মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের অগ্নিকাণ্ডে দু’জনের মৃত্যু হয়েছে। মামনি হাজরা (৩৪) এবং উজ্জ্বলা হাজরা (৪০) দু’জনেরই মৃত্যু হয়েছে পদপিষ্ট হয়ে। মামনি ওই হাসপাতালেরই সেবিকা। উজ্জ্বলা এক রোগীর আত্মীয়। ঘটনার সময় এক সদ্যোজাত শিশুর মৃত্যু হয়। অসুস্থতার কারণে নাকি পড়ে গিয়ে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আহত হয়েছেন ২৫ জন। তাঁদের বেশিরভাগই রোগী।
এর মধ্যে ১০ জন শিশু। নার্স, সেবিকারাও রয়েছেন। এই ঘটনায় দিশেহারা হয়ে পড়েন রোগী ও তাঁদের আত্মীয়রা। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে হাসপাতাল জুড়ে। ওয়ার্ডগুলিতে রোগীরা বেরিয়ে আসার চেষ্টা করতে থাকেন। তৈরি হয় ভয়াবহ পরিস্থিতি। আগুন নেভাতে হিমশিম খেতে হয় দমকলকে।
আগুন লাগার খবরে চিন্তিত মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি জেলা প্রশাসনকে দ্রুত সবরকম ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। মালদা থেকে মেডিক্যাল টিম পাঠাতে বলেন। তাঁর নির্দেশে ঘটনার তদন্ত করবে সি আই ডি। পাশাপাশি স্বাস্থ্য সচিবের নেতৃত্ব একটি কমিটিও তদন্ত করবে। পরিস্থিতি দেখতে হাসপাতালে যান রাজ্যের স্বাস্থ্য বিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য। তিনি অভিযোগ করেন, এর পেছনে ষড়যন্ত্র রয়েছে। বেশ কিছুদিন ধরে চক্রান্ত চলছে। হাসপাতালে যান পরিবহণমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও।
শনিবার। বহরমপুর মেডিক্যাল কলেজে তখন জমজমাট ভিড়। বেলা ১১টা থেকে ১২টা পর্যন্ত ভিজিটিং আওয়ার। হাসপাতালের প্রতিটি তলায় রোগী ও রোগীদের আত্মীয়দের ভিড়। পা ফেলার জায়গা নেই। ঘড়িতে তখন পৌনে ১২টা বেজে গেছে। রক্ষীরা রোগীর আত্মীয়দের চলে যাওয়ার নির্দেশ দিলেও রয়ে গেছেন বেশিরভাগ আত্মীয়ই।
ঠিক তখনই দোতলায় মেডিসিন বিভাগের ভি আই পি কেবিনে ধোঁয়া দেখা যায়। গল গল করে ধোঁয়া বের হচ্ছে তালাবন্ধ ঘর থেকে। কোনও রোগী না থাকায় কেবিন তালাবন্ধ ছিল। যেখানে আগুন লাগে, তার ওপরেই তিনতলায় শিশু বিভাগ। ৩০০ শিশু তখন হাসপাতালে। আগুনের খবর ছড়াতেই সবাই যে যেদিকে পারে, দৌড় লাগায়। দেখা যায়, লিফট বন্ধ। পাশের আপৎকালীন দরজায় বড় তালা।
তাড়াহুড়োয় চাবি খুঁজে পাচ্ছেন না স্বাস্থ্যকর্মীরা। সবাই সিঁড়ি দিয়ে নামার চেষ্টা করেন। কিন্তু সরু সিঁড়ি দিয়ে সবাই নামতেও পারেননি। হুড়োহুড়িতে একে অপরের ওপর পড়ে যান। আর্তনাদ করতে থাকেন সবাই। গোটা হাসপাতাল জুড়ে তখন আতঙ্ক। ইতিমধ্যেই দমকল বাহিনীর ২টি ইঞ্জিন চলে আসে। একটি মাত্র সিঁড়ি। আলো নিভিয়ে ফেলায় অন্ধকার হয়ে যায়। সেখান দিয়ে রোগীরা নামছেন রোগী, নার্স, সেবিকারা। আরও সেটি দিয়েই উঠতে গিয়ে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয় দমকল কর্মীদের। তৎপরতার সঙ্গে আগুন নেভালেও হাসপাতাল জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। হাসপাতালের অন্য ভবন থেকেও রোগীরা বাইরে বেরিয়ে আসেন।
হুড়মুড় করে নামতে গিয়ে কয়েকজন পড়ে যান অনেকে। তাঁদের ওপর দিয়েই নামতে থাকেন পেছন থেকে আসা রোগীরা। খবর পেয়ে আসে বহরমপুর থানার পুলিস। স্থানীয় যুবকেরাও ততক্ষণে উদ্ধারে হাত লাগিয়েছেন। সবার কথা, তিনতলায় রয়েছে সদ্যোজাত শিশুরা আছে। ওদের বঁাচাতেই হবে। কয়েকজন গাছে উঠে দোতলার জানলার কাচ ভেঙে উদ্ধার শুরু করেন। সিঁড়ির রেলিং দিয়ে কার্যত ছুঁড়ে ফেলা হতে থাকে। আর নিচে দাঁড়িয়ে আরেক দল যুবক, দমকল কর্মীরা ওই শিশুদের লুফে নিতে থাকেন। জীবন বিপন্ন করে এক সিভিক ভলান্টিয়ার রেলিংয়ে এক পা দিয়ে এক হাতে শিশুকে জাপ্টে ধরে নিচে নামিয়ে আনেন। এভাবে একে একে প্রায় ৩০০ শিশুকে নামানো হয়। নিয়ে যাওয়া হয় অন্য ঘরে।
জেড





