ইসলামী রীতিনীতি ভঙ্গের অভিযোগে আর কাউকে গ্রেপ্তার করা হবে না বলে ঘোষণা দিয়েছে ইরানের রাজধানী তেহরানের কর্তৃপক্ষ। তেহরানের পুলিশ প্রধান বুধবার এ ঘোষণা দেন।

তুলনামূলকভাবে মধ্যপন্থী প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির আমলে দেশটির ধর্মীয় কড়াকড়ি শিথিল করার লক্ষণ হিসেবে এই পদক্ষেপকে ব্যাখ্যা করেছেন বিশ্লেষকরা। ইরানের প্রধান আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী সৌদি আরবও সম্প্রতি কিছু কড়াকড়ি শিথিল করার ঘোষণা দিয়েছে।

এরই অংশ হিসেবে সৌদি আরবে সিনেমা হল চালু ও নারীদের গাড়ি চালানোর অনুমতি দেওয়া হবে। এবার ইরান থেকে এ ঘোষণা এল। এ খবর দিয়েছে ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল।

তেহরানের পুলিশ প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেন রাহিমি বলেছেন, ইসলামী মূল্যবোধ প্রয়োগের ক্ষেত্রে মানুষকে গ্রেপ্তার না করে ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করা হবে। দশকের পর দশক ধরে বিভিন্ন ছোটখাটো কারণেও জেল-জরিমানা ভোগ করতে হতো ইরানী নাগরিকদের।

নারীদের নেইল পালিশ বা ভারী মেকআপ দেওয়া কিংবা মাথার স্কার্ফ ঢিলেঢালাভাবে পরিধান করাও ধর্মীয় মূল্যবোধ লঙ্ঘণ হিসেবে বিবেচিত হয়। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে জনসম্মুখে স্কার্ফ পরা ইরানের মেয়েদের জন্য বাধ্যতামূলক।

ব্রিগেডিয়ার রাহিমি বলেছেন, ‘যারা ইসলামী মূল্যবোধ মেনে চলে না, পুলিশ তাদেরকে এখন থেকে গ্রেপ্তার করবে না। সমাজ-ভিত্তিক ও শিক্ষামূলক পদ্ধতির ভিত্তিতে পুলিশ তাদেরকে সচেতন করবে।’ রাহিমি জানিয়েছেন, এ বছর প্রায় ৮ হাজার ইসলামী রীতি ভঙ্গকারীকে গ্রেপ্তারের বদলে তাদের জন্য ১২১টি শিক্ষামূলক সেশন আয়োজন করেছে পুলিশ।

তার এই ঘোষণাকে বড় ধরণের পরিবর্তন হিসেবে দেখা যাচ্ছে। তবে দীর্ঘদিনের কড়াকড়ি থাকায়, ইরানের অনেকেই এই ঘোষণাকে সন্দেহের চোখে দেখছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বহু ইরানি দাবি করছেন, ইসলামী মূল্যবোধ কী, সেটি সংজ্ঞায়িত থাকা দরকার। এই ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায় এক ইরানি নাগরিক ব্যাঙ্গাত্মক টুইটে লিখেছেন, ‘সম্ভবত তাদের বন্দীশালায় জায়গা ফুরিয়ে গেছে।’

অনেকে আবার উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। মাসুদ রাজি নামে এক ইরানি টুইটারে লিখেছেন, ‘বন্দীত্বের বদলে শিক্ষা। এটি নারীদের জন্য বিজয়।’ তবে কিছু ইরানি পর্যবেক্ষক বলছেন, প্রয়োগের বেলাতেই দেখা যাবে এই শিথিলতা কতটা কাজের। তাদের যুক্তি, প্রেসিডেন্ট রুহানি সহ অনেক ইরানি নেতাই বিভিন্ন কড়াকড়ি শিথিল করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু তারা সেগুলো বাস্তবায়ন করতে পারেননি।

২০১৫ সালে রুহানি পুলিশ কর্মকর্তাদের এক সম্মেলনে বলেন, ইসলামি আইন বাস্তবায়ন করা তাদের কাজ নয়। কিন্তু এরপরও ইসলামি রীতি লঙ্ঘনের অভিযোগে গ্রেপ্তার থামেনি।

গত সপ্তাহেই বছরের সবচেয়ে স্বল্পতম দিন উদযাপনে নাচগান করে ইসলামি মূল্যবোধ লঙ্ঘনের দায়ে তেহরানের পুলিশ ২০০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে।

ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসির জ্যেষ্ঠ ইরান বিশ্লেষক বেহনাম বেন তালেবলু বলেন, উদীয়মান তরুণ মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে আকৃষ্ট করতে একটু নমনীয় হওয়ার কৌশল নিয়েছে ইরান।

তিনি বলেন, ‘ইসলামি আইনের কঠোর সংস্করণ প্রয়োগ না করতে চাওয়ার উদ্দেশ্য হয়তো তাদের আছে। কিন্তু যারা সত্যিকার অর্থেই সংস্কার আনতে চায়, তাদের সেই সংস্কার বাস্তবায়নের রাজনৈতিক সামর্থ্য নেই।’

মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অংশে চলমান উদারীকরণের সঙ্গে তেহরানের এই পদক্ষেপের মিল রয়েছে। সুন্নি-অধ্যুষিত সৌদি আরবেও উদারীকরণ চলছে। গত বছর দেশের ধর্মীয় পুলিশের গ্রেপ্তারের ক্ষমতা রদ করেছে সৌদি কর্তৃপক্ষ।

সেপ্টেম্বরে বাদশাহ সালমান ডিক্রি জারি করে বলেন, আগামী বছরের শুরু থেকে নারীরা গাড়ি চালাতে পারবে। এ মাসের শুরুতে দেশটিতে সিনেমা হল চালুর ওপর কয়েক দশকের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়েছে।

এসব পদক্ষেপ দেশটিতে জনপ্রিয় হয়েছে, বিশেষ করে বিপুল সংখ্যক তরুণদের মধ্যে। শুধু সৌদি আরব নয়। তবে বেশ কিছু মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে ইসলাম সম্পর্কিত কঠোর বিধিনিষেধ জোরালো করার দাবিও উঠছে। যেমন, পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামবাদ ঘেরাও করে গত মাসে ধর্ম-অবমাননা আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়নের দাবি মানতে সরকারকে বাধ্য করেছে ধর্মীয় উগ্রপন্থীরা।

জনসংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়ায় উগ্রপন্থী ইসলামী গোষ্ঠীগুলো শরিয়া-ভিত্তিক আইন প্রণয়নের দাবি তুলছে। দেশটির রক্ষণশীল গোষ্ঠীগুলোও হালে পানি পেতে শুরু করেছে।

ইরানে শুরুর দিকে ইসলামি বিপ্লবী রক্ষী বাহিনীর ওপর দায়িত্ব ছিল ইসলামি মূল্যবোধ বাস্তবায়নের। কিন্তু পরে পুলিশ এই দায়িত্ব নেয়।ইরানের তরুণরা বিশেষ করে স্কার্ফ ও অন্যান্য পোশাক সম্পর্কিত কড়াকড়ি শিথিলে বড় ভূমিকা রাখে। তাদের ভোটেই ২০১৩ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন রুহানি। পরে তিনি এ বছরের মে মাসে পুননির্বাচিত হন।

ইরানের জনসংখ্যা ৮ কোটি ২০ লাখ। এদের ৪০ শতাংশই ২৫ বছরের কম বয়সী। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ-এর ইরান প্রজেক্ট-এর পরিচালক আলি ভায়েজ বলেন, ‘নৈতিকতা পুলিশ ইরানের প্রাণবন্ত তরুণদের নিয়ন্ত্রণ করতে স্রেফ ব্যর্থ হয়েছে।

এই তরুণরা তাদের পূর্ববর্তী প্রজন্মের চেয়ে একটু বেশি উদার।’ তিনি আরও বলেন, ‘রুহানি প্রশাসন বোঝে যে, সমাজে অসন্তোষ যত কম থাকবে, ততই দেশের অভ্যন্তরে নিরাপত্তা ঝুঁকি হ্রাস পাবে।’

ইরানিয়ান তরুণরা অনেক বেশি সাহসী। পোশাক নির্বাচনের ক্ষেত্রে তারা তুলনামূলকভাবে উদার। ইরান সরকার দীর্ঘদিন ধরে এই ধারাকে ঠেকানোর চেষ্টা করলেও এখন কিছুটা নমনীয় হয়েছে।

গত বছরও তেহরানের তৎকালীন পুলিশ প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেন সাজেদিনিয়া ৭ হাজার ছদ্মবেশী নৈতিকতা পুলিশ মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছিলেন। এ সময় স্কার্ফ ছাড়া ইন্সটাগ্রামে ছবি আপলোড দেওয়ায় অনেক নারী মডেলকে গ্রেপ্তার করা হয়।

আগস্টে নতুন পুলিশ প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন জেনারেল রাহিমি। ঠিক তখনই তেহরানের মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হন সংস্কারবাদী প্রার্থী মোহাম্মদ আলি নাজাফি। এ দুই সংস্কারবাদীই স্ব স্ব ক্ষেত্রে দুই কট্টরপন্থীর স্থলাভিষিক্ত হন। তবে তেহরানের পুলিশের ওপর মেয়রের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ। প্রেসিডেন্ট রুহানি এই সিদ্ধান্তের নেপথ্যে ভূমিকা রেখেছেন কি না তা স্পষ্ট নয়।

জেড