতীয়। খ্রিষ্টীয় নবম শতকের আগেই বাংলা ও উড়িশ্যায় এমন কাঠামোর ধর্মীয় স্থাপনা ছিল। আর. সি. মজুমদার তার ‘অ্যানিসিয়েন্ট ইন্ডিয়া’ গ্রন্থে আনন্দ মন্দির সম্পর্কে এক পর্যবেক্ষণের উল্লেখ করে বলেছেন, যারা আন্দন মন্দিরের নকশা ও নির্মাণে জড়িত ছিলেন, তারা নিঃসন্দেহে ভারতীয়।

আনন্দ মন্দির নির্মাণ নিয়ে এক করুণ গল্প প্রচলিত আছে মিয়ানমারে। এই গল্প থেকে ইতিহাসবিদদের ধারণার মিল খুঁজে পাওয়া যায়। গল্পটি এ রকম- একদিন রাজা কায়ানজিথার দরবারে ছয়জন সন্যাস আসেন ভিক্ষা চাইতে। এ সময় তারা রাজাকে তাদের ধ্যান সম্পর্কে গল্প শোনান। হিমালয়ের নান্দমুলা গুঁহার মন্দিরে তাদের ধ্যান, সাধনা এবং মানসিক ও আত্মিক মুক্তির উপাসনা সম্পর্কে রাজাকে বলেন। সেদিন খুব বেশি শোনেননি রাজা। পরে তাদের রাজ দরবারে ডেকে পাঠান। নান্দমুলা গুঁহায় তাদের ধ্যানযোগ সম্পর্কে বিস্তারিত শোনেন। তাদের শরীরবৃত্তীয় সাধনা নিজ চোখে দেখনে রাজা। সেই সঙ্গে হিমালয়ের কোমল পরিবেশ সম্পর্কে রাজা বিস্তারিত শোনার পর ছয় সন্যাসিকে নান্দমুলা গুঁহার আদলে ও তেমন পরিবেশ বজায় রেখে একটি মন্দির নির্মাণের অনুরোধ করেন।

সন্যাসিরা তাদের মন-প্রাণ উজাড় করে বাগানের মধ্যাংশে মন্দির নির্মাণ শুরু করেন। নির্মাণ কাজ শেষ হলে সন্যাসিদের মেরে ফেলেন রাজা। আনন্দ মন্দিরের মতো আর কোনো মন্দির যেন তারা নির্মাণ করতে না পারেন, সে কারণেই সন্যাসিদের হত্যা করেন রাজা কায়ানজিথা। তবে অল্পজ্ঞানী রাজার মনবাসনা যে পূরণ হয়নি, তা হয়তো তিনি জেনে যেতে পারেননি। আকার, আকৃতি এক না হলেও একই স্থাপত্যশৈলীর অনেক মন্দির আছে ভারতবর্ষে।

আনন্দ মন্দির মিয়ানমারের অনেক উড়াই-উৎরাইয়ের সাক্ষী। বার্মা থেকে মিয়ানমার, রাজা-মহারাজা-ব্রিটিশরাজ-জান্তা শাসন থেকে গণতন্ত্র কত কিছুই না ঘটে গেছে দেশটিতে। গণতান্ত্রিক মিয়ানমারে পর্যটকদের ভিড় বাড়ছে। দেশটির প্রধান পর্যটন কেন্দ্রই তো বাগান। প্রতিদিন হাজারো দর্শনার্থী-পর্যটক ঘুরে আসছে আনন্দ মন্দির।

বাগানে এখন জনবসতি খুব কম, দর্শনার্থী ও পূণ্যার্থীই বেশি। তীর্থ ভ্রমণের জন্য দল বেঁধে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন অনেক লোক আসে। ১৯৭৫ সালে ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল আনন্দ মন্দির। কিন্তু জান্তা সরকার তার সংস্কার করে। ১৯৯০-এর দশকে বাগানে বেশ সংস্কার কাজ হয় এবং কিছু হোটেল-মোটেল গড়ে ওঠে। বাজেট হোটেল থেকে থ্রি স্টার মানের হোটেল আছে বাগানে। এক রাত অবকাশ যাপনে হোটেল ভেদে দেড় হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত লাগতে পারে।

বাগানের গড় তাপমাত্রা ২৮ ডিগ্রি। তবে এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩২ ডিগ্রি পর্যন্ত তাপমাত্রা থাকে। শীতে বেশ সহনশীল তাপমাত্রা পাওয়া যায়। তবে মিয়ানমারের অন্য শহরের মতো বাগানে বর্ষাকাল নেই। গ্রীষ্মে ছাড়া ছাড়া বৃষ্টি হয়। বাগান ভ্রমণে যাওয়ার জন্য তাপমাত্রা নিয়ে বাড়তি সতর্কতার প্রয়োজন হয় না। মন্দিরের পর মন্দির ঘুরতে হয় খালি পায়ে। গরমে ছোট পোশাক পরতে ইচ্ছা হবে। তবে উপায় নেই, ছোট পোশাক সেখানে নিষিদ্ধ।

মান্দালয় অঞ্চলের মূল শহর থেকে ২৯০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে এবং ইয়াঙ্গুন থেকে ৭০০ কিলোমিটার উত্তরে অবিস্থত বাগান। আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ধরে ইয়াঙ্গুন, সেখান থেকে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে নিয়াউং ইউ বিমানবন্দরে নামলে ট্যাক্সিতে ২০ মিনিট লাগে বাগানে পৌঁছাতে। আকাশ পথে মান্দালয় হয়েও বাগানে যাওয়া যায়। প্রতিদিন রাতে ইয়াঙ্গুন থেকে বাগানে মিয়ানমার রেলওয়ের ৬১ ও ৬২ নম্বর ট্রেন চলাচল করে। সময় লাগে ১৮ ঘণ্টা। তবে মান্দালয় থেকে ১১৭, ১১৮, ১১৯, ১২০ নম্বর ট্রেন ধরে আট ঘণ্টায় বাগানে পৌঁছানো যায়। তা ছাড়া ইয়াঙ্গুন ও মান্দালয় থেকে নৈশ কোচে চড়লে যথাক্রমে ৯ ও ৬ ঘণ্টায় বাগানে নামিয়ে দেয়। কেউ চাইলে মান্দালয় থেকে নদীপথে ৯ঘণ্টায় প্রায় ১৭০ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে বাগানে পৌঁছাতে পারেন।

বাগানে আন্দন দর্শনে গেলে আরো যেসব মন্দির ও জাদুঘর চোখে পড়বে, সেসবও পবিত্রতা, ঐতিহ্য, ইতিহাস ও জ্ঞানের ধারক। অমূল্য মনে করলেই হাজার বছরের ইতিহাস হাতের মুঠোয় এসে যাবে সহজে।

এম আর