মিয়ানমারে রোববার থেকে শুরু হচ্ছে আদমশুমারি। এ নিয়ে এরইমধ্যে নতুন করে মুসলিম বিরোধী সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও সহিংসতা দেখা দিয়েছে মুসলিম অধ্যূষিত রাজ্য রাখাইন প্রদেশে।
গতকাল (শনিবার) মিয়ানমার সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আজ থেকে শুরু হওয়া আদমশুমারিতে দেশটির মুসলমান সম্প্রদায়ভুক্ত নাগরিকরা ‘রোহিঙ্গা’ হিসেবে নিবন্ধিত হতে পারবেন না। তবে ‘বাঙালি’ হিসেবে তারা নিবন্ধিত হতে পারবেন। এর মাধ্যমে গত তিন দশকের মধ্যে এই প্রথম দেশটিতে সরকারিভাবে জাতিগত সংঘাতকে উসকে দেয়া হলো।
১৯৮৩ সালের পর মিয়ানমার সরকার এই প্রথম কোনো আদমশুমারি অনুষ্ঠিত করছে। জাতিসংঘের ইউএনএফপিএ এবং অন্যান্য উন্নয়নমূলক সংস্থার সহযোগিতায় এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের সহায়তায় ৩০ বছরে এই প্রথম আদমশুমারিটি পরিচালিত হলেও সংস্থাটির সেদেশের প্রধান জেনেট জ্যাকসন আশঙ্কা করেছেন, প্রত্যেক বাড়ি গিয়ে জনে জনে তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হবে না।
রাষ্ট্রীয়ভাবে রোহিঙ্গা মুসলমানদের নাগরিকত্ব অস্বীকার করার কারণে উগ্র রাখাইন বৌদ্ধরা নতুন করে মুসলিম বিরোধী তৎপরতা শুরু করেছে। তারা এখন প্রকাশ্যে মিটিং-মিছিল করে মুসলমানদের আদমশুমারি থেকে বাদ রাখার দাবি জানিয়ে আসছে।
এমনকী সশস্ত্র  রাখাইনরা মুসলমানদের পাড়ায় গিয়ে সতর্ক করে দিয়ে আসছে যাতে রোহিঙ্গারা নিজেদেরকে মুসলিম বলে নাম তালিকাভুক্ত করা থেকে বিরত থাকে।  তারা যেন নিজেদেরকে বাংলাদেশ থেকে আসা অভিবাসী হিসেবে নাম লেখায়। অন্যথায় মারাত্মক পরিণতি ভোগ করতে হবে বলে হুমকি দিচ্ছে।
মিয়ানমারের সাম্প্রতিক সহিংসতার কথা জানিয়ে রোহিঙ্গা এডুকেশন ডেভলপমেন্ট প্রোগ্রামের সাধারণ সম্পাদক জনাব জমির উদ্দিন গণমাধ্যমকে বলেন, মিয়ানমার সরকার আদমশুমারি ঘোষণার পর থেকে রোহিঙ্গাদের ওপর নতুন করে আক্রমণ শুরু হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে মিয়ানমারের মঙডুর বাসিন্দা মোহাম্মদ হোসেন জানান, তাদের বাড়ি ঘরে আগুন দেয়া বা হুমকি-ধমকি যাই দেয়া হোক না কেন, তারা নিজেদেরকে আরাকানের রোহিঙ্গা এবং মিয়ানমারের অধিবাসী হিসেবেই আদমশুমারিতে নাম তালিকাভুক্ত করাবেন।
মিয়ানমারে নিযুক্ত বাংলাদেশী রাষ্ট্রদূত অনুপ কুমার চাকমা জানান, মিয়ানমারের নাগরিকত্ব আইন, ১৯৮২ অনুযায়ী দেশটি প্রায় ১৩৫টি ভিন্ন জাতিকে স্বীকৃতি দিয়েছিল এবং এই জাতিগুলোর মধ্যে রোহিঙ্গারা ছিল না। দেশটির রাখাইন রাজ্যে চলমান জাতিগত সমস্যার সমাধানের জন্য চলতি আদমশুমারিটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে নেয়া যেতে পারে বলেও জানান তিনি।
এএফপি জানিয়েছে, আদমশুমারিকে কেন্দ্র করে রাখাইন রাজ্যে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে শুরু করেছে এবং চলতি সপ্তাহেই এই অস্থিরতার ধারাবাহিকতায় বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষরা রাখাইনে অবস্থিত বিদেশী সংস্থাগুলোর কার্যালয়ে হামলাও করেছে। এই ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট বিদেশী কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা রাখাইন ত্যাগ করেছেন।
রাখাইনের রাজধানী সিত্তেতে একদল বিক্ষুব্ধ জনতাকে সতর্ক করার উদ্দেশ্যে পুলিশ ফাঁকা গুলি ছুড়লে তাতে ১১ বছরের একটি মেয়ে নিহত হয়। অঞ্চলটিতে কর্মরত মানবাধিকার কর্মীদের ওপর ক্ষুব্ধ বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদীরা তাদের বিরুদ্ধে স্থানীয় মুসলমানদের পক্ষপাতিত্বের অভিযোগে চাপ প্রয়োগ করে যাচ্ছে।
জাতিসংঘ অঞ্চলটি থেকে প্রায় ৫০ জন আন্তর্জাতিক পর্যায়ের এবং তাদের হয়ে কাজ করা কয়েকজন মিয়ানমারের নাগরিককে সরিয়ে নিচ্ছে। এছাড়া আরো কিছু বড় মানবাধিকার সংস্থাও অঞ্চলটি থেকে সাময়িকভাবে তাদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সরিয়ে নিচ্ছে।
শনিবার সিত্তের শহরজুড়ে আবাসিক বাড়িগুলোর উপর সাইনবোর্ড ঝুলতে দেখা গেছে। সেখানে লেখা আছে, “আমরা আদমশুমারির বিরুদ্ধে অবস্থান করছি, কাজেই নিবন্ধন করবেন না।”
দেশটিতে সাবেক জান্তা সরকারের শাসনামলে যে তথ্য ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে তা থেকে বের হওয়ার লক্ষ্যেই এই আদমশুমারির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
ভিন্ন জাতিগত ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের জনগণকে আদমশুমারির আওতাভুক্ত করা হবে কি-না তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় জনসংখ্যা গণনার এই প্রকল্প নিয়ে দেশটিতে ব্যাপক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। সমালোচকরা বলছেন, এই উত্তেজনা আরো বাড়বে এবং দেশটির সংখ্যালঘু বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে শান্তি আলোচনার বিষয়টি হুমকির মুখে পড়ে আরো পিছিয়ে যাবে।
এই আদমশুমারির বিষয়ে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে দেশটির 'উগ্র' বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদী জনগোষ্ঠী। আদমশুমারির জন্য প্রণীত প্রশ্নমালাকে কেন্দ্র করে এই ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তাদের অভিযোগ, প্রণীত প্রশ্নমালা থেকে বোঝা যাচ্ছে যে এই আদমশুমারির মাধ্যমে এমন জনগোষ্ঠীগুলোকেও নিবন্ধিত করা হচ্ছে, যারা নিজেরাই নিজেদের সম্প্রদায়ের পরিচয় সৃষ্টি করছেন। বিশেষ করে রোহিঙ্গা মুসলমানদেরকেই এই আদমশুমারির মাধ্যমে স্বীকৃতি দেয়া হচ্ছে। আদমশুমারির বিরোধী এই পক্ষের আশংকা, এর মাধ্যমে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের মানুষের রাজনৈতিক অধিকারও নিশ্চিত হবে।
এদিকে, আদমশুমারির বিরোধীতা করে রাখাইন নাগরিকরা ঘরে ঘরে জাতীয় পতাকা টানিয়ে প্রতিবাদ জানাচ্ছে। পতাকা উত্তোলনের ঘটনা নিয়ে বিরোধীতার জের ধরে বুধবার থেকে বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত রাখাইন প্রদেশের রাজধানী সিত্রাতে সহিংসতা ঘটেছে। একপর্যায় নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভকারীদের প্রতি ফাঁকা গুলি চালায়।
কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থার কর্মীরা সহিংসতার শিকার হবার ফলে তাদেরকে  রেঙ্গুনে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। তাছাড়া সন্ধ্যা ৬ট থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত কারফিউ জারি করা হয়েছে।
এর আগে দাঙ্গায় আহত মুসলমান নাগরিকদের চিকিৎসা সেবা প্রদান করার জন্য সম্প্রতি ফ্রান্সের সাহায্য সংস্থা মেডিসিন সান ফ্রন্টিয়ার্স-এর কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে সেখানকার কর্তৃপক্ষ।  তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তারা কেন মুসলমানদের বেশি সেবা দেয়।
আন্তর্জাতিক সংস্থার লোকদের ওপর আক্রমণ প্রসঙ্গে জনাব জমির উদ্দিন বলেন, এ সব আক্রমণের উদ্দেশ্য হচ্ছে বিদেশীদের রাখাইন প্রদেশ থেকে সরিয়ে দেয়া যাতে মুসলমানদের ওপর অত্যাচার নির্যাতনের খবর বাইরে না যায়।
রাখাইনের প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্থানীয় মুসলমানদের অভিযোগ-নিজেদের রোহিঙ্গা বলে পরিচয় দিলে কঠোর পরিণতি দেখতে হবে বলে তাদের হুমকে দিয়েছে প্রশাসন।
রোহিঙ্গাদের ভ্রমণ, পেশা এবং এমনকি বিবাহজীবনের উপরেও কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে মিয়ানমারে। ৭০-এর দশকের পর থেকে মিয়ানমারের সাবেক জান্তা সরকার রোহিঙ্গাদের বিষয়ে কঠোর নীতি অবলম্বন করতে শুরু করলে প্রাণ বাঁচানোর জন্য সীমান্ত দিয়ে নিজ দেশ থেকে প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠীর অসংখ্য মানুষ অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ করতে শুরু করেন।
মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী চট্টগ্রামের টেকনাফ ও উখিয়ার দুটি শিবিরে বর্তমানে ৩০ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী বসবাস করছেন। তবে ধারণা করা হয়, প্রকৃতপক্ষে অন্তত পাঁচ লাখ অবৈধ অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গা নথিভুক্ত না হয়েই বাংলাদেশে বসবাস করছেন।
এই বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীকে ফেরত পাঠানোর জন্য বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে আসছে। বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত অসংখ্য ব্যক্তি বর্তমানে নাগরিকত্ব নিয়ে মিয়ানমারে বসবাস করছেন।
উল্লেখ্য, রোহিঙ্গা মুসলিম বিরোধী সহিংসতার কারণে মুসলিম অধ্যুষিত রাখাইন প্রদেশে ২০১২ সালের জুন থেকে এ পর্যন্ত কয়েকশ' মুসলিম নাগরিক নিহত হয়েছেন এবং প্রায় দুইলাখ রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু হয়ে শরণার্থী তাঁবুতে আশ্রয় নিয়েছেন। এ ছাড়া, আরো  কয়েক হাজার নারী-পুরুষ ও শিশু  দেশত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন।
[b]ঢাকা, ৩০ মার্চ (টাইমনিউজবিডি.কম) // কেবি[/b]