১৫ জুলাই রাতের সেনা ক্যু ব্যহত হবার পর এখন তুরস্কে যা হচ্ছে সেটাকে দুইভাগে ভাগ করা যায়। এক. বিদ্রোহের রাত থেকেই রাজপথে নেমে আসা জনতা আজ পঞ্চম দিনের মত ক্যু বিরোধী বিক্ষোভ অব্যাহত রেখেছে। দুই. বিদ্রোহের পর সরকারের পক্ষ থেকে গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ ধারাবাহিকভাবে চলছে। এর মধ্যে রয়েছে বিদ্রোহের সাথে জড়িতদের চিহিৃত করে আটক ও জিজ্ঞাসবাদের আওতায় নিয়ে আসা।
বিক্ষোভে উত্থাল তুরস্কের সমাবেশগুলোতে প্রতিদিন জনগণের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পাওয়ায় বাইরে নতুন করে কোন আপডেট নেই এখন র্পযন্ত। তাই দ্বিতীয় পয়েন্টের উপরে আজ লিখছি।
সবাইকে নিয়ে মোকাবেলা করতে চান এরদোয়ান?
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মিডিয়ায় এরদোয়ানকে বিদ্রোহীদের প্রতি তার ব্যক্তিগত আক্রোশ মিটাতে এককভাবে বিরোধী দল দমনে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছেন বলে খবর প্রকাশিত হচ্ছে। এর সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের বাংলাদেশের কিছু মিডিয়াও একইরকম খবর প্রকাশ করে যাচ্ছে। কিন্তু আসলে কি তাই? তাহলে কিভাবে আগাচ্ছেন এরদোয়ান?
প্রকৃত সত্য হলো, এরদোয়ান দেশের জনগণ এবং প্রধান বিরোধীদলসহ সকল রাজনৈতিক দলকে সাথে নিয়েই তার একযুগেরও বেশী শাসন আমলের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহতম পরিস্থিতি মোকাবেলা করছেন। এ ক্ষেত্রে এখনো পর্যন্ত ছোট ছোট রাজনৈতিক দলগুলোকেও তিনি মোটেই অবজ্ঞা করছেননা।
বিদ্রোহের পরের দিনই জরুরী ভিত্তিতে ডাকা সংসদ অধিবেশনে সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সকল দলের প্রধান তাদের ইচ্ছেমত সময় নিয়ে বক্তব্য রাখেন। প্রত্যেক নেতাই এ ঘটনাকে তুরস্কের ইতিহাসের অন্যতম জটিল সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে এ থেকে উত্তরণের পথে সরকারকে সব ধরণের সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন।
টেলিফোনে কথা বলেছেন রাষ্ট্রপতি
সেনা বিদ্রোহের একদিন পরেই রাষ্ট্রপতি রেজেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান তার নিরাপত্তাজনিত কারণে সরাসরি দেখা করতে না পারলেও টেলিফোনের মাধ্যমে কথা বলেন রাজনৈতিক দলগুলোর প্রধানদের সাথে । এ সময় তিনি বিদ্রোহ ব্যর্থ করে দিতে তাদের পক্ষ থেকে প্রাথমিকভাবে বিদ্রোহবিরোধী শক্ত অবস্থান গ্রহণের জন্য প্রশংসা করে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। একইসাথে পরবর্তী পরিস্থিতি সবাইকে সাথে নিয়েই মোকাবেলার প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন।
প্রধানমন্ত্রীর সাথে প্রধান বিরোধী দলের সাক্ষাত
আজ ১৯ জুলাই তুরস্কের সংসদের প্রধান বিরোধীদল সিএইচপি’র প্রেসিডেন্ট কিলিচ দারউলো প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করেছেন। সাক্ষাতের পর তারা একসাথে ফটোশেসনেও মিলিত হন। এসময় কিলিচ বলেন, এ সমস্যা উত্তরণে আমরা সরকারের সাথে আছি। দেশ ও গনতন্ত্রের স্বার্থে এটাকে আমরা আমাদের দায়িত্ব মনে করি। এসময় তিনি পদক্ষেপ গ্রহণে তার দলের পক্ষ থেকে কিছু চিন্তা ও পরামর্শ প্রদান করেন।
এমএইচপি’র সাথে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাত
প্রধান বিরোধী দলের সাথে সাক্ষাতের পাশাপাশি সংসদে প্রতিনিত্বকারী তৃতীয় বৃহত্তম দল এমএইচপির সাথেও আজ প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাত হেয়ছে। এমএইচপি’র প্রধান দেওলেত বাহচেলির সাথে এ সাক্ষাত অনুষ্ঠিত হয়। উল্লেখ্য, এই দলটি বিদ্রোহের রাতে সবার আগে সেনা ক্যু বিরোধী বিবৃতি প্রদান করে গণতন্ত্রের স্বার্থে সরকারের সাথে থাকার কথা ঘোষনা করে। আজও তারা তাদের সেই অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন বলে মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে।
সরকারের সাথে আছে সাদাত পার্টিও
বিদ্রোহ পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারের সাথে থাকার ঘোষনা বিদ্রোহের রাতেই দিয়েছে দেশটির প্রধান ও প্রাচীন ইসলামী রাজনৈতিক দল সাদাত পার্টি। সাদাত পার্টির প্রধান মোস্তফা কামালাক অত্যন্ত কঠিন ভাষায় সেনা অভ্যুত্থানের নিন্দা করে বিবৃতি প্রদান করেন। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারের কারো সাথে তাদের সাক্ষাতের খবর এখনো মিডিয়াতে আসেনি।
তবে, দেশের যে কোন বড় ঘটনায় সাদাত পার্টির সাবেক প্রধান, সাবেক জ্বালানী মন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতা এবং বর্তমানে আধ্যাত্মিক নেতা হিসেবে পরিচিত তাইয়্যেপ রেজাই কুতানের কাছে থেকে এরদোয়ান পরামর্শ নিয়ে থাকেন বলে কথিত রয়েছে।
রাজপথে কি শুধুই ক্ষমতাসীন পার্টি?
এরদোয়ানের একে পার্টি ক্ষমতায় থাকার কারণে স্বাভাবিকভাবেই জনগণকে রাজপথে নামার আহবান তাদের পক্ষ থেকে জানানো হলেও রাজপথে একে পার্টি ও জনগণের সাথে আছে অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীরা। প্রধান বিরোধী দল সিএইচপি নিজ আলাদা কোন সমাবেশের আয়োজন না করলেও গোটা তুরস্কজুড়ে আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশগুলোতে অংশগ্রহণ করে অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার নিন্দা ও গণতন্ত্রের পক্ষে শক্ত অবস্থান নিতে জনগণকে আহবান জানাচ্ছেন দলটির নেতারা।
এদিকে তৃতীয় বৃহত্তম দল এমএইচপি বড় বড় সমাবেশগুলোতে অংশগ্রহণের পাশাপাশি নিজ দলের পক্ষ থেকে আলাদা আলাদা সমাবেশও করেছে কোন কোন শহরে। আর সাদাত পার্টিতো দাবি করছে বিদ্রোহের রাতেই রাজপথে এসে তাদের ১৫ জন কর্মী শাহাদাত বরণ করেছেন। তারাও সরকারকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন বিভিন্নভাবে।
উল্লেখ্য যে, আগে থেকেই সরকারের আমেরিকা ও ইসরাঈলপন্থী সিদ্ধান্তগুলোর কড়া সমালোচনা করে আসছিল এ দলটি। ১৫ জুলাইয়ের বিদ্রোহের সাথে আমেরিকাপন্থী জেনারেলরা জড়িত থাকার খবরে এবং সরকারের পক্ষ থেকে আমেরিকা বিরোধী কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করায় অনেকটা খুশি হয়েই সরকারকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে দেশের প্রাচীন এই ইসলামিক দলটি।
কুর্দীদের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল এইচডিপিও বিদ্রোহের সমালোচনা করেছে। তবে বিদ্রোহীদের মৃত্যুদন্ডের যে দাবী উঠেছে রাজপথ থেকে, তার বিরোধীতা করে বিবৃতি দিয়েছে ‘পিকেকে’ নামে সন্ত্রাসীগোষ্ঠীর প্রধান মদদদাতা ও গেল নির্বাচনে শতকরা দশভাগ ভোট নিয়ে শর্ত পুরণ করে প্রথমবারের মত সংসদে প্রতিনিধত্বকারী এ দলটি।
সার্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, নিজ দেশে ও মুসলিম বিশ্বে প্রচন্ড প্রভাবশালী নেতা এরদোয়ান এর আগে একক সিদ্ধান্তে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও এবারের ঘটনায় সবাইকে নিয়েই এগুতে চাচ্ছেন তিনি। অন্তত এখন পর্যন্ত তার ও তার দলের পক্ষ থেকে গৃহীত পদক্ষেপগুলোর নিরপেক্ষ পর্যালোনা করলে এমনটিই বুঝা যায়।
(বি. দ্র. মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব। টাইমনিউজবিডির সম্পাদকীয় নীতিমালার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই)
কেবি





