জাপানে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে আজ। জাপানের ৪৮তম পার্লামেন্ট নির্বাচন এটি। এ নির্বাচনের মাধ্যমে বর্তমান ক্ষমতাসীন শিনজো আবের প্রশাসনের ভাগ্য নির্ধারণ করবেন জাপানের ভোটাররা। তার ডাকেই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আগাম এই নির্বাচন।

জনমত জরিপে তার জোট সরকার এখন জনপ্রিয়। তবে চমক হিসেবে তার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে থাকছেন টোকিওর গভর্নর ইউরিকো কৈকে।

ঠিক কে জয়ী হবেন তা নিয়ে দেখা দিয়েছে হালকা সংশয়। জাপান টাইমসের এক খবরে বলা হয়েছে, গত সপ্তাহের মঙ্গলবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত এক জরিপ চালিয়েছে স্থানীয় রক্ষণশীল পত্রিকা ইয়োমিউরি শিমবুন। তাতে দেখা গেছে, আবের লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) আর কোমেইতো জোটের জয় প্রায় নিশ্চিত।

জরিপ অনুসারে, এই জোট পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের ৪৬৫ আসনের মধ্যে ৩০০ আসনে জয়লাভ করতে পারে। আবের পুনরায় ক্ষমতায় ফিরে আসার জন্য ৩০০ আসন যথেষ্টের চেয়ে বেশি। জাপানে নিজের দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠা করতে আবের প্রয়োজন মাত্র ২৩৩ আসন।

তবে কিছুটা সংশয় এখনো থেকে গেছে। জাপানের ভোটারদের ২০ শতাংশ এখনো সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে। তাদের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে ভিন্ন কোনো অপ্রত্যাশিত মোড়ও নিতে পারে নির্বাচন। এই নির্বাচন আবের জন্য ব্যাপক গুরুত্বপূর্ণ। আবে এতে জয়লাভ করলে কিছু বিষয় পরিষ্কার হবে। সেগুলোর একটি হচ্ছে তার ওপর জনগণের আস্থা।

এই নির্বাচনকে তাই আবের জন্য জনগণের রায় হিসেবে দেখা যায়। যেখানে জয়লাভ মানে জনগণের ওপর তার প্রভাব এখনো বিদ্যমান।

এদিকে, আবে বর্তমানে দ্বিতীয় দফায় এলডিপির প্রেসিডেন্ট হিসেবে দলের নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন। ধারণা করা হচ্ছে, এই নির্বাচনে জয়ী হলে সামনের বছর দলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পুনরায় লড়তে পারেন তিনি। সেখানে জয়ী হলে দলের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো তৃতীয় দফায় প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করবেন তিনি।

আর আজকের নির্বাচনে জয়ী হলে দলের প্রেসিডেন্ট নির্ধারণী নির্বাচনে তার প্রতিযোগিতায় নামার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে বহুগুণে। আবের জন্য অতিরিক্ত সুখবরও রয়েছে। জাপানের দিকে ধেয়ে আসছে ঘূর্ণিঝড় ল্যান। কয়েক দশকের মধ্যে জাপানের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে এই ঘূর্ণিঝড়কে।

অনেকের ধারণা, এতে করে ল্যানের আগমন বার্তায় কমে যেতে পারে ভোটার উপস্থিতি। আর এমনটি হলে তা নিশ্চিতভাবেই এলডিপির মতো বড় দলগুলোর পক্ষে কাজ করবে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক জরিপ অনুসারে, ১৫ই অক্টোবরের দিকে ৪১ লাখ ৭ হাজার ভোটার ভোট দিতে ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। গত বছরের তুলনায় এ সংখ্যা তুলনামূলকভাবে প্রায় দ্বিগুণ। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ২৬ লাখ ৯৯ হাজার। একেবারে শুরু থেকেই আবের আগাম নির্বাচনের ডাক ব্যাপক সমালোচনার শিকার হয়েছে।

আইন অনুসারে, এই নির্বাচন আরো এক বছর পরেও অনুষ্ঠিত হতে পারতো। তবে আবে তার বর্তমান পরিস্থিতির সুযোগ লুফে নিয়েছে। কয়েক দফা কেলেঙ্কারিতে জর্জরিত হওয়ার পর তার জনপ্রিয়তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেখান থেকে সমপ্রতি আবারো জনগণের পছন্দের তালিকার উপরিভাগে চলে এসেছে তার মন্ত্রিপরিষদ।

এমনকি বিরোধী দলের অবস্থাও তার জন্য সুবিধাজনক। আবের চিন্তা এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে পুনরায় দেশটিতে তার শাসন প্রতিষ্ঠা করা। বিরোধী দল থেকে তার এই পদক্ষেপের কড়া সমালোচনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, এই নির্বাচন শুধু নিজের স্বার্থের জন্যই ডেকেছেন আবে।

গত মাসেই পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ ভেঙে দেন আবে। তখন থেকেই সমালোচনার শুরু। বিরোধী দলের মতে, নিজের পছন্দ অনুযায়ী কর্মচারী নিয়োগ দেয়ার কেলেঙ্কারির উত্তাপ আবে কৈ মাছের মতো ভাজছিলো। ২০১২ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে তার জনপ্রিয়তা সবচেয়ে নিচে নেমে যায় ওই কেলেঙ্কারিতে।

আবে অবশ্য ভিন্ন দৃষ্টি দেখিয়েছেন। তার মতে, জাতীয় সংকটময় পরিস্থিতি উত্তরণে এই নির্বাচনকে জনগণের একটি শক্তিশালী রায় হিসেবে দেখা উচিত। এখানে জাতীয় সংকট বলতে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্থিরতার দিকে ইঙ্গিত করেছেন তিনি।

কিম জং উন ইতিমধ্যে দেশটির ওপর দিয়ে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছেন। এমনকি জাপানকে প্রশান্ত মহাসাগরে ডুবিয়ে দেয়ার হুমকিও দেয়া হয়েছে। আর এসব হুমকি সামলাতে কট্টরপন্থি অবস্থান নিয়েছেন আবে। যা তাকে তার হারানো জৌলুস ফিরিয়ে এনে দিয়েছে। এমনকি কৈকের আবির্ভাবের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত তার এই মনোভাব বেশ ভালো প্রভাবই ফেলছিল।

তবে এখন কিছুটা অনিশ্চয়তার মধ্যেই রয়েছে জাপান ও আবে। আবেকে প্রতিস্থাপন করার উদ্দেশ্য নিয়ে কিবো নো তো (পার্টি অফ হোপ) গঠনের ঘোষণা দেন তিনি। জুলাইয়ে তার আঞ্চলিক দল ফার্স্ট নো কাই আবের এলডিপির সঙ্গে টোকিও মেট্রোপলিটন এসেম্বলি ইলেকশনে জয়লাভ করে।

কৈকের দল ঘোষণার কয়েকদিনের মধ্যেই বিরোধীদলীয় নেতা সেইজি মায়েহারা তাকে সমর্থনের নিশ্চয়তা দেন। এমনকি তার টোকিওর গভর্নর হিসেবে পদত্যাগ করার কথাও বাতাসে ভাসতে থাকে। তবে তার দল জয়লাভ করলে তিনি টোকিওর গভর্নর হিসেবে তার দায়িত্ব পালনে অবহেলা করতে পারেন এমন আশঙ্কা দেখা দেয় অনেকের মনে। কৈকে নিজেও পিছিয়ে যান। একই সঙ্গে পিছিয়ে যায় তার দল কিবো নো তো। আর এসব কিছু হিসাব করলে আবের জয় একপ্রকার নিশ্চিতই বলা যায়।
জেড