২০ বছর পর মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহার করার পর অতি দ্রুততার সাথে আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে সাবেক শাসক গোষ্ঠী তালেবান। তালেবানের এ ফিরে আসায় আফগানিস্তান নিয়ে নতুন করে হিসাব-নিকাশ কষছে বিশ্বের সংশ্লিষ্ট দেশগুলো।

তালেবান ফেরায় বাংলাদেশ এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে কী প্রভাব পড়বে? রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক প্রভাবের কি বিশেষ কোনো দিক আছে?

আফগানিস্তানে এই পরিবর্তন বাংলাদেশ সতর্কভাবে লক্ষ্য করছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন এরইমধ্যে সতর্ক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “নতুন যে সরকারই আসুক, সেটা যদি জনগণের সরকার হয়, তাহলে আমরা তাকে গ্রহণ করবো।’ তবে আফগানিস্তান থেকে কোনো শরণার্থী গ্রহণের মার্কিন প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে বাংলাদেশ।”

বাংলাদেশের সব শ্রেণীর মানুষের মধ্যেই এই পরিবর্তন নিয়ে আছে ব্যাপক আগ্রহ। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করা হচ্ছে নানামুখী মতামত। কেউ কেউ উল্লাসও প্রকাশ করছেন। সংবাদমাধ্যম গুরুত্বের সাথে খবর পরিবেশনের পাশাপাশি নানা ধরনের মতামত ও বিশ্লেষণ প্রকাশ করছে।

বাংলাদেশের পুলিশ এরই মধ্যে সতর্ক অবস্থানে আছে, যাতে এখানে উগ্রবাদ মাথাচাড়া দিতে না পারে, কেউ যেন আফগাস্তিানে গিয়ে তালেবানে যোগ দিতে না পারে তার ওপর নজর রাখছে। যদিও পুলিশ কমিশনার সফিকুল ইসলাম কয়েকজনের আফগানিস্তান যাওয়ার কথা বলেছেন। বাংলাদেশের কিছু তরুণের অতীতে আফগান ‘জিহাদে’ অংশ নেয়ার রেকর্ড আছে। তারা বাংলাদেশে ফিরে উগ্রবাদী দলও গঠন করেছিল।

বাংলাদেশের নিরাপত্তা বিশ্লেষক এবং ইনস্টিটিউট অব পিস অ্য্যান্ড সিকিউরিটি স্ট্যাডিজের প্রধান মেজর জেনারেল (অব.) এ এন এম মুনিরুজ্জামান মনে করেন, ‘যদি আফগানিস্তানে কোনো গৃহযুদ্ধ হয়, তাহলে সেখানে যে ধরনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে তার প্রভাব বাংলাদেশসহ পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় পড়বে। বিশেষ করে তাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর মানবিক বিপর্যয়ের প্রভাব পড়বে। এর সম্ভাবনা আছে। বাংলাদেশের বড় উদ্বেগের বিষয় হলো সোভিয়েত সমর্থিত সরকারবিরোধী বিপ্লবে বাংলাদেশীরা সেখানে গিয়ে তালেবানের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জিহাদ করেছে। সেই পুরনো অভিজ্ঞতা থেকে আশঙ্কা করি তারা হয়তো এখানে যদি তাদের সাথে তালেবানের আবার যোগাযোগ হয় তাহলে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। আর সেটা যদি না-ও হয় তাহলেও দেখতে পাচ্ছি যে, এখন জঙ্গি গোষ্ঠিগুলো আবার উজ্জীবিত হতে পারে।’

তার মতে, এই প্রভাব ভারত ও পাকিস্তানেও পড়বে। তবে শ্রীংলঙ্কা আর নেপালের সাথে তালেবানের আগে কোনো যোগাযোগ না থাকায় প্রভাব পড়ার আশঙ্কা নেই।

বাংলাদেশে উগ্রবাদ, বিশেষ করে আফগান ফেরত ‘জিহাদীদের’ নিয়ে গভীরভাবে কাজ করেছেন সিনিয়র সাংবাদিক জায়েদুল আহসান পিন্টু। তিনি মনে করেন, ‘বাংলাদেশের আতঙ্কের বিষয় হলো এখন আফগানিস্তানে উগ্রবাদের ব্রিডিং সেন্টার হয় কিনা। কারণ, বাংলাদেশে উগ্রবাদ আফগানিস্তান ও পকিস্তানের সীমান্ত হয়েই এসেছে। কিন্তু হোলি আর্টিজান হামলার পর বাংলদেশে উগ্রবাদীদের কঠোর হাতে দমন করা হয়েছে। এখানে তাদের এখন আর তেমন কোনো শক্তি নেই।’

তিনি বলেন, ‘তালেবান এখন আন্তর্জাতিক সমর্থন চাইছে। তারা এখন নারী অধিকার, সংবাদমাধ্যমের কথা বলছে। তবে তা ইসলামি শরিয়ার অধীনে। সেটা কেমন হয় তা দেখার আছে। তারা আদৌ তাদের চরিত্র বদলায় কিনা তা-ও দেখতে হবে। তাই শুধু বাংলাদেশ নয় পুরো দক্ষিণ এশিয়ার জন্যই একটি নতুন পরিস্থিতি অপেক্ষা করছে।’

কিন্তু সাবেক কূটনীতি মেজর জেনারেল (অব.) শহীদুল হক মনে করেন, ‘তালেবান আলকায়েদা বা আইএস নয়। তারা ওই দুইটি সংগঠনের মতো আন্তর্জাতিক উগ্রবাদী গোষ্ঠী নয়। তালেবান আসলে সমঝোতার ভিত্তিতেই ক্ষমতায় যাচ্ছে। তারা চাইছে সবাইকে নিয়ে একটি সরকার গঠন করতে। তারা আন্তর্জাতিক সমর্থন চাইছে। এই কারণে তাদের চরিত্রেরও পরিবর্তন হবে। পাকিস্তান ও চীনের সাথে তাদের সমঝোতা আছে। এখন এই অঞ্চলে যাদের সাথে তাদের সরাসরি সীমানা আছে তাদের সাথে তারা সুসম্পর্ক রাখবে বলেই মনে হচ্ছে। ভারতের সাথে তাদের সম্পর্ক কেমন হবে তা নিশ্চিত নয়। পাকিস্তান ও চীন চাইবে তাদের মাধ্যমে যোগাযোগ নিরাপত্তা ও ব্যবসা বাড়াতে। বাংলাদেশেরও বড় একটি সুযোগ তৈরি হতে পারে ব্যবসা-বাণিজ্যের।’

এই অঞ্চলে এখন ভারতেরই সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ ও ব্যবসা আছে আফগানিস্তানের সাথে। বাংলাদেশেরও ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়তে শুরু করেছিল। ২০২০-২১ অর্থ বছরে আফগানিস্তানে ৮৬ লাখ ডলারের পণ্য রফতানি করে বাংলাদেশ। এর আগের বছর রফতানি করে ৫৭ লাখ ডলারের। বাংলাদেশ-আফগান দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ বছরে ২ কোটি ৮৬ লাখ ডলারের।

গবেষক আলতাফ পারভেজ মনে করেন, ‘যদি তালেবানের চরিত্রের পরিবর্তন হয় তাহলে বাংলাদেশের ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের একটি সুযোগ হতে পারে আফগানিস্তানে। কারণ, সেখানকার অর্থনীতি কৃষিনির্ভর। সেখানে এখনো আধুনিক কৃষি শুরু হয়নি। সেটা হলে বাংলাদেশীরা সেখানে কাজ পাবেন।’

“আর তালেবানের যদি সত্যিই বদলাতে হয় তাহলে তাদের অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগকে গুরুত্ব দিতে হবে। তা করতে হলে প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটাতে হবে।” ডয়চে ভেলে 

এমবি